রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

দশ.

এসব শুনলে আপনার মনে হতে পারে খামোকা মানুষের শোকতাপ নিয়ে কি এমন আমোদ না করলেই নয়! আপনাকে যে কেমন করে বোঝাই, এ গাঁয়ের উদোম মাঠ থেকে ঢোল কলমীর জঙ্গল জুড়ে জীবনের ছবিখানি ভারী মায়ায় ভরা। সে জীবনে আর যাই থাক মৃত্যুকে ভয় পাবার মতো কোনো বেসামাল হাতছানি নেই।
ওই যে দেখছেন, কচি কচি নরম ধানের গোছায় ভরে উঠেছে বীজতলা, ওই হলো আগামীর বিছন। এমন বিছন দেখে দেখে আপনার চোখে ঘোর লেগে যেতে পারে বেমক্কা। ইউরিয়া না দিলেও সবুজের খামতি আপনি টের পাবেন না। অবশ্য বর্ষার মতো সকলেই তো আর এই সময়ে চাষ করে না! আর করবেই বা কেমন করে, এত জল কিনে ধান করার রেস্তো কি সকলের থাকে? খরার ধান তাই সকলে করে না। এদিক সেদিকে তাই ফুটফুটে মাঠ বেপর্দা পড়ে থাকে চাঁদের আলোয়, ভোরের কুয়াশায়। বিছন এই খানিক বড় হয়েছে ক’দিনে। এই তো মাঘের শুরু সবে। এখন চষা মাঠে ধান রোয়া হবে খানিক। এই কদিন মাঠে মাঠে খুব ব্যস্ততা। বেশ একটা হইচই হইচই ভাব। ছেলে বুড়ো মেয়ে জামাই সকলে মিলে যেন একটা মাটি, আলো আর মাঘের হাওয়া মেখে গল্পের আসর বসেছে। এ গাঁয়ে যদিও গরুর চেয়ে মোষ বেশি। এই তাগড়া মোষেদের দেখলে আপনার পিলে চমকে যাবে। টানা টানা চোখে আপনার মুখের পানে চাইলে কলজেখানি ধুকপুক ধুকপুক করতে পারে। তবে, সে ওই একদিনই। ওরা সলে ভারী নিরীহ। এই তো শিবুর এতটুকু মেয়ে দু-দুটো মোষ এক সঙ্গে নিয়ে চলেছে। এই এক সমস্যা, গরুরা কেমন ঘর চিনে ফিরতে পারে, মোষেদের কিন্তু সে আক্কেল নেই। অন্তত জীবন’দা তো তেমনই বলে। কত বকে ভয় দেখিয়ে তবে না ঘরে ফেরানো যায় তাদের। তবু বেয়াক্কেলে মানুষ হলেই কি আর সে মন্দ হয়? তার সঙ্গে কি আর মনে প্রাণের গল্প করতে বাধে? তা তো নয়! এই যেমন আমাদের ভগলু সেই কোন সকাল থেকে তার মোষদুটোকে নিয়ে লড়ে যাচ্ছে। এবারে ওর বিছন বিক্কিরি হয় নাই তো কী আর করা যাবে! মোষদুটোকে দিয়ে পায়ে দলে বিছন তুলে ফেলতে হবে, এই আর কী! কিন্তু যে বিছনে এতদিন মুখ দিতে বারণ করেছে ভগলু সেই বিছনে আর পা দেয় কেমন করে ওরা? ভগলু কত করে যে বোঝাচ্ছে তার ঠিক নেই। হাওয়ায় হাওয়ায় ওর শ্রমের ক্লান্তি আর বকার ভগ্নাংশ ভেসে ভেসে আসছে থেকে থেকে। আর না পেরে ক্রমে ধৈর্য হারাচ্ছে ভগলু। বলছে, তোরা কি গাধা নাকি? এত করে বলি তাও তোরা বুঝিস লাই! এত মাথামোটা! এসব শুনে শুনে ওদের নিজেদের মোষ-জীবনের প্রতি কোনো অনুশোচনা জন্মালো কিনা বোঝা গেল না কিন্তু ওরা টানা টানা দীঘল চোখে ওই সোজা আকাশমণির জঙ্গলের দিকে চেয়েই রইলো। ওই গাছপালার ওপারে উঁচুনীচু ঝোপ, সেই যেখানে মুনিয়ারা খড়ে মিশে থাকে! সে ওসব ওরা দেখতে পায় কিনা বোঝা যায় না কিন্তু হঠাৎ যেন ভারী ভয় পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে পুরো লেজ তুলে দৌড় লাগায়। উফ এই বয়সে ভগলু কি আর পারে! অবশ্য ভয়ের কারণ টের পাওয়া যায় খানিক বাদেই। ওই ঝোপ পেরিয়ে এদিকে হেঁটে আসছে এ গাঁয়ের নতুন বাসিন্দা। নতুন বললে ভুল হবে, সুন্দরী গোগোর কথায় সে আসলে দিকু। তাকে পরদেশি বলা যায়। যাইহোক এমন দিকুকে দেখেও কি ভয় পেতে হয়! ভগলুর আর মাথার ঠিক থাকবে কেমন করে? ভারী রেগে গেছে এবারে সে। গাল পাড়ছে এন্তার। বলছে, জীবনে কি শহরের লোক দেখিস নাই নাকি? ভগলুর এই একক কথন শুনতে কিন্তু ভারী ভালো লাগে। শুনতে শুনতে মনে হয় এই জীবনের শোকতাপ ওই মোষেদের মতো আর কার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরেছে ভগলু? নাহ্‌ ওরা গল্প করুক, আমি বরং আলোয়ান মুড়ি দিয়ে খানিক ঘুমিয়ে নিই। (চলবে)

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box