রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

এগারো

ভগলুর কাজ সারতে আজ বেলা গড়াবে খানিক। মাঝখানে অবিশ্যি মোষদু’টোকে একটু আলগা করে দিয়ে ও আলের পাশটিতে বসে ছাতু মুড়ি খেয়ে নেবে। ওর মুড়ি খাবার ভঙ্গিটি ভারী অদ্ভুত। জীবনের আনাচকানাচ থেকে জড়ো করা নির্লিপ্তি তখন যেন ওর গ্রীবাখানিতে এসে জড়ো হয়। এই মধ্যেই সাইকেলের পিছনে মেয়েকে চাপিয়ে নিয়ে ভগলুর ছেলে দুপুরের ভাত নিয়ে আসে। বাপের ভাতের ডিবেখান নামিয়ে দিয়ে মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে ও এবার এ গাঁয়ে সে গাঁয়ে পাড়ি দেবে। সাইকেলের হাতলে ভারী ভারী নাইলনের ব্যাগে এতসব কেতাব। কোলকেতা থেকে কোরান-হাদিশ কিনে এনে পাড়ায় পাড়ায় বিক্কিরি করে সেলিম। এ তো আর আলু-পটলের সওদা নয়, সেলিম তাই খারে কাচা পাঞ্জাবি পরে, চেক কাটা লুঙি পরে। ভারী যতন করে চুল আচড়ে চোখে খানিক সুর্মা বুলিয়ে নিতেও ভোলে না।

বাপের ভাত, আলুসানা আর বেগুন ভর্তা নামিয়ে দিয়ে ওই চলে যাচ্ছে সেলিম। ওর তিন বছরের মেয়ে আয়েষা এবার আধো আধো বুলিতে দাদার সঙ্গে গল্পে মেতেছে। কত যে তার কথা! সে কী সহজে ফুরোতে চায়! তবু যেন ওর চোখের কোণটিতে বিষাদের কান্না এসে জড়ো হয়েছে আষাঢ়ে বিকেলের মতো। মাঠ থেকে উঠে আসতে আসতে আয়েষার চাচা তাই জিজ্ঞেস করে, কী হলো রে আয়েষা? দুপুর দুপুর মাঠে ঘুরতিচিস! আয়েষার চোখখানি এবার ভারী হয়ে আসে। দাদার কোল ঘেঁষে বৃষ্টি ঝরিয়ে দিতে দিতে সে কেবল আধো স্বরে বলতে পারে – থাগলের বাচ্চা মরি গেল! এ’কথায় ওর চাচা খানিক থমকে দাঁড়ায়। সত্যি তো ছাগলের বাচ্চা মরি গেলে কেমন করে আর বাড়ির উঠোনে খেলে বেড়ায় আয়েষা! ওর চাচা এবার হাত বাড়ায়, বলে, চল তোকে ঘর দিয়ে আসি। ইস্‌ ঘরে ফিরবে বলে কি আয়েষা মাঠে এসেছে!
দাদার কোল ঘেঁষে ও তাই বসে বসে ঘাস ছেড়ে।

ঘাসফুলেদের পাশটিতে বসলে আয়েষা কি সত্যিই বিষাদ ভুলে যায়? সাদা-হলুদ ফুলের ভিতরে ডুবে যেতে যেতে আয়েষার লাল ফ্রকে কে যেন তখন বুনোফুল বুনে দেয় পশমের ওমটুকু দিয়ে। তবু ওর চাচা হাল ছাড়ে না, ভগলুও বলে মেজবাবা চলে যাচ্ছে কিন্তু, তুই ঘর যা ক্যানে! অগত্যা কী আর করে আয়েষা! মেজবাবার সাইকেলে চেপে ওই দূরে লালফ্রক পাতাবাদামের গাছ পেরিয়ে , কালভার্ট পেরিয়ে এই আর কিছুক্ষণে লোহাগড়ে ঢুকে যাবে। ভগলুও খানিক দেখে নেয়। ওর নির্লিপ্ত গ্রীবা আবার খানিক জীবনের ওম খুঁজে নেমে বলে মাটির দিকে নত হয়। মোষেদের জোয়ালে জুড়ে আবার ও খানিক চাষ দেবে। বেলা গড়িয়ে এলে আলের আগাছা নিড়িয়ে তুলে দিতে দিতে বার বার আকাশ দেখে নেবে ভগলু। আকাশে যে ও কী খোঁজে! অবকাশ বুঝি বা। খানিক হাত মুখ ধুয়ে ভাতও খাবে ও বিকেলের কিছু আগে তারপর ভাঙা পাঁচিলের একধারে গামছা খানি মেলে দিয়ে ও এবার জায়নামাজখানি পেতে নেমে ঢালু জমির প্রান্তে।

পশ্চিমের আকাশে আর কিছুক্ষণে রঙের খেলা শুরু হবে। সবুজ গাছের আর ঘাসের ভিড়ে ডুবে যেতে যেতে ভগলুও ডুবে যাচ্ছে প্রার্থনায়। ওর মোষেরা তখন অনাবাদি জমিতে ঘাস খাচ্ছে একমনে। নৈঃশব্দে ভরে যেতে যেতে মাঠের ওই প্রান্তে কথা বলে উঠছে গাছেরা। মূক প্রাণীরও তো কিছু কথা থাকে! বিকেলের শেষ রোদে ভাষাহারা ধরিত্রীর গল্প তাই যেন ফুরোতেই চায় না। একটা দু’টো হাটিটি আবার উড়ে এসে গলাবাজি করে যায় খানিক। ওরা ফিরে গেলে পর ভগলুও ফিরে যাবে। এই মাঠ এই কচিধানের ক্ষেত এদের গল্প কি তখন ফুরোবে? খেলেডাঙার মাঠ, জাঙাল আর পরিত্যক্ত কাঁদড়ে নটেগাছ মুড়োয় না, ওদের গল্পও তাই ফুরোয় না। আপনারাও আসুন না, খানিক ভাষাহীনতায় ডুবে যাই? (চলবে)

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box