রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

বারো.

ভাষাহীনতায় ডুবে যেতে মানুষের কী আর এমন রেস্তো লাগে বলুন দেখি! জীবনেরও কিছু বাড়তি ফসলে ভরে থাকে যে মাঠ, কাঁদড় আর মরা নদীর সোঁতা তার গোলাঘরখানি বুঝি এই আমাদের গাঁয়ে এসে থমকে গেছে কোন আসমানি মেঘের মিনার হয়ে। এ গাঁয়ে তাই ধানের গোছা রোদ আর শিশিরে ডুবে যেতে যেতেও মানুষের আদর মাখে। এমন শীতের রাতে মাঠ আগলানো ছেলে তাই রাত প্রতি তিনছড়া ধানের আশ্বাসে গুনগুনিয়ে গান গায়। কে বলে অভাবী মানুষের আমোদের অবকাশ নেই! আমি তো বরং দেখি প্রথম শীতের রোদে ছেলে বুড়োরা দিনমজুরের কাজ ফেলে বাঁটুল হাতে বেরিয়ে পড়েছে সক্কাল সক্কাল। ওদের হাতা গোটানো চেক জামা, ওদের মাথায় বাঁধা গামছা। আড়াআড়ি ঝোলানো কাপড়ের থলেতে ঝুলছে বাঁটুলের গুলি, কঞ্চি কাটা ছোরা। ওই দূরে দূরে পাখি আর খরগোশ শিকারের আনন্দে ওরা ছড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ওদের গামছার রঙ আর কিছুক্ষণে বেনাঘাসের ঝোপের আড়ালে আবডালে মিলেমিশে যাবে।

কেবল মাত্র ওদের উচ্ছ্বাস আকাশ কাঁপিয়ে শোনা যাবে খানিক খানিক। সারা সারা দিনের শেষে মেঠো খরগোশ কি আর জোটে রোজ! তবু হাতখানেকের মতো বড় মেটে ইঁদুর কিন্তু পেয়ে যায় ওরা। পাবেই তো, পেতে হবেই তো! সারাদিনের রোজ ফাঁকি দিয়েছে যে মানুষ তার খুশি উপচানো শিকার জুটতে কী আর এমন লাগে ! এমন জীবনকে যারা খুব কাছ থেকে দেখেনি তাদের অবাক হতে হয় এ’কথায়। অভাবী সংসারে যার মেয়ে তাপ্পি দেওয়া জামা পরে বয়ঃসন্ধির আড়াল খোঁজে তার কি এমন করে কাজ ভুলে শিকারে যাওয়া সাজে! আমি কিন্তু অনেক ভেবে দেখেছি, বয়ঃসন্ধির আড়াল খোঁজে ঔপনিবেশি মন। মানুষের শরীরী বিকাশ নিয়ে এ গাঁয়ের মেয়ের ভারী চিন্তিত হতে বয়েই গেছে। দ্যাখোনি এ গাঁয়ে এমন জল সপসপিয়ে ভেজা কাপড়ে পাড়া ডিঙিয়ে চলে যায় মাখনলালের কচিবউ! তার পায়ের গোছখানি সুডোল। তবু কি মানুষ সেদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে? তাকায় না, তারা জানে অমন অবাক চোখে তাকাতে নেই। এ গাঁয়ের ব্যাটাছেলেরা সেকথা জানে বলেই না কচি বুড়ো মেয়ে বউরা জানে বাহ্যি ফেরাতে গেলেও চিন্তা নেই। শিকারী বাপের মেয়ে তাই ছেড়া ফ্রকেও ভারী সুন্দর করে হাসতে পারে। তার খারে কাচা রঙচটা জামার বিবর্ণতা ঢেকে দেয় যে আবীর রঙা কাগজফুল! সেই ফুলের চেয়েও নিষ্পাপ ওর হাসিখানি।
বাপের শিকার থেকে ফিরতে দেরী হবে জেনেই মেয়ে তাই মোষেদের বাড়ি নিয়ে যেতে আসে। তারা কি আর ঘর যেতে চায়! তারা কেবলই এদিক সেদিকে নেমে পড়তে চায় নরম ঘাসের খোঁজে। বাপসোহাগী মেয়ে তখন তার বাঁকা ভুরুখানি তুলে আকাশ দেখে। মাথায় চুড়ো করে বাঁধা চুলখানি ওর। সেই চুলে জড়িয়েছে মস্ত একগোছা ফুল। মেরুদণ্ড সোজা করে মেয়ে এমন করে চেয়ে আছে দূরে যে ওকে দেখলেই মনে হয় ওর ভিতরে কবেকার কোন নদী যেন এসে থিতু হয়েছে ওর ওই ফুল জড়ানো খোঁপাটির মতো। ওকে দেখলে তখন ফ্রিদা কাহলোর মুখখানি মনে পড়ে যায় আমার। ঠিক অমন ওর স্টাইল টেস্টামেন্টখানি। গ্রামের মানুষের মধ্যে কি কেবল গ্রাম্যতাই থাকতে আছে? নেই নেই, সরল গ্রীবার মেয়ে তাই মোষেদের সঙ্গে দুলকি চালে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে ও দেখে ওই দূরে ওর বাবা ফিরছে ভারী ব্যস্ত পায়ে। এসব দেখতে দেখতে ও খানিক হাসে, একা একাই। ওর রুখুসুখু চুলের প্রান্তে তখন কাগজফুল রঙিণ হয়ে ফুটে থাকে। এসব দেখেছে যারা তারা জানে, জীবনে টাকাকড়ি লাগে বটে, সে তো লাগবেই কিন্তু সেসব দিয়ে মানুষের সবটুকু খুশি মাপতে নেই। ধানেরা যেমন করে শিশির মাখে নিরাভরণ শরীরে! যেমন করে জোনাক পোকা তার কোলের পাশ দিয়ে উড়ে যায় বারবার! মানুষের জীবনেও তেমন কিছু উদবৃত্ত খুশি থাক না কেন! দিন মজুরের বুঝি সাধ আহ্লাদ থাকতে নেই!

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box