রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

তেরো.

খেলেডাঙার গল্পের চলনখানি আসলে এমনই। তাতে নেই কোনো বাড়তি রোমাঞ্চ, নেই কোনো বাহাদুরির পৌরুষ। ভারী বৃত্তাকার এই জীবনের যাপিত দিনলিপি। কোন কিছু নিয়েই যেন কারো কোনো তাড়া নেই । তাই দ্যাখেন না, বাড়িতে চাল নেই! তবু, চাল কিনতে বেরনো ন্যুব্জ বৃদ্ধ কেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলে-ছোকরাদের ফুটবল খেলা দেখে! জীবনের এই শিথিলতা, এই শ্লথ জঙ্গমতা কনকচূড়ার ফুলের মতো খেলেডাঙার আকাশ জুড়ে বিছিয়ে থাকে। অনেকটা রুশ গল্পের মতো ভারী ধীর এই জীবনের গল্পগুলি। অকারণে তাড়া খাওয়া জীবনের মতো এ জীবন তাই হাপিয়ে উঠতে চায় না। তার তো জীবন ভরেই আছে আকাশ দেখার অবকাশে!

শিবুকে দেখেছেন? শিবু বাসকে? ম্যাচলাইট বের করে ওই যে বিড়ি ধরাচ্ছে শিবু! ও কিন্তু হাতের জাদুতে ভারী চমৎকার করে ফুল ফোটাতে জানে। গাইতি ধরার চেয়ে ওর ঢের ভালো লাগে বাসুনি দিয়ে গাছের গোড়া খুড়ে নিতে। শিবু তাই একেকদিন বালি-সিমেণ্ট মাখার কাজ থেকে ছুটি নেয়। ওই তুতফলের গাছটার নিচে পা মেলে বসে ও তখন সূর্যমুখীর বিছন ছাড়িয়ে গুছিয়ে রাখে কাপড়ের পুঁটলিতে, কোনোদিন বা ওর ভাঁড়ারের পুটলি খুলে দেখে নেয় আর কী কী বীজ আছে ওর সঞ্চয়ে। ব্যাঙ্কের লকার খুলে মানুষ যেমন করে পারিবারিক হাতফেরতা গয়না মিলিয়ে নেয়, শিবুর মুখে ঠিক তেমনই ভালোলাগার আলোটি স্থির হয়ে থাকে তখন। ওর ছেলে আকাশ তখন বাবার কাঁধের উপর ঝুঁকে পড়ে। ঝুঁকে পড়ে দেখে কেমন করে বাবা তার গাছেদের গায়ে হেলান দিয়ে গাছেদের মধ্যে ডুবে যায়।

বিছন গোছানো শেষ হলে পেঁপের চারাদের একবার দেখে নেয় শিবু। ছেলেটা স্কুল পালিয়ে এদিক সেদিকে সারাদিন সাইকেল চালিয়ে বেড়ায়, শিবু তবু ওকে বকতে পারে না। আসলে কেমন করে ছেলেকে শাসন করতে হয় ভুরু নাচিয়ে সেকথা কোনোদিন কেউ ওকে শিখিয়ে দেয়নি। ছেলেকে সাইকেলের রডে বসিয়ে মাঝে মধ্যে এদিক সেদিকে যায় হয়তো একেকদিন। হাতে দু’দশটাকা বেশি জমে গেলে খালি পায়ে হাঁটা ছেলের জন্য বোলপুর হাটতলায় গিয়ে জুতো কিনে দেয় শিবু। কালো বুটজুতো পেয়ে আকাশ তখন কেবলই হাসে মুখ টিপে। ওর বাবাও হাসে। সংক্রমিত হাসি তখন সাইকেলের চাকায় গগাগড়ি দিতে দিতে ফিরতি পথ ধরে। আকাশের গায়ে, শালের বনে তখন খুশির আলো পিছলে পড়ে সোহাগের আদরে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় দুই বন্ধু বুঝি ইস্কুল পালিয়েছে মাস্টারকে ফাঁকি দিয়ে। শিবুকে দেখলে তখন আমার অপুকে মনে পড়ে যায়। শিবু তো পথের পাঁচালি পড়েনি, ও তাই জানে না – জানবেও না কেমন করে বাঙালি মননের এক আশ্চর্য কাল্ট ওর মধ্যে এসে থিতু হয়েছে । অবশ্য বাঙালি মনন নিয়ে ভাবতে ওর বয়েই গেছে। বাঙালিদের এইসব ঔপনিবেশিক খবরদারি থেকে দূরে থাক শিবু, দূরে থাক আকাশ। ওদের গান,গল্প আর ছবি দিয়ে ভরিয়ে তুলুক ওরা ঘরবসতির দেওয়াল দরজা। ঘরে ফেরা শিবু এবার শার্দূলের উপরটিতে বাজারের থলেখানি টাঙিয়ে রাখে। ওবেলায় পাশের পাড়ায় যেতে হবে একবার। আগামী সপ্তাহে বিয়ে আছে একখানা। সে বিয়ের রান্না কে আর করবে শিবু ছাড়া! মানুষ কি কেবল অচেনা লোকের মেয়ের বিয়েতে মজুরি নিয়ে রান্না করে? এমন করে যারা দিনরাত ভাবে তারা শিবুকে দেখেনি নিশ্চয়ই কোনোদিন। শিবু এ পাড়া সে পাড়ায় রান্না করে বেড়ায়, সে ওর খুশি। সীমজিল উতু রাসি রাঁধতে রাঁধতে যখন গন্ধ ছড়ায় উঠোন জুড়ে, তখন শিবুর মুখখানিতে ওই শালবনের পিছলে পড়া আলো এসে নতজানু হয়ে বসে। সাধারণ মুরগির মাংসই তখন পরিপাটি জোগানে, মশলার পারিপাট্যে মিশে যেতে থাকে । ঘেমে নেয়ে যেতে যেতেও শিবু কিন্তু তখন হাসে। ভারী যত্নে সূর্যমুখীর বিছন গোছানো শিবু এখন রান্না করবে মনের সুখে। রাঁধুক শিবু, রাঁধুক। (চলবে)


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box