রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো। 

পনেরো.

এই গোধূলির আলো আর কতক্ষণই বা স্থির হয়ে থাকবে! আর কিছুক্ষণেই আকাশে মিশে যেতে যেতে তাকে মুছে যেতে হবে আঁধারের চরাচরে। তখন ফিকে অন্ধকারে ওই একধারে বাঁশের মাচাটির উপর বসলে নিজেকে ভারী নিশ্চিন্ত মনে হয়। এই মাঠ, মানুষ আর অন্ধকারে তখন আর নিজেকে একা মনে হয় না। এই তো কেমন খরার ধানে মাঠ ভরে গেছে। ওই দক্ষিণ-পুবের মাঠে ফকির সাহেবের শ্যালো থেকে কেবলই জল পড়ছে সারাদিন সারারাত। এই রোদ্দুরের মাসে মানুষ নইলে পারবে কেন! সন্ধ্যে রাতেও এখন তাই এ মাঠে সে মাঠে টহলদারি চলে। গোড়ালি ডুবিয়ে মানুষ মেপে নেয় জলের গভীরতা। এবারে ঈদের আগেই ধান উঠবে মনে হচ্ছে। পাকা ধানে রঙ লেগেছে ওই। সক্কালের আলোয় বারান্দার কিনার ঘেঁষে দাঁড়ালে দেখা যায় ভারী মৃদু হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে পাকা ধানের শীষ। তবু আকাশের দেবতাকে কি আর বিশ্বাস আছে! কবে কোনদিন তিনি চোখ রাঙাবেন তার ঠিক নেই।

এ গাঁয়ের মানুষ হাওয়া আপিসের খবর তেমন বিশ্বাস করে না। তারা বলে, প্রকৃতির উপরে কি মানুষের বিচার চলে! গতবারেই তো ছাড়া এক ঘণ্টার পাথুরে বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেলো! যে বচ্ছর খোদাতালার যেমন বিধান। তবু মানুষ তো আশায় বাঁচে! এই যে আমাদের শ্যামল সেই কোন ছেলেবেলায় আব্বাকে হারিয়েছে। এই মাঠ, শরিকি জমি এই নিয়েই ওর নিত্যদিনের সাংসারিক অভ্যাস। বিনুরিয়া ইস্কুলের বাংলার মাস্টার তবু বলেছিল, তুই ইস্কুলে পড়। যা খরচ লাগে আমি দেব। তবু শ্যামলের পড়া হলো কই! খোরাকি ধানের আবাদ আর ইস্কুলের চক-ডাস্টারের কি তুলনা চলে! শ্যামল তাই সারাদিন এই মাঠে পড়ে থাকে। ওই যে ঢালু জমির ধারে আকাশমণির ছায়া? ওখানে একেকদিন ঘুমিয়েও নেয়। ঘুমন্ত মানুষের মুখ বড় সুন্দর। সেই মুখে ইস্কুল পালানোর দুঃখ থাকে না ওর আর। ঘুম ভাঙলে সাইকেল সোজা করে শ্যামল উঠে দাঁড়ায়। বলে, ঘর চললাম। মা আর দিদিকে নিয়ে শ্রীনিকেতন যাব। ঈদের আগে এইটুকুই তো সুখ মানুষের!

এখন পাড়ায় পাড়ায় সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে ফেরিওয়ালা শাড়ি, কাজল, বেলোয়ারি চুড়ির বেসাতি করে। তবু মানুষের ইচ্ছে করে শ্রীনিকেতন মোড়ে গিয়ে দু-পাঁচটা কাপড় জামা দেখে তবে না কিনবে! চারিদিকে এখন তাই ব্যস্ত ব্যস্ত ভাব। এ বচ্ছর তাই ধান কাটার মাঝামাঝি ঈদের বাজার গরম হয়ে উঠেছে এদিক সেদিকে। তবু মুনিষ পাওয়া কি সহজ কাজ! সকলেই নিজের জমির ধান কাটতে চায় অন্যের কাজ ফেলে রেখে। উঁচুপাড়া আর নিচুপাড়ার মেয়ের দল এখন শাড়ি-জামার উপর ফুলশাট পরে কাস্তে হাতে ভোর ভোর মাঠে নেমে যাবে। অবশ্যি ফকির সাহেবের মতো যারা রহিস চাষি তারা গাড়ি ভাড়া করে আনে দূর দূর থেকে। সেই গাড়ি ধান কেটে ধান ঝেড়ে বেছে দেয়। মানুষের হাতে কাটার চেয়ে তার সুবিধে ঢের ঢের বেশি। মস্ত বড় গাড়িখানা মাঠে নামলে এ পাড়ার কুচোকাচার দলও মাঠে নেমে পড়ে। বড় বড় মেঠো ইঁদুর যদি পেয়ে যায় তবেই কেল্লাফতে। ভাগ চাষীরাও দৌড়োয় পাশে পাশে। ম্যশিনের বাইরে পড়ে থাকা ধানের গোছা তারা হাতে কেটে নেয় চটপট। আর ফকির সাহেব তিনি এ মাঠ থেকে ও মাঠ গাড়ির সমান্ত্রালে ঘুরে ঘুরে বেড়ান সারা সারা দিন।

এ বছর শ্যামলও গাড়ি আনিয়েছে। কেবল আশেপাশের মধ্যে ভগলু মিঞাই হাতে কেটে নিচ্ছে সোনালি ধানের গোছা। ম্যাশিনে কাটা খড়ে তেলের গন্ধ, মোষেরা সে খড় খায় না। ভগলু তাই আকাশ দেখে আর ধানের গোছা পাঁজা করে রাখে। কে জানে কখন আকাশের দেবতা মুচকি হাসেন! মেঘ-বাদলের চিন্তা অবশ্য তিলা-মুনিয়াদের নেই! ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে এ মাঠ থেকে ও মাঠ চক্কর কেটে বেড়ায়। এই ওদের পরবের দিন। আহ্‌ পক্ষি-জীবন! তুমি তো আর কোনোদিন সুর্মাওয়ালার সামনে চোখ পেতে বসলে না! (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box