রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো। 

ষোল.

পরবের আগের দিনে এ গাঁয়ে এখনও উৎসবের ভিতরের কথাটি বারে বারে বেজে উঠতে চায়। পাড়ার সামান্য দোকানেও কত ভিড়! সেই কখন চাঁদ উঠবে তবে না মসজিদ থেকে ঘোষণা দেবে! তবু অশীতিপর বৃদ্ধ রেডিও’র নব ঘুরিয়ে বাংলা সংবাদ শোনার চেষ্টা করেন। আমরাও বারান্দার ওই ধার ঘেঁষে দাঁড়াই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি বাঁকা কাস্তের মতো চন্দ্রকলা কেমন অপরূপ আলপনা এঁকে দেয় তার নিরাভরণ উপস্থিতিটুকু দিয়ে। এই আকাশকে তখন মনে হয় সে যেন কোন এক মিনিমালিস্টিক আর্টিস্টের ক্যানভাস। আকাশ দেখে দেখে তখন আর আশ মেটে না। তার মধ্যে অবশ্যি সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে একে একে এসে দাওয়াত দিয়ে যায় পাশের পাড়ার মানুষজন। ভোর ভোর ঈদগাহ’র মাঠে নামাজ পড়া শেষ হলে বাড়িতে বাড়িতে মেহমানদারি জমে ওঠে। আমরাও এ গাঁয়ের নতুন মানুষ হয়ে পুরনো মানুষদের মধ্যে মিশে যাই ঈদের সকালে।

বাড়িতে বাড়িতে মেঠাই, শরবত, চালের রুটি, মাংস আর হালুয়া। মানুষের সাধ আর সামর্থ্য আসলেই কেমন করে মিশে যায় এমন দিনে সে’কথা টের পাওয়া যায় নিকোনো দাওয়াটির পাশটিতে গিয়ে বসলে। ফরিদ, আমাদের ফরিদুলের বউ তখন নতুন ওড়নায় মাথা ঢেকে খাবারের পরাত নামিয়ে দেয় মাদুরের উপর। আমরা ভাবীরে সালাম দিই। বলি, সক্কাল সক্কাল এত কি খাওয়া যায় ভাবী! ফরিদের বউ ভারী সুন্দর। গাঁয়ের মানুষেরা ঠিক গুছিয়ে কথা কইতে জানে না, এমন কথা ফরিদের বউকে দেখে কেউ বলতে পারবে না। সেই রাত থাকতে উঠে শাউড়ি আর বউতে মিলে এই এত রান্না করেছে। এখন মল বাজিয়ে হাসিমুখে এই খাতিরদারি চলবে দিনভর। বচ্ছরকার পরবে এইটুকুই তো! পাড়ার বাচ্চারা বক্স বাজিয়ে নাচবে, গাইবে, নতুন চুলের ছাঁটে কলকলিয়ে এ পাড়া থেকে ও পাড়া টহল দেবে, তবে না? তবু, আপনারা যেমন করে ভাবেন তেমন করে এখানে কেউ ভাবে না। আসলে তেমন করে ভাবতে তো কেউ শেখায়নি!

ঈদের মাঠের ওই পাশে বাঁশতলায় তাই বক্স বাজছে জোরে। ভাড়া করে আনা সিডিতে গান আছে ভরপুর। সেখানে আশি-নব্বইয়ের দশকের গান বাজছে জোর কদমে, বাজছে এবারের নির্বাচনী প্রচারের ইস্তেহার। আহা এমন করে সরকারী প্রতিশ্রুতি আর মানুষের আনন্দ মিশে যেতে দেখলে ভালো লাগে বই কী! এ’সব দেখতে দেখতে আমরা এ বাড়ি থেকে সে বাড়ি যাই। যদি বলি, আর তো খিদে নেই! তবে তারা ছ্যাদা বেঁধে দেন। এই কত্তে দিন গড়ায়, সন্ধ্যে নামে। মেহেমানের সাজখানি খুলে রেখে একটু জিরিয়ে নেবার খায়েশ হয় এবার। নাহ্ সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে ভগলু মিঞা এসেছে আমাদের ডেকে নিয়ে যেতে। তার পরনে আজ সাদা লুঙি, পাঞ্জাবী, চোখে চশমা। হঠাৎ করে তাকে দেখলে ইস্কুলের মাস্টার বলে ভুল হয়ে যায়। জল কাদায় মোষেদের সঙ্গে রোদ্দুর আর বৃষ্টি মাখে যে ভগলু, তাকে এমন করে ঈদের দিনে খুঁজে পাব তাই কি ভেবেছি কোনদিন। তবু এই হলো উৎসবের গুণ। সে মানুষের ভিতরের মানুষটিকে ফিরিয়ে দিতে পারে চাঁদ ওঠা সন্ধ্যায়।

ভগলুর বাড়ির পথ ধরে এগলেই দেখা যায় ওর নাতনি চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের অপেক্ষায়, অতিথির অপেক্ষায়। ওর প্লাস্টিকের চুড়ি, ওই সুর্মাটান চোখ দেখলে তখন মানুষের আর পক্ষি জীবনের সাধ জাগে না। তখন ওই চার বছরের মেয়ের পাশটিতে বসে চালের রুটি দিয়ে হালুয়া খেতে মন চায়। গুটি গুটি কোল জুড়ে বসে গল্প বলা মেয়ে সে কী আর তখন এই লোহাগড়ের সামান্য গাঁ-ঘরের বিটিছেলে! তাকে তখন মনে হয় ফেরেস্তা। দাদির আদরে ছাগলের বাচ্চাদের সঙ্গে যায় জীবন কাটে তাকে ভালোবাসবো বলেই না, এই বেনাঘাসের ঝোপ পেরিয়ে এমন নিঝুম সাঁঝে মাটির দাওয়াটিতে এসে বসেছি! কচি হাতের মেহেদির রঙ মুঠি মেলে ধরে দেখাতে চায় যে মেয়ে তখন ইচ্ছে হয় তাকে কোলে নিয়ে ঘরে ফিরি এই আঁধার পেরিয়ে। তবু, সে তো আর হয় না! তার মা, তার দাদি তারে চোখে হারায়। আমরা তাই আয়েষাকে ফেলে বাড়ির পথ ধরি। আমি স্থির জানি, ডাগর চোখে সে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক দাঁড়িয়ে আছে। (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box