রাঙাধুলোর গান…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

দুই.

খেলে ডাঙায় এবার সূর্য ডোবার তোড়জোড় শুরু হবে। আঘুনের বিকেলে লোহাগড়েরওই মাথায় শর আর তালগাছেদের ওপারে সূয্যিদেব তলিয়ে যাবেন আর কিছুক্ষণেই। তখন এই এলিয়ে পড়া ঢেউ খেলানো গ্রামটায় জেগে উঠবে শেয়াল,বুনো খরগোস আর পেঁচারা। শীতের রাতের স্থির হয়ে থাকা চাষনালা থেকে বুকেপিঠে ঠেলে ব্যাঙগুলো রাস্তায় এসে জড়ো হবে। এমনই হয়ে এসেছে আসলে কত দিন ধরে। এ রাস্তায় তো মানুষ চলেনা আঁধারে,তাই অমন করে ইজীবনের অভ্যাসেওরা অভ্যস্ত। কদাচিৎ মানুষের পায়ের আওয়াজ পেলেও রা ছিটকে যায়

এদিক সেদিকে। ছোটবেলায় খোলামকুচি নিয়ে যারা ব্যাঙলাফ খেলেছি তারা জানে এই চিত্রময়তা কেমন।এদিকে  ইলেকট্রিকের পোল পড়েছে সবে। ওই নদীর পথে গেলেই শ্মশান। আজ নয় কাল ইলেট্রিকচুল্লি হবে,সরকারি খাতায় তাই নাম উঠে গেছে এই রাস্তার। একে আর গোপথ বলে দাগিয়ে দিলে চলবে না। যশোমতীর

সুপুরুষ বর ওই শ্মশানে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কবে। ইলেকট্রিক চুল্লিতে মানুষ কত সহজে পুড়ে যায় ঠিকই,

তবু পুড়তে পুড়তে পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাওয়া তখন সময়ের অপেক্ষায়। চুল্লির দরজা খুলবে, তবে না! এই গাঁয়ের কত মানুষের গল্প এই পথে এসে তাই থেমে গেছে নিশ্চুপ এই রাত্তিরের মতো। উঁচু পাড়া আর নীচু পাড়ায় অবিশ্যি এখন মানুষের কলকলানি। সারাদিনের কাজের শেষে মেয়ে-মরদ সবে ঘরে ফিরেছে। ভাত ফুটছে

বড় হাড়িতে। স্বর্ণচালের মিঠে গন্ধ আছে একটা। খুব কড়া নয়। কারো বাড়িতে আবার কুটুম এসেছে সেই বাহিরি বা গুসকরা থেকে। কুটুম আসা বাড়িতে মানুষের কলকলানি খানিক বেশি। সে তুমি বাড়ির গা ঘেঁষে দু-পা

হাঁটলেই বেশ টের পেয়ে যাবে। সে বাড়িতে আর কিছু না হোক মিঠেকড়া নেশায় বুদ করে দেওয়া চাই বাহিরির কুটুমদের। হাড়িয়ার মৌতাতে মানুষের মেহেমানদারি এখনও এ গাঁয়ে হামেশাই দেখা যায়। বাইরে পড় থাকা

পৃথিবিটার সঙ্গে এর কোনো তুলনা চলে না। চলেও বা হয়তো তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। তবে ওই যে বললাম, এ গায়ে ট্রান্সফরমার না থাকলেও ইলেকট্রিকের পোল আছে, বিজলি আছে, মোবাইল আছে ঘরে ঘরে। মেয়েবউরা তাই ফোন করে জেনে নেয় কুটুম আসার দিনক্ষণ। হাতে গুনে হিসেব করে নেয় খানিক।

তারপর সাইকেল চালিয়ে সন্ধ্যের আঁধার ঠেলে কখনও বা ভিড় করে বল্লভপুর মোড়ে। সেই যেখানে আলো জ্বালানো বাক্সে ফুচকা বিক্কিরি করে বিনুরিয়া থেকে আসা ছেলে! সেখানে মদের ঠেকে উবু হয়ে বসে ঝিমলা গায় রোজগেরে মুনিষ। তার কাঁচা টাকা তখন কোমরের গেঁজে থেকে ছলকে পড়তে চায় খুশিতে।কুটুম আসা

বাড়ির অবশ্য ঝিমলাগানের ফুরসৎ নেই। চাল আর বাখর কিনে ফিরিতে হবে ঘরে। শীতের দিনে হাড়িয়া মজতেও সময় লাগে বেশি। তবু সকলের হাতে কী আর তার রূপ খোলে। জীবনে কত মানুষই তো সারাদিন মাঠে ঘাটে গাছগাছালির সঙ্গেই দিন কাটিয়ে দেয় জীবনভর! তারা সকলেই কী আর ফুল ফোটাতে জানে! এ গাঁয়ের মেয়েদের মধ্যেও তেমনই সকলেই তো বিয়ের যুগ্যি হয় হাড়িয়া বানাতে শিখলে। তবু সকলেই কী আর বুধিনের মতো! জীবনানন্দের কবিতার মতো যেন ওর হাতখানি। কুটুম আসা বিকেলে ওদের উঠোনে আগুন জ্বালিয়ে জল গরম হয়। নেটের জালিতে হাড়িয়ার মজে ওঠা চাল ধুয়ে নেবে এবার বুধিন। চাল ধোয়া জল থেকে তখন অল্প অল্প ধোয়া উঠবে নরম আলোর বিকেলে। গেলাসে গেলাসে মানুষেরা খাবে সেই ধানি মদ। কত প্রজন্মের শিক্ষানবিশি এর মাঝে এসে মিলেমিশে গেছে। চালের মিষ্টি গন্ধই হাড়িয়ার শরীরে তখন স্থির।দোকানের মদে কী আর এমনটা হয়?নিরাভরণ জাপানি টি-সেশনের মতো এর মধ্যেও যেন এক ধরণের প্রশান্তি আছে উৎসর্গআছে। আমার অন্তত তেমনটা মনে হয়। আবার কখনও মনে হয় নবান্নের সাদের মতো এখানেও যেন ব্যক্তি বিশেষের শিল্পিত কারসাজি শেষ কথা বলে। মণীন্দ্র গুপ্তের সেই নবান্নের গল্পখানি মনে আছে? ‘অক্ষয়মালবেরী-এর সেই অবাক করা গদ্য ছবি! খেলেডাঙার গল্পও আসলে তেমনটাই যে! নানা একে আমি ইতিহাস বলি না। বলি মানুষের গল্প। (চলবে)


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box