রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

বাইশ.

মানুষের জীবনের গল্পে ঢুকে পড়তে গেলেও আসলে অনুমতি লাগে। সে অনুমতি মেলে বটে কখনও কখনও, তবে সে তো আর সহজ নয়! শহরের মানুষ আসলে ভেবে নেয় নিজের মতো করে। হাটুরে মানুষের ঘর বসতির আব্রু না থাক, নিপাট একখানা উঠোন তো আছে! সেসব পেরিয়ে তার অন্দরে সটান ঢুকে পড়ো তুমি কোন সাহসে? তুমি কি আহাম্মক? শিবু আর চুরকির গল্পে তাই ঢুকে পড়তে নেই। সে বড় অনধিকার চর্চা। তার চেয়ে বরং ধানের গন্ধে ডুবে যাওয়া অনেক সহজ। অন্তত গাছেদের নিভৃত পরিসরে ব্যক্তিগত জীবনের মায়া এমন ভাবে মিশে থাকতে জানে। সে তাই সহজেই মানুষের হাত ধরে বলে, বসো খানিক।

দেখো না, আকাশ কেমন কালো করে এসেছে! এই জল নামলো বলে। এসব বলতে বলতে আকাশ জুড়ে মেঘ করে। মেঘের ছায়া পড়ে ধানি সবুজের বুকে। সাদা বকেরা তখন ডানা মেলে দিয়ে ঘরমুখো দৌড় লাগায়। মেঘের তলায় সেই সাদা ডানার ছবি একখানা পৃথিবীর মুখ হয়ে তখন দেখা দেয় এই গাঁ গেরামের মানসপটে। বড় বড় ফোটায় জল পড়তে শুরু করলে ধানের গোছা কেঁপে কেঁপে ওঠে ভেজা হাওয়ায়। আমরা তখন এক দৌড়ে বারান্দায় এসে উঠি। এই বারান্দায় দাঁড়ালে তখন কেবল মনে হয় ছবির মধ্যে ডুবে যেতে বুঝি ভারী সুখ। আসলে ছবির মধ্যে এই আমি আমার সমস্ত নিয়ে ডুবে যাচ্ছি নাকি এই আমার আস্ত একখানা চৈতন্যের মধ্যে এই মাঠ নদী আর ধানের ক্ষেত তার স্মৃতি সত্তা নিয়ে একখানা আধার পেতে চাইছে কে জানে! একবার মনে হয় এই আমি না থাকলেও তো এই মাঠ এই কাঁদড় তার সর্বস্ব নিয়ে এমন মায়ায় টইটম্বুর হয়েই থাকতো! মানুষের সাহচর্য পেতে তার বয়েই গেছে! আবার পরক্ষণেই মনে হয় মানুষের মগ্ন চৈতন্যের মধ্যে ডুবে যাবে বলেই না চারিদিকে এত আয়োজন!

এসব ভাবতে ভাবতে চায়ের কেতলি চড়িয়ে দিই। জানলার পাল্লা টেনে নিতে নিতে টের পাই আমার মাটির দেওয়াল বেয়ে কাদা গোলা জল কেমন নেমে এসেছে। সেই নেমে আসা জলরেখা যেন কোন পুরনো ব্যথার কথা বারে বারে মনে পড়িয়ে দিতে চাইছে এই সন্ধ্যায়। সেই ব্যথায় শোক নেই দুঃখ নেই, আছে কেবল না-মানুষী কোন ভাষাতীত বেদনার ভার। তার মধ্যে ডুবে যেতে যেতেই ফুটন্ত জলে চায়ের পাতা ছেড়ে দিই খানিক। পাতারা এখন জলে ভেসে ভেসে ক্রমে ডুবে যাবে কোন বেদনার ভারে। কেবল তলিয়ে যাবার আগে, তার গন্ধে ভরিয়ে তুলতে চাইবে একখানা অবয়বহীন মায়াজগৎ। সেই জগত এই আমার আপনার মতো মানুষের কোলাহলে ভরে আছে নিশিদিন। কেবল তাকে দেখবার ফুরসত মেলেনি এমন করে কখনও। ধানের মিঠে গন্ধ ভেসে আসছে উত্তরের হাওয়ায়। সেই গন্ধের মধ্যে ডুবে যেতে যেতেও চায়ের গন্ধে ভরে নিচ্ছি এই মন মগজ আর পার্থিব সন্ধ্যাবেলাখানি। এমন করে গন্ধের মধ্যে ডুবে যাওয়ার সুযোগ আগে কখনও হয়নি বলে কোনো খেদ আছে? নাহ্। জীবনের উপান্তে হলেও হলো তো! তাই বা কম কী! একটা জীবন তো যথেষ্ট নাও হতে পারে! ওই তো বেড়ার ধার বরাবর তালগাছগুলো! গাছ ভরে তাল পেকেছে। ও তালের মধ্যে সব কি আর পুরুষ্টু হয়ে ঝরে পড়বে? পড়বে না। শিবু তো বলেই দিয়েছে, এ পাড়ায় কেউ তাল পেড়ে খায় না। গাছ থেকে পেকে পড়লে তবেই মানুষের তাকে ভোগ দখলের অধিকার জন্মায়। গাছের তাল তাই খানিক খানিক গাছেই শুকোয়। মানুষের সাহচর্য পেতে তার ইচ্ছে করে বটে! কিন্তু উপায় কী আর! তা বলে কি গাছেদের কোনো খেদ আছে? নেই , নেই। ফলের আশা সে করে বটে তা বলে মুনাফার লোভ তার নেই। এই বিজলি নেভা সন্ধ্যায় চায়ের গন্ধে ডুবে যেতে যেতে ধানের গন্ধের চমক ভেঙে তাই জেগে জেগে উঠি একেকবার। যক্ষপুরী পালানো মানুষের মতো সেই ধানের গন্ধে আমি কেবল তখন নন্দিনীর ধানি শাড়ির আঁচলখানি দেখতে পাই মধ্যে মধ্যে। সে কি কম হলো কিছু! ঈশ্বরের পৃথিবীতে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে জোরে। সেই বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালে আপাদমস্তক ভিজে যেতে যেতে কেবল টের পাই আমার মগ্ন চৈতন্যের ভিতরে ভিতরে কী প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে আচমকা। সেই জলের তোড়ে গলে যাচ্ছে এই নশ্বর দেহের গন্ধ। এবার খালি নুনের পুতুলের সাগরে মিশে যাবার অপেক্ষা। (চলবে)

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box