রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

তেইশ.
নুনের পুতুল হয়ে যারা সাগরে মিশে যায় তাদের কি মগ্ন চৈতন্যে জাগরূক থাকার কোনো দায় থাকে? মনে হয় না। তারা কেবল ফাতনা ভাসিয়ে দিয়ে জলের মধ্যে মিশে জল হতে চায়। এই জলে মিশে যেতে যেতে মানুষের মুদ্রাদোষ জলের কিনারে ছেড়ে আসতে চায় যে মানুষ, আমি তাকে করুণা করি। মানুষ জন্মে খানিক কাদা মাটি লেগে যদি নাই থাকলো তবে আর লক্ষ যোনি ভ্রমণে লাভ কী? এই ভ্রমণ কি কেবলই মানুষ জীবনকে পাবার ব্যাকুলতায়? তা বোধহয় না। এই যে বেড়ার ধারটিতে বসে বসে বাবুই পাখি ঠোঁট দিয়ে ঘাস ছিড়ছে একমনে সে তো বাসা বাঁধবে বলেই। সে বাসায় মেঘলা দুপুরে আকাশের ছায়া পড়ে, বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে যায় ওর ল্যাজা মাথা সমস্ত, তবুও কী যত্নে ও বাসা বোনে অবিরাম! ওদের যত দেখি ততই টের পাই এই পাখি বা মাকড়ের জীবনের ভিতরেও আস্ত একখানা মানুষ জন্ম আছে। আপনার বিশ্বাস না হলে এই খেলেডাঙার মাঠে এসে দেখুন! এই সর্ষের মাঠের ওই প্রান্তে মরা দহের পাশে পলাশে ছাওয়া শ্মশান। পাখি আর সাপেদের স্বর্গরাজ্যে মানুষের চলাচল কম। তবুও মানুষ তো যায় ওই পথে! যারা যায় তারা টের পায় পাখিরাও ভিড় এড়িয়ে একলা হতে চায়। তারাও ভাদ্র শেষের বিকেলে উলট চণ্ডালের ফুল ফুটে থাকতে দেখলে অবাক মানে। দীর্ঘদেহী খরিস এইসব দেখে হয়তো বা। তারও নির্জনতায় ডুবে যাবার সাধ। বেলা পড়ে এলে নিজের চেনা পথটি ধরে তার যে এই চলাচল সে কি কেবল বিষে ভর্তি শরীরখানার জৈব নিয়মের বাঁদিগিরি! হতেও পারে হয়তো বা। তবু কেন জানি মনে হয়, না-মানুষের পৃথিবীখানাও ভারী আশ্চর্য রকমের মানুষ জীবন দিয়ে ঘেরা। মানুষের চোখ কবে তাকে দু-পলক দেখে থমকে দাঁড়াবে, তা নিয়ে ভাবতে তার বয়েই গেছে।

এখন দুপুর দুপুর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলে আমারও সাপেদের রাজ্য পেরিয়ে উলট চণ্ডালের ফুল দেখতে যেতে ইচ্ছে করে। তখন আর উপায় কি ! জানলার পাশটিতে বসে ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ খুলে বসি। ওই দূরে নদীর পাড় বরাবর দেখা যায় গুচ্ছ গুচ্ছ কাশ হাওয়ায় হাওয়ায় দুলছে। কোনো মানুষ এসব দেখবে বলেই কি আর নদীর পাড়, জলে ডোবা বালি খাদান এমন করে সেজেছে! কি জানি! মানুষ জীবনকে তখন অমূল্য বলে বোধ হয় বটে কিন্তু প্রয়োজনীয় বলে বোধ হয় না। বরঞ্চ মানুষের জোব্বাখানা খুলে রেখে ওই বর্ষার নদীতীরে, কাশের বেওয়ারিশ বনে যদি ঘুরে বেড়াতে পারতুম তবে বেশ হতো। সে তো আর হয় না, সে হওয়ার জো নেই। জানলার পাশটিতে বসে বসে তাই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামা দেখি। আকাশের আলো মরে এলে, একটি একটি করে করে সন্ধ্যাতারা ফুটলে সমস্ত কথা ফুরিয়ে যায়। কাস্তের মতো একফালি চাঁদ তার ম্লান আলো নিয়ে একা একা আকাশের মাঠে পায়চারি করবে আর কিছুক্ষণে। রাতচরা পাখিরা দেখবে তো সেসব। মানুষের পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়লেও দেখবে। মানুষের সঙ্গ লাভে সে অভিলাষী কিনা সে প্রশ্ন তোলা থাক বরং। তারচেয়ে ওই দূরে আঁধারে ডুবে আছে যে কাশবন তার উদ্ধত শিখায় কেমন করে প্রতিপদের চাঁদ তার ছায়া ফেলে যায় সে কথা কল্পনা করে নেওয়া যাক। সব কি আর চোখ দিয়ে দেখতে আছে? কান দিয়ে শুনতে আছে? মানুষ হয়ে না-মানুষ জীবনের সাধটুকু অন্তত থাক। ফাতনায় কখন টান আসে কে বলতে পারে?
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box