রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

পঁচিশ.

 শিবুর গল্প তো আসলে শোনাতে চাইনি! চেয়েছিলাম এই রুখু মাটি আর মানুষের দিন গড়ানোর গল্পের মধ্যে মিশে যেতে। সেই মেলামেশা যতই এগিয়েছে ততই টের পেয়েছি বাড়ি বদলের গল্পে আসলে জুড়ে থাকে না-মানুষী কতই অনুষঙ্গ। তবেই না এই খেলেডাঙার গল্প কেবলই মানুষের ঘরদোর টপকে ওই মাঠে, ওই কবেকার মরা দহে নেমে পড়তে চায়। একে কি কেউ ইতিহাস বলবে? নাহ। সে সম্ভাবনা নেই। তবু টের পাওয়া যায় একেকটা দিন ইতিহাসের গর্ভে তলিয়ে যেতে যেতেও তার শেষ রাগটুকু ছড়িয়ে দিয়ে যেতে চায়। সে সব রাগ সংগীতে তাল লয় কিছু আছে বটে, তবে তার কোনো পরিভাষা নেই। পরিভাষাহীন জীবন বড় বেশি গেঁয়ো। সে জীবনের গল্পে মানুষের আগ্রহ আছে কম বেশি তবে তার চেয়েও বেশি আছে নিতান্ত রক্ত মাংসের মানুষের খুব চেনা গন্ধ।

এই ধরা যাক বৃষ্টির জল নামতেই শিবু ফাওড়া হাতে মাটির ঢাল ঠিক করে এক মনে। ও কেবলই বলে চলে জল আর জল, এই জলে এবারে ধানে সব পোকা লেগে যাবে। এসব শুনে খানিক বিষন্ন যে হই না তা নয়! তবু, শিবুকে সান্ত্বনা দিতেই বোধহয়, বলে বসি – জানতো, সেই যে দাদাদের যে গ্রামে বাড়ি ছিলো সেখানে চারিদিকেই খালি জল আর জল। এই বর্ষায় লোকে পাশের বাড়িও যায় নিজের ডিঙি নৌকোখানা নিয়ে। শিবু খানিক অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। তারপর বলে, সে তো আমারও শ্বশুর বাড়ি যেতেও! কী কাদা, খুব বৃষ্টি হলে তোমায় সাইকেলখানা বাঙাল পাড়ায় রেখে যেতে হবে। এই রুখু শুখু দেশে বাঙাল পাড়া আজও তার স্পর্শ বাঁচিয়ে একটেড়ে পরে থাকে। বাঙাল কি কোনো জাত! কে জানে!

তারপর একথা সেকথায় সোনাব্যাঙের গল্প জমে ওঠে আমাদের। আহা অমন সোনার মতো হলুদ বুক পেটখানা কেবলই মনে পড়ে যায় আমার। শৈশবের বর্ষা আর নিরুদ্দেশ হওয়া সোনা ব্যাঙের গল্প ক্রমে জমে ওঠে আমাদের। শিবুর গল্পে হাড়ি-পাতিল ঢুকে পড়ে খুব সহজেই। বলে, সোনা গোদার মাংস খায় তো লোকে! আমি ঘাড় নাড়ি। এসব কথার মধ্যে দূর দিয়ে ওই হেঁটে চলেছে ডুরে শাড়ি পরা মেয়েটি। শিবু ওকে চেনে। ওকে দেখেই তাই শিবুর মনে পড়ে যায়, কোড়াদের কথা। বলে, জানো দিদি ওরা না চামড়া সুদ্ধু মাংস রান্না করে। ওদের রান্না তাই আমরা খেতে পারি না। সোনা গোদাও করে, চামড়া না ছাড়িয়ে। শিবুর এই কথায় অল্প বিষ্ময় যে প্রকাশ করি না তা নয়, তবু টের পাই শিবুর এইসব আপাত সরল গল্পেও জাতি সত্তার কী গভীর ছাপ রয়ে গেছে নিজেদেরই চর্যায়। সারা বিশ্বে কত রকমের যে মানুষ কত যে তার জীবনের গল্প, রান্নার গল্প তার কি হিসেব আছে কোনো! তবু তো আমাদের এই আমরা ওরার গল্প ফুরোয় না। সে এপাড় বাংলা ওপাড় বাংলা হোক অথবা সোনা গোদার গল্প। আমার মনে পড়ে যায় সেই ঘোর লাগা বর্ষায় সারা উঠোন জুড়ে তাল শামুকেরা কেমন আলপনা দিয়ে যেতো! বিরাট বিরাট লাফ দিয়ে সোনা ব্যাঙের দল আমায় চমকে দিতো আচমকা বজ্রপাতের মতো। সেসব ফুরিয়ে গেছে কবেই। এখন কেবল শিবুর সঙ্গে আমার সেই ছোটোবেলার গল্পে ডুবে যাওয়ার অবসরটুকু আছে। সেই অবসরের মধ্যে দুবে যেতে যেতে টের পাই আপামর মানুষের কাছে যারা আদিবাসী তাদেরও কত কত ভাগ, কত কত পাকশালের গল্প। এই গল্পগুলো নিয়েই ওরা চলতে থাকে ওই মাঠে মাঠে কানা নদীর বাঁকে বাঁকে। চলতে চলতে এই আমি বা শিবু আমরা কি আদৌ আপাদমস্তক মানুষ হয়ে উঠবো কোনদিন! হয়তো, হয়তো বা না। (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box