রাঙাধুলোর গান

অমৃতা ভট্টাচার্য

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

ঊনত্রিশ.

এমন সকালে আর কী হবে বলুন! ওই যে ধান কাটা শুরু হয়েছে মাঠে মাঠে। কেমন করে একখানা বচ্ছর ঘুরে আবার আরেকখানা বচ্ছর এসে পড়লো বলুন! এই এক বছরে এই চির চেনা পৃথিবীখানা ওর মাটি জল আর আকাশটুকু নিয়ে আরও খানিক বুড়ো হলো বইকী! তবু আপনার আমার মতো ওর চুলে তো আর পাক ধরে না! ওর শরীরখানা মানুষী ক্লান্তিতে শ্লথ হয়েও পড়ে না সহজে। কেবল মানুষ যখন মাটির তলা থেকে ওর মরা ধন টেনে টুনে বের করে , তখন কেবলই ওর মনে হয় জরার চেয়ে মৃত্যু ভালো। জরাগ্রস্ত মানুষের কষ্ট বেজায়। এই দেখুন, কেন এমন শীতের সকালে জরাগ্রস্ত মানুষের কষ্ট কত! চারিদিকে খেঁজুর গাছ কাটা হয়েছে এদিক সেদিকে। বাকল খসানো শরীরের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে হেমন্তের সকালে । জরায় কাবু হয়ে যাওয়া মানুষ এমন সময়ে আতপের আশ্বাস খোঁজে। কবজির জোর ফুরিয়ে এলেও কাঁঠাল কাঠের পিড়িখানা টেনে এনে তার ভারি ইচ্ছে ঘরে উঠোনের পাশটিতে গিয়ে বসতে। ইচ্ছে থাকলেই কী আর উপায় হয়! জরায় জবুথবু মানুষ তাই দিনমানেও আঁধার মেখে থাকা ঘরে শুয়ে থাকে তার তেলচিটে বিছানায়। এক পাশে জড়ো করা কাঁথা-কানি থেকে একখানা গুমোট গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে চায় এই দুয়ার ভেজানো ঘরের দেওয়ালে দরজায়। আধ বুড়ো পৃথিবীর এসব ভাবলেও ভয় করে। সেই কোন আঁধারে ঘেরা অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে তার ইচ্ছে করে না মোটেও। বরং এই বিরান মাঠের প্রান্তে বসে তার ইচ্ছে করে একখানা চুট্টা ধরিয়ে দিয়ে কেবলই দেখতে আর কেবলই দেখতে। হাটিটি, বাঁশপাতি আর বালি হাঁসেদের দেখে দেখে তার আর মেটে না যেন। থমকে থাকা জলে কুয়াশার মেঘ ভেসে আছে কী যেন এক ইন্দ্রজালে। এসব দেখতে দেখতে কারই বা ইচ্ছে করে আঁধার গহ্বরে তলিয়ে যেতে! আমাদের এই মাটি আর জলের পৃথিবী তাই আলপথ ধরে ধরে চলেছে ওই দূরে। সকালের আলোয় ওর আঁচলখানা উড়ছে আর উড়ছে। পাঁজা করে ধান বয়ে নিয়ে চলেছে যে মেয়ে সে কি ওই পৃথিবীর মুখখানা দেখেছে! কী জানি! মানুষের চোখে কী যে ধরা দেয় আর কী যে দেয় না তার খবর রাখে কে! কেবল বিরান মাঠখানা টের পায় নরম পায়ের ছাপ ফেলে কে যেন এক মেয়ে আঁধারে হারিয়ে যাবে বলে কেবলই চলেছে আর চলেছে।

আমাদের নতুন বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালে এমন সকালে রোদ্দুর আর বিলীয়মান কুয়াশার ছবি দেখা যায় হামেশাই। আস্ত একখানা মানুষের বাড়ি এই মাঠের পাশটিতে দাঁড়িয়ে আর কতদিন এমন করে মাটি জল আর পাকা ধানের আঘ্রাণ পাবে জানা নেই। ওই আধবুড়ো পৃথিবীর মতোই মনে মনে সে তাই চলে যেতে যায় ওই আলপথ বরাবর। চাইলেই কি আর সবাই সব পারে? জঙ্গম মানুষের আস্ত একখানা বাড়ি তাই অচল দাঁড়িয়ে থাকে হেমন্তের ভোরে। তার ছাদে এসে বসেছে ওই একখানা বুলবুলি, না না একখানা কেন হবে! ওর দোসরও আছে আরেকখান। ওই নুয়ে পড়া বেড়ায় দোল খাচ্ছে বাবুইয়ের দল। রোদ্দুর আরেকটু বাড়লে হলুদ বোলতার দল ওই পাটা ছাওয়া বারান্দায় এসে জিরোবে খানিক। জঙ্গম জীবনেরও কি থাকে থিতু হওয়ার দায়! জানে না এসব নতুন বাড়ি। সে কেবল ছিন্নমূল মানুষের মনে আস্ত একখানা জীবন বুনে দিতে চায়। মাটি আর মানুষের গল্পে তার দায় এটুকুই। হেমন্তের রোদ্দুর বাড়ছে ওই। রোদ্দুর কেবলই এবার পিছলে যাবে সোনালী মাঠের ওপারে, নদী পেরিয়ে বন পেরিয়ে সেই কোথায়, কত দূরে!! (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box