রাঙাধুলোর গান…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

তিন.

এই যে ইলামবাজার জঙ্গল পেরোতেই ডানহাতে ঢুকে গেছে একখানি পথ! তার কোল ঘেঁষে ধল্লা আর আমখই। কত হাজার বছরের পুরনো পুরাতাত্ত্বিক গল্পের স্তর ওই মাটির নীচে এতকাল মুখ বুজে শুয়ে ছিলো। আদিম গাছেদের প্রস্তরীভূত মায়ায় মানুষের রক্তের দাগ ছাপ ফেলতে পারে না সহজে। যদি পারতো, তবে হয়তো দেখা যেতো – গাছেদের মতো মানুষের মনও টিকে থাকে পাললিক শিলার খাঁজে খাঁজে। পুরনো মানুষের গল্প তাই বানিয়ে নেওয়া যায় মনে মনে কিন্তু তার পাথুরে প্রমাণ এখানে জোগাড় করা শক্ত। বর্ষার দিনে মাটি ধোয়া জলে ভরে ওঠে ছোটো বড় ডোবা, মাঝারি পুকুর। সেই লাল জলে গোড়ালি ডুবিয়ে সাবানমাটি দিয়ে ঘাড়,বুক, গ্রীবা মেজে নিচ্ছে যে ভূমিকন্যারা ওরা কি বলতে পারে এই গাঁয়ের ইতিহাস? পারে না, পারে না। তারা কেবল বলতে পারে পাঁচপুরুষ আগের গল্প। তারা বেমালুম শুনিয়ে দিতে পারে, কেমন করে তার দিদিমা বিয়ে হয়ে গিয়েছিলেন খেলেডাঙায় স্বামী-শ্বশুরের ঘর করতে। সেই খেলেডাঙা, যেখানে ঘরে ঘরে ছেলে বুড়ো সকলেই বল্লা আর তীর-ধনুক বানাতে ওস্তাদ। সাঁওতাল বিদ্রোহের গল্পে তাদেরও ভূমিকা ছিলো কিছু। সব কিছুরই কি আর কাগুজে প্রমাণ থাকে? থাকে না, থাকে না। এই যে ইলামবাজার জঙ্গল হয়ে পায়ে পায়ে খেলেডাঙায় পৌঁছনোর মেটে পথ, তা দেখতে লোকে আর ভিড় করবে কেন বলো! দামাল সত্তরের লাল টুকটুকে নিশান ওড়ানো পথ শাল আর আকাশমণির পাতায় ঢেকে গেছে কবেই।

এ গাঁয়ের নকশাল করা বুড়োদের গল্প তাই তামাদি হয়ে গেছে। বলেছি না, মানুষের গল্পের কোনো পাথুরে প্রমাণ থাকে না সবসময়। থাকে না বলেই তো কেমন মানুষের কৌতুহলের বাইরে গিয়ে দু-দণ্ডের জিরেন পেয়েছে এই গাঁ, এই জমি, মাঠ আর সোনালি ফসলের ক্ষেত। খুব ভোরে, ধরা যাক এমনই নরম শীতের সকালে বল্লভপুরের পুর থেকে যদি হেঁটে আসা যায়! তবে খানিক এগোলেই কদবেল আর অর্জুন গাছেদের ভিড়। ভাগ্য ভালো থাকলে দু-একটা গাছপাকা বেল জুটে যেতে পারে হামেশাই। এতো মিঠে কয়েত বাজারে মেলে না কিন্তু সহজে! খেলেডাঙার মানুষ বলে – কোচলে।নরম রোদ্দুরে বসে কোচলে মেখে খাওয়া যেতেই পারে তবে সে দুপুর-বিকেলে, এখন না। এখন তো কেবল ভোর, এখন ঊষা। এই কোচলে আর অর্জুনের নিশান পেরোলেই ডানহাতে শ্মশান, ক্ষেত আর বিক্ষিপ্ত সোনাঝুরি। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে এরা সকলেই যেন জাপানি চিত্রকরের নরম বুরুশে নিজেদের সকালবেলাখানি আঁকিয়ে নিয়েছে। চাইলেই কি এই মাঠ আর আবাদি জমির দিকে পায়ে পায়ে নেমে যাওয়া চলে? কেবল কী চিতাকাঠ আর খাদের কিনারে ঝুলে থাকা চাঁদই মানুষকে সময়ে সময়ে ডাকে! এমন সকালেও মানুষ চলে যেতে চাইতে পারে। যে-কোনো দিকে। অকারণেই। এই যেমন রাস্তাখানা, সে চলেছে ওই আমাদের গাঁ – খেলেডাঙার দিকে। গাঁ পেরিয়ে সে চলে যেতে চাইবে আরও দূরে। লোহাগড় হয়ে বিনুরিয়া হয়ে আরও পরে। কিন্তু এমন আশ্চর্য করা সকালে তার একটু না বসে উপায় কী বলো! খেলেডাঙার সকালে তাই পথ খানিক থমকে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। চলুন তবে, আমরাও খানিক দেখি।

এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয়ই টের পেয়েছেন, খেলেডাঙায় দুই পাড়া – উঁচু আর নীচু। সেই ভোর থেকে উনুনে উনুনে আঁচ দেওয়া শুরু হয়। ভোর ভোর ভাত খেয়ে মানুষেরা কাজে যাবে। এমন ভোরে ওই এক চিলতে দোকানে তাই উপচে পড়া ভিড়। গুটি গুটি পায়ে এ পাড়ার গুটিপোকারা এসে আঙুলে ভর দিয়ে মুখ উচিয়ে দাঁড়ায়। কচি হাতে মুঠো করা পয়সা। কেউ বলে পাঁচ টাকার তেল দাও। কেউ বলে দশটাকার সার্ফের প্যাকেট দাও। হাতে প্যাকেট ঝুলিয়ে গুটি পোকারা তারপর বাড়ির দিকে দৌড়োয়। মায়েদের আর ঘর সামলে মাঠ সামলে সময় কোথায় বলো! এখন তো ঘরে ঘরে ধান উঠেছে, মানুষের কী আর মরবারও যো আছে! যারা বড় চাষী তারা আজকাল মেশিনে ধান কাটায়। ঘণ্টায় তিনহাজার টাকা দিয়ে ভাড়া নেওয়া মেশিনে বিশ-পঁচিশ মুনিষের কাজ একাই করে ফেলে নিমেষে। খেলেডাঙার মানুষ এসব দেখে কিন্তু মেশিনের রেস্তো আর কোথায় তাদের! তাদের হাতে হাতে তাই কেস্তে, জলের বোতল আর টিফিন ক্যারিয়ার। যেটুকু নিজেদের জমি আছে সে তো নাহয় গেলো। তা বাদে আছে ভাগচাষের জমিজিরেত। সকলের ঘরে ঘরে ধান উঠে গেছে প্রায়। এমন কুয়াশার চাদরে ঢাকা মাঠে কেবল কিছু ধান শিশিরে শুয়ে শুয়ে শীতের জাড় মাখছে। এই ধান আঁটি বাঁধা হবে, মোষের গাড়িতে উঠবে, তবে না ঘর যাবে! আর যাদের ধান তোলা শেষ, এমনকি ঝাড়াই বাছাইও – তারা আর খানিক বাদে নরম রোদ্দুরে বসে ধান ঝাড়বে। মাথায় গামছা বেঁধে কুলোর বাতাস দিয়ে ধানের গায়ে লেগে থাকা কুটো ওড়াবে। আর মায়ের কোলে লেপটা থাকা ছেলে সেই অবসরে একা একা গাদা করা খড়ের গাদায় উঠে সকালের আলোয় নিজেকে মনে করবে রাজা-উজীর। কুয়াশা আর রোদ্দুরে মিলেমিশে আলোর জাফরি-কাটা রোদে এই আস্ত মাঠ-ময়দান আর মানুষের কর্ম মুখরতায় জেগে উঠছে যে ঘর-বসতি আর শালিজমির মানচিত্রখানি তা কিন্তু বাংলার খুব চেনা ছবি বলে দাগিয়ে দিলে চলবে না! মাটি আর মানুষের গল্পে সকলের চেনা একটা গন্ধ মিশে থাকে বটে , অন্তত এই ভোরের মায়াবী মাঠের একপ্রান্তে দাঁড়ালে তেমনটাই মনে হওয়া সঙ্গত। তবে কী জানেন, মাটি মাঠ আর কাঁদড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের ঘ্রাণ। (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box