রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

ছয়.

এ গাঁয়ে গল্পের জোগান অফুরান। মাঠে ঘাটে শরবনের ঝোঁপে ঝাড়ে সে দিনেরাতে গজিয়ে উঠছে বুনো ফুলেদের মতো, অকারণ প্রশ্রয়ে। তাই দেখছেন না এখানে কেমন পাখিদের আনাগোনা। ধানকাটা মাঠে ওই যে ছড়িয়ে আছে মেশিনে কাটা খড়! ও খড় গরু ছাগলে ছোঁবে না। তেলের গন্ধ লাগে যে! ওই খড় আর কদিনে মাটিতে মিশে মাটি হবে বটে কিন্তু তারও খানিক দেরী আছে। এখন কেবল খড়ের ঝোঁপে, হাতে কাটা ধানের গোড়ায় শালিখ আর মুনিয়াদের ভিড়। শালিখেরা সারাদিন এখন পেট পুরে ধান খাবে। ওরা তো মারি পেরিয়ে, বাজারি অর্থনীতির আগ্রাসন পেরিয়ে এখনও ততটা ক্লান্ত হয়নি! ওরা তাই পেট পুরে ধান খায়, গপ্পো করে আর ঝগড়া করে গলা খুলে। মুনিয়াদের কিন্তু এত খাবার গরজ নেই। তারা যেন সব স্কুল পালানো নাবাল কিশোরী। ডানায় এমন ছন্দ মেলে দিয়ে তারা কি মানুষের কাজ ভুলিয়ে দিতে চায়? ঝকঝকে ফিরোজা আকাশে আশমানি আলো ছড়িয়ে পড়া দেখতে দেখতে তাদেরও কি ইচ্ছে করে না ওই আকাশমণির উঁচু ডালটিতে গিয়ে বসতে! করেই তো, করবেই তো। তবু মুনিয়া শরের খাড়াই শিষে বসে বসে দোল খায় আপন মনে। কমলাপাতি আর বাঁশপাতিদের তখন পোকা ধরার নেশায় পেয়েছে। ইলেকট্রিক তারে দোল খেতে খেতে তারা দেখে ওই পশ্চিমের মাঠে জল মরে গেছে পানা পুকুরের। কে বলবে ওখানে একটা আস্ত পুকুর ছিলো! জল মরে আসা পাঁকে কত কত মীনজীবন এখন কেবল স্থির হয়ে আছে বর্ষার অপেক্ষায়। তাদের শীতঘুমের স্বপ্ন তাই ফুল হয়ে ফুটেছে সারা মাঠ জুড়ে।

মরে যাওয়া পুকুরে এমন আকাশ ভরিয়ে ঢোল কলমিও ফোটে? নরম গোলাপি-বেগুনি তাদের ফুল ছড়িয়ে আছে অবিন্যস্ত কবিতার মতো। খেলেডাঙা তো বিভূতিভূষণকে চেনে না, যদি চিনতো তবে নিশ্চয়ই তার মনে হতো আস্ত একখানা ছোটগল্প ভারী নাজুক ভঙ্গিতে মাঠ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে। শেষ দুপুরের রৌদ্রে সাদা ডানা মেলা বকেদের এখানে অবাধ উড়ান। মানুষের সাহচর্য এড়িয়ে যেতে চায় ওরা। তবু কী আশ্চর্য না, মানুষের কিন্তু ভারী ইচ্ছে করে ঢোল কলমির বনের পাশটিতে বসে সূর্যাস্ত দেখতে। জীবনের একেকটা ভারী ব্যস্ত কেজো বিকেলকে তখন তার নেহাতই করুণা করতে ইচ্ছে করে। জীবনের কী অপূরণীয় ক্ষতি সব!

বাঁশপাতিদের অস্থির ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে বিকেল নামবে ভারী কেতাদুরস্ত নিয়মে। আপিস টাইমের বাঁধা হাতঘড়িটির মতো তার যেন সারাক্ষণ সময়ের খবরদারি। এই মাঠ, এই শরেদের ঝোঁপ সব আঁধারে ডুবে গেলে ঢোল কলমির ফুলেরা কী করে? তারা কি চাঁদ মাখে? আঁধার মাখে ?এই বুঝি তাদের সহজাত রূপটান! মানুষের মগজ দিয়ে তো আর আপার্থিক মায়াকে ধরা সহজ নয়, তার চেয়ে চলুন খানিক বসি ওই বাঁশের মাঁচাটিতে। এখন এই প্রথম সন্ধ্যায় শুক্ল পক্ষের চাঁদ যতক্ষণ না মাথার পিছনে তার ছায়া ফেলবে ততক্ষণ কেবল ডেকে ডেকে সারা হবে হাটিটির দল। ভারী উচ্চকিত সে ডাক। তার ডাক শুনতে শুনতে আপনার মনে হতে পারে সে যেন কাউকে ঘরে ফিরতে বলছে কেবলই। ভারী সকরুণ তার ভঙ্গিটি। চাঁদের আলোয় আসলে কি হাটিটিরাই ডাকে? নাকি এই খেলেডাঙাই তার গাঁয়ের মানুষদের কেবলই ঘরে ফিরিয়ে আনতে চায় ফিনিক ফোটা জোছনায়? সে কেবল চায় এই মায়াবী জোছনা পেরিয়ে ঘর মুখো মানুষ এখন চাট্টি গরম ভাত খাক কলাই ডাল দিয়ে। এইটুকুই তো, আর কী!

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box