রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

সাত.

খেলেডাঙার গল্প লিখতে বসে মাঝে মধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলাটা দেখছি স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। মানুষের স্বভাব কি সবসময় আর তার নিজের হাতের মুঠোয় বন্দী থাকতে চায়? স্বভাবেরও তো ইচ্ছে করে এই মাঠ, এই শুকনো কাঁদড় পেরিয়ে একেকদিন বিবাগী হতে! তখন আর মানুষের দাসত্ব সে স্বীকার করতে চায় না। এই যেমন আমি পাথুরে উঁচু টিলাটার উপরে বসে বসে পৌষের মাঠ দেখছি। শহরে গঞ্জে একে লোকে স্টোনচিপসই বলে, এখানে সবাই বলে পাত্থর। এই দ্বিত্ব ‘থ’এর স্বরপ্রয়োগ যেন পাথরের ভিরতকার পাথুরে স্বভাবটিকে প্রকট করে দিতে চাইছে বার বার।

সে যাইহোক, ওই উঁচু টিলা মতো পাথুরে আসমতলে বসলে পশ্চিমের খেত, তালের সারি, দুপুর শেষের আকাশ এই সব বেশ নজরে আসে। একা একা বসে এসব দেখি আর ছাইপাস ভাবি কত কী! এমন সময় লাঠি হাতে সামনে এসে দাঁড়ায় সুন্দরী গোগো। তার চুলে বয়সের ছাপ পড়েছে, মুখের বলিরেখায় সময়ের পলি জমেছে, তবু কী সুন্দর তার মুখখানি! হাতের ইশারায় সুন্দরী গোগো ডাকে, বলে – এট্টু চা খাওয়াতে পারিস বিটি। বলি, চা তো হবে, আগে এখানে বসো তুমি। গল্পের বোচকা নামিয়ে কখন যে গগোতে আমাতে গল্পে মজে গেছি সে খেয়াল আর নেই। গল্পেরই কি খেয়াল আছে! সে তখন এদিকে সেদিকে হাঁটা লাগিয়ে দিতে চাইছে আপনমনে। শীতের হাওয়ায় সুন্দরী গোগোর চাদর উড়ে যেতে চাইছে বেসামাল। চাদরটাকে টেনে গুটিশুটি হয়ে গোগো এবার উবু হয়ে বসে চা খাবে আর টুলটুল করে গল্প করবে। ওদিকে গোরু বাছুর চরছে আপন মনে, গোগো জানে ওরা এখন এদিক সেদিকে আর চলে যাবে না। গল্পে গল্পে কত কথা ওঠে, আমি বলি – আমায় তোমার ভাষা শিখিয়ে দেবে কাকীগোগো? সুন্দরী কাকীমা হাসে। বলে আমার সঙ্গে গল্প কর, গল্প করতে করতেই ভাষা শিখে যাবি তুই। ইস্ তাই আবার হয় বুঝি! এই সব ইস্কুল পাঠশালা যদি তোমার মতো করে ভাবতে পারতো গোগো তবে এই চক ডাস্টার কাগজ কলমের আর কী দরকার ছিল বলো? পাথুরে মালভূমি সদৃশ টিলায় বসে বসে কোমর ধরে গেছে এবার খানিক। একটু উঠে দাঁড়াই। সুন্দরী কাকী কিন্তু আরেকটু গল্প করতে চায়। বলে দুড়রুমে, দুড়রুমে অর্থাৎ বসো বসো। অগত্যা বাধ্যছাত্রীর মতো বসে পড়ি আবার। সুন্দরী কাকীর ভাষায় গোগো মানে মা, কাকীগোগো হলো কাকীমা, বুড়িগো হলো ঠাকুমা। এইটুকু শিখে আমি বলি তুমি তাহলে কাকীগোগো তাই তো? ভারী সুন্দর করে হাসতে পারেন বৃদ্ধা। বয়সকালে কী সুন্দর যে তিনি ছিলেন আমি অনুমান করতেই পারি। পেকে ওঠা কানে কাপড়ের পুঁটলি গুজে রেখেছেন পৌষের হাওয়া আটকাবেন বলে, তবু অন্য কান বাড়িয়ে দিয়ে গল্প করতে ভালোবাসেন। খুব নরম গলায় এবার তিনিও তাঁর গল্পে ঢুকে পড়েন। বলেন, মেয়েটা খালাস দিতে গিয়ে চলে গেল এই দু’বছর আগে। ঠিক তোর মতোই ওর মুখটা। তুই আমায় গোগো বলিস। আমি তোর মা, তুই আমার মেয়ে! কেমন হলো তো? গোগোর এই কথার পরে আমার কি আর কথা থাকে?

বাড়ি বদলে গেলে মানুষের তো কত কী বদলায়! এ যেন নদীর গতিপথ পাল্টানোর মতো নিতান্ত সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক পাতানোর গল্প। এই গল্পের রাশ আমার হাতে থাকবে কেমন করে? মানুষের চিরচেনা খবরদারি সে সইবে কেন? গোগো এবার তার হাত নেড়ে চোখে-মুখে কথা বলে যান। কথা শেষ হলে বলেন, বুঝলি? আমায় কি তেমন ছাত্র পেয়েছো গোগো! আমি ঘাড় নাড়ি। বলি কিছুই তো বুঝলাম না! তুমি আমায় বাংলায় বুঝিয়ে দাও। সুন্দরী গোগো এবার তর্জমা শুরু করেন। বলেন, ‘ওই যে দূরে দূরে গোরু চরছে কী সুন্দর! আরও দূরে গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে! এই মাঠ এই কাটাধানের খড় সব মিলিয়ে কী সুন্দর লাগছে! যেন একটা ছবি হয়ে উঠেছে।’ আমার শিক্ষক, এই নিরক্ষর মানুষটির মধ্যে – পড়ন্ত বেলায় আমি একজন শিল্পীকে দেখি। মাঠে মাঠে গোরু চড়ানো দুপুরে তিনি বসে বসে তবে ছবি দেখেন? কেজো মানুষের হাড়ি, হেঁশেল আর ন্যতা কানির মধ্য দিয়েও জীবনকে দেখার সাধ তার এতটুকু ফুরোয়নি তবে! তার ধুলোমাখা ফুটিফাটা পায়ের কাছে আম মনে মনে একমুঠো শালের মঞ্জরী রাখি। গোগো বল, এবার উঠি রে। আসবো, চা খেতে। আমি খানিক হাসি এবার। বলি এসো, আমায় তোমার ভাষা শিখিও। তোমার ভাষা গল্প করতে করতে শিখে নিতে পারবো কিনা জানি না তবু তোমার কাছে গল্প শোনার লোভ রইল।

লাঠি ঠুকে ঠুকে গোগো চলে যাচ্ছে। ওই মাঠ পেরিয়ে উঁচুপাড়ায় ওর ঘর। ওই দূরে আবছায়া হতে হতে গোগো মিলিয়ে যাবে আর কিছুক্ষণেই। এমন ছবি দিয়ে যিনি ভাষা শেখান আমার তাঁর ছাত্র হতে ভারী ভালো লাগে তখন। আমিও তাই বসে বসে দেখি মাঠ, গোরু আর গাছেদের নিয়ে কেমন করে একটা ছবি তৈরি হয় এমন আশ্চর্য বিকেলে। (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box