রাঙাধুলোর গান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

আট.

এভাবেই নিজের মতো করে খেলেডাঙায় দিন ফুরোয় রাত ফুরোয়। আপাত ভাবে একটা ঘতিহীন জীবনের মধ্যে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকে এ গাঁয়ের ছেলে বুড়ো সক্কলে। তবু তার মধ্যেও কি আর ঘটনার মেঘ জমে না! জমে তো। সেই মেঘ আচমকা এক পশলা বৃষ্টির মতো ছাতাভুলো মানুষকে ভিজিয়েও দিয়ে যায় চকিতে। তবে সেসব উত্তেজনার গল্প বরং তোলা থাক, সে আরেকদিন হবে না হয় বরং।

খুব স্বাভাবিক যে জীবন তাকেই না হয় একটু কাছ থেকে দেখা যাক খানিক। এই যেমন আমাদের দুর্লভ আজ থলে ভরে কাটকোম এনেছে। খুব সলজ্জে সাইকেলের হাতল থেকে থলে খানি নামিয়ে রাখতে রাখতে সসঙ্কোচে কী যেন বলতে চাইছে ও। বালি সিমেন্ট মাখার গামলা আছে বেশ কিছু, তারই একখানায় থলের মুখ উপুর করে দিচ্ছে এবার। পুরুষ্টু পুকুরের কাঁকড়ারা দাড়া খড়মড়িয়ে নড়েচড়ে উঠছে এর ওর গায়ে জড়িয়ে মড়িয়ে। সকলে কার্ণিক ফেলে ওলন ফেলে এখন কাটকোম নিয়ে গল্প করছে। করবেই তো! দুর্লভের বাবা পুকুর ছেঁচে এই এত্ত কাটকোম পেয়েছ। তার খানিক নিয়ে এসেছে দুর্লভ। সারাদিনের কাজের শেষে আজ কাটকোমের ঝাল হবে। বেশ মাখা মাখা ঝাল দিয়ে মুড়ি খেতে সুখ আছে। মুরগী বলো আর কাটকোম বলো ভাতের চেয়ে মুড়ি দিয়ে জমে বেশি। এইসব কথা এ গাঁয়ে কাউকে আর শিখিয়ে দিতে হয় না। পৌষের বিকেলে তাই কাজ শেষে সক্কলে সর্ষের তেল মেখে চান সেরে নেয় আরাম করে।

এবারে আকা ধরানো হবে, কাটকোম কাটা হবে। হাতুড়ি, বাটালি আর ছেনি দিয়ে কি কেবল শ্রমের তাবেদারি করতে হয়? কেমন যত্ন করে শালের পাতায় পেঁয়াজ, আদা, রসুন গুছিয়ে রাখা আছে। পুরুষের কাজেও আসলে মিশে থাকে কত শ্রী, কত যত্ন সেকথা এই আকা(চুলা) আগুন আর সন্ধ্যার আকাশ জানে। লাল মুনিয়ার মতো মেঘ ডোবা সন্ধ্যায় আকাশের সাতটি তারা ফুটে ওঠে যদি ফুটুক না, দুর্লভ তো জীবনানন্দ পড়েনি ও কেবল ভারী যত্নে রান্নায় মিশে যেতে শিখেছে। এই সুরকি ভাঙা হাতে কেমন নরম করে ও ধনেপাতা কুচিয়ে রাখে! কতই বা বয়েস ওর, কুড়ি বা একুশ। কাটকোম রান্না হয়ে গেছে এতক্ষণে। সকলে সারি বেধে বসেছে সিমেন্টের বস্তা পেতে। পাতায়

পাতায় মুড়ি আর ঝাল ঝাল কাটকোম খেতে খেতে মানুষের সঙ্গে মানুষ গল্প করছে। সে গল্পের বিষয় আশয় জেনে আর কী করবেন! শ্রমজীবি মানুষের গল্প যেমন হয় আর কী!

খানিক গল্পগাছা সেরে বাড়ি ফিরে যাবে সক্কলে। আকার আঁচ নিভু নিভু হয়ে এলে দু-চারটে টমেটো শিকে গেঁথে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুড়িয়ে নেবে ছেলেপুলের দল। তারপর গোল হয়ে আগুন জ্বেলে হাত সেঁকবে আর গল্প করবে ওরা। মাঠ আর আলপথ ধরে বিক্ষিপ্ত সেই ধোঁয়ার কুণ্ডুলি শীতের সন্ধ্যায় থমকে থাকবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তারপরে ধীরে ধীরে হিমে মিশে হিম হবে। শেয়ালেরা এমন সময়ে এদিক সেদিক থেকে ডেকে ওঠে দলে দলে। শীত খুব বেশি মনে হলে এই বালি সিমেণ্টের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ওরা একে একে এসে পাটা লাগানো কাঁচা সিমেণ্টের সিঁড়ির তলায় শুয়ে থাকে একেকদিন। বড় বড় বুনো খরগোশ এসে ঢুকে পড়ে যদি এ তল্লাটে তখন ওদের আর পায় কে! শিশির ভেজা মাঠ এইসব দেখে একা একা। কবিতার ভিতর ডুবে যেতে যেতে দুঃস্বপ্ন দেখা মানুষ যেমন করে পাশ ফিরে শোয়, এই মাঠও তেমন। পাশ ফিরে শুলেই কি আর ঘুম আসে! তাই কেশবতী কন্যার মতো চুলের গোড়া আলগা করে দিয়ে এই মাঠ আকাশ দেখে আর ঢলে পড়া তারাদের দেখে। তারারাও এসব দেখে কি?

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box