রাঙাধুলোর গান…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবনদা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

এক.

বাড়ি বদলে যায়। কী আশ্চর্য না! রমাপদ চৌধুরী কেমন এই শব্দের মধ্যে থিতু হয়েছেন যেন আজন্ম কাল ধরে। সেই শব্দ প্রাকার পেরিয়ে আবাদি জমি আর অবিন্যস্ত কাঁদড়। দূরে দূরে তাল আর সোনাঝুরি দাঁড়িয়ে আছে সেই কোন কবে থেকে যেন। এখানে ভোরের কুয়াশা থমকে থাকে খানিক। পাতায়, ঘাসে শিশিরের জল টুপটুপিয়ে পড়ে। জীবন এখানে শান্ত। ধান কাটা হয়ে গেছে এই তো ! ক্ষেতে পড়ে আছে ধানের গোছা। এলানো শরীর তাদের হিম আর রোদ মাখে দিনে রাতে। আঁটি বাঁধা হলে মোষের গাড়ি চেপে ঘরে যাবে সব। এই আকালের বচ্ছরে খড়ের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। কাহনের দর জানতে গেলে বুকে ছ্যাঁকা লাগে। তবু তো মেসিনে কাটা খড় এজমালি জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। মোষ বেঁধে দিয়ে যায় ওপাড়ার শিবু, মনিরুল আরও কত কে। আল বেঁধে জল দাড় করিয়ে দেবে আর ক’দিনেই। খড় পচে সার হবে। মেশিনে কাটা খড়ের আর গতি কী ! মানুষের হাতে কাটা খড়েরই দাম কেবল। তাও তো এই দেড় হাতি খড়। দেশি ধানের খড় আর এদিকে কোথায়! তবু খড়ের দর নিয়ে কথা হয় এদিক সেদিকে। কথা হয় ধানের দর নিয়ে। আজ বাদে কাল লবানের দিন ধার্য হবে। গ্রামের মানুষ সেই নিয়ে খুব যে বিচলিত তা নয়। তবু, দিন ধার্য হলে বোলপুরে গিয়ে মেশিয়ে চিঁড়ে কুটিয়ে আনতে হবে তো! সেই বুঝে ধান ভিজোতে হবে হিসেব করে। এ গ্রাম হাতে পায়ে খুব বড় না হলেও কী হবে সেই কোন পুরনো গল্পের স্বাদ মেখে পড়ে আছে একটেড়ে। গল্পেরা আসলে অমনই। আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো। সেই কবে কোপাইয়ে বন্যা হলো, বালির খাদানে মানুষের মিছিল সেই তবে থেকেই। বালি আর নেই তবু মানুষ আছে। সে তো থাকবেই। তাই নিত্যদিন গাড়ি চলে এই পথে। তারা তোমায় চিনিয়ে দেবে খানিক। বাকিটায় আছে বনকুল আর হাটিটিদের রাজত্ব। সেসব পেরিয়ে গেলে ওই দূরে দেখা যায় ইসলাম পুরের ইঁটভাটা। শামুকখোল আর বালিহাঁসদের ওখানে অবাধ উড়ান। আর কদিনেই রোদ্দুর আরও নরম হয়ে আসবে। তখন নদী ফিরতি মনে হবে সামনের কালভার্টটায় খানিক বসি। আলো আর সোনালী ছায়াদের মায়ায় পৃথিবী এখানে সুন্দর। দুপুর এখানে কথা বলে না। আকাশের সঙ্গে তার আলাপ চলে মনে মনে। এমন দুপুরে কিন্তু যশোমতী একা একা গরু চড়ায়। তার সুঠাম দেহ। তার নির্মেদ পায়ের গোছ কতদিন ধরে এই মাঠ, গাছ আর আকাশকে ভালোবেসেছে। তবু তারও ইচ্ছে করে জিরোতে। নতুন মানুষ দেখে তারও গল্প করতে মন চায় খানিক। সেই নকশাল আমলে তার বিয়ে হয়েছিল। তখন সেই বা কতটুকু, কতটুকুই বা তার বর। বরের কথা বলতে গেলে ওর চোখ মুখ উদাস হয়ে যায়। নাহ্ যশোমতী আর নকশালদের গল্প এখান থাক। এবারে ফেরা যাক খানিক। বিকেলের আলোয় দেখা যাচ্ছে যশোমতীর গাঁ। আমারও। এই গাঁয়ে দুই পাড়া। উঁচু পাড়া আর নীচু পাড়া। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবনদা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। মোষদুটোকে বেঁধে দিয়ে জীবনদা খানিক বিশ্রাম নেয়। গল্পের লোভে তখন তাঁর পাশটিতে গিয়ে চুপ করে বসি। খুব সুন্দর গল্প করে জীবনদা। জীবনদার পাশে বসে গল্প শুনতে শুনতে আমার কেবলই দোবরু পান্না আর ভানুমতীর কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের গাঁয়ের মোড়লের সামনে আমি তখন নতজানু হই মনে মনে। বন্ধুর ঘাসজমিতে বসে কেবলই আলাপচারিতায় ডুবে যাই ক্রমে। তবে জীবন’দার কি আর বসে থাকার ফুরসত আছে? বেলা পড়ে এলে মোষদুটো নাইতে চায় না। ওদের তখন শীত লাগে। জীবনদা তাই এবার উঠে পড়ে ব্যস্ত পায়ে। (চলবে)


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments