রাঙা ধুলোর গান

অমৃতা ভট্টাচার্য

যশোমতীর গাঁ। নীচু পাড়ার মোড়ল জীবন’দা। এমন সৌম্য শান্ত মানুষ আজকাল বেশি দেখা যায় না। জীবন’দা যখন খুব শান্ত পায়ে মোষদুটোকে চড়াতে নিয়ে যায় তখন বোঝাই যায় না, এই মানুষটার মধ্যে কেমন স্তরীভূত হয়ে আছে গভীর জীবনবোধ। এমনি আরও মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। প্রাণের বাংলার নিয়মিত লেখক অমৃতা ভট্টাচার্য আবার লিখতে শুরু করলেন নতুন ধারাবাহিক ‘রাঙাধুলোর গান’। লেখকের ভাষায়-আমরা যাকে ইতিহাস বলে দাগিয়ে দিতে চাই বেমালুম, সে তো আসলে মানুষেরই গল্প। এই যে সোজা পথ গিয়েছে নদীর দিকে, এই পথ বরাবর হাঁটা লাগিয়ে দিলেই হলো।

আঠাশ.

এই ভোরের অপেক্ষা কিন্তু ফুরোয় না। দাস্তানের মতো তার ভেতর থেকে গল্পের রেশমি সুতোর গুলি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে। দিন থেকে রাতে, রাত থেকে দিনে। সে গল্পে মশগুল হয়ে যেতে পারে যারা তারা যেন কেমন নিশিতে পাওয়ার মতো করে খিড়কির দরজা খুলে মাঠ ঘাট পায়ে চলা পথ পেরিয়ে চলতেই থাকে ভোরের দিকে। আচ্ছা একেকটা সকাল কি একেকটা দরজার চৌকাঠের মতো! তার চতুষ্কোণ জানলার মধ্য দিয়ে ওই যে সূর্য ওঠে, ওই যে মাঠের আলের জল ফাওড়ার কোপে বের করে দেয় এ পাড়ার জোয়ান ছেলে শ্যামল। শ্যামলের আম্মা একা একা বসে ভাত ফোটান কেমন উদাস মনে। ভাতের গন্ধে ওর তাই মৌতাত লাগে কম। দীর্ঘশ্বাস বরং বেশি। সেই শ্বাসের ছোঁয়ায় উত্তরের হাওয়া খানিক থমকে যায়-ও-বা একেকদিন। এই সকালের জানলা দিয়ে এসব দেখা যায় বৈকি। তাই না ওই জানলার পাশটিতে এসে চুপ করে বসি। শিশিরে পা ভিজে যায়। টিনের ছাদে জল পড়ার শব্দ হয়। ভলমানতার মধ্যে আসলে এমন ভোরে স্থবিররা বাসা বোনে। সে বাসায় দারুচিনি দ্বীপের গন্ধ নাই থাক সবুজ ঘাসের দেশ আছে একখানা। ঘাস আর শিশিরের গন্ধে খুব ভোর ভোর পাখিদের ডাক হাক জমে উঠলে টের পাওয়া যায় ওরাও এই মাটির পৃথিবীর অংশীদার। মানুষের জমি জিরেতের মালিকানা কেবল মনের শান্তিতে। এসবের কোনো দায়ভার ওদের তো নেই! বাবুই, মুনিয়া আর মোহনচূড়া তাই দোল খায় আর দোল খায়। মানুষের ভাগ বাটোয়ারায় ওদের কোনো আগ্রহ নেই। মানুষের জানলায় সূ্য্যি ওঠে বটে, সেই ভোরের আলোটি কি কেবল মানুষী প্রেমের গল্প শোনায়? পাখি মথ আর জলজ গাছেদের গল্প আসলে কেমন সে কথা জানতে সাধ হয় বড়। সে গল্প কি শোনার কোনো অবকাশ তৈরি হবে কোনোদিন? কী জানি!

হেনন্তের বিরান মাঠের পাড়ে এই বারান্দাখানি আরও বিরান হয়ে পড়ে থাকলে বুকের মধ্যে কেমন করে জানি। পার্থিব জীবনকে তখন আরও বেশি করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। পাখিদের ভিড়ে মিশে না যাবার ব্যাথা তখন ক্রমে থিতিয়ে আসে। কেবল টের পাই পাখিদের ভিড়ে এই বারান্দা এখন সরগরম। তখন কোন এক চৈতন্য দিয়ে বুঝি, জীবনের দাবী বড় কম নয়। সে কেবলই মানুষের ঘর দুয়ারে পাখি পোকা আর মথেদের ছড়িয়ে দিতে চায়।
বারান্দায় যখন পাখিরা পোকারা আর বনজ কীটেরা বাসা বোনে হেমন্তের শীতে তখন আর কিছু না, কেবল এটুকু জানি – এই বিরান মাঠ, থিতিয়ে থাকা নয়ানজুলি আর কাশ ঝরানো নদীতীর কেবল মানুষের জন্য নয়। না মানুষী জীবনের দাবী নিয়ে তারা আমার বারান্দায় এসে বসেছে। ওই যে সে। ওই যে আস্ত একখানা হেমন্তের সকাল। (চলবে)

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box