রাজকন্যাগুলো এত সাহসী হলো কি করে…

পলা রহমান

সেদিন এক ছেলে কলিগ আমাকে কথায় কথায় ফস করে বলে বসলো, “সুন্দরী মেয়ে মানুষের অনেক সুবিধা, সব জায়গায় নানারকম সুবিধা পান।” আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উনাকে ধীরে ধীরে বললাম, ভাই, একটা মেয়ে সুন্দরী না বান্দরি সেটার চেয়ে বড় কথা হল,শত মেধা থাকা সত্ত্বেও ওই ‘মেয়েমানুষ’ শব্দটার বাইরে সে যে একজন শুধুমাত্র কর্মঠ কর্মী,এই জায়গাটা প্রমাণ করতে তার সারাজীবন চলে যায়। একটা মেয়ে তার কর্মজীবনে কত রকম ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যায় আপনার কি সে ধারনাটা আছে?লোকটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে, সে চুপ করে গেল। 
একটা মেয়ের প্রতি হ্যারাসমেন্ট কিন্তু শুধু গায়ে হাত দেয়া না, একটা মেয়ে কলিগের চেয়ারের পিছনে অযথা দাঁড়িয়ে উকি ঝুঁকি দেয়া, তার আপাদমস্তক চোখ দিয়ে চেটে খাওয়া, তাকে আপত্তিকর কথা বলা, সর্বপরী একটা কর্মক্ষেত্রে তার স্বতন্ত্রভাবে দাপটের সঙ্গে কাজ করা সহ্য করতে না পারা, তাকে এমপাওয়ার্ড হতে দেখলে সিলি সব ঝামেলা তৈরী করে তাকে বিপদে ফেলা, সাবোর্ডিনেট হয়েও তার কমান্ড মেনে না চলা এগুলো সবই হ্যারাসমেন্টের কোটায় পরে আসলে।
আমার আগের এক অফিসে,ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার মেয়েটা সবার সঙ্গেই হেসে কথা বলতো। এটা তার জব ক্রাইটেরিয়াতেই ইনক্লুডেড ছিলো দেখা মাত্রই সবাইকে হেসে সম্ভাষণ করা। শুধুমাত্র হেসে কথা বলার অপরাধেই বেশ কয়েকজন তাকে একেবারে পেয়ে বসলো। কারো মন খারাপ তো,সেই মেয়ের ডেস্কের সামনে, কারো বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া তো তার ডেস্কের সামনে, কেউ সকালে অফিসে ঢুকতোই তার দিকে তাকিয়ে গান গাইতে গাইতে। এক পর্যায়ে অবস্থা অসহনীয় হয়ে গেলে সে কমপ্লেইন করলো। তাতে কি মনে করেন সমস্যা সমাধান হলো? নারে ভাই,এত সোজা না। একটা মেয়েকে (সে যত বড় মানুষই হোক না কেন) যত সহজে চরিত্রহীনা বলা যায়, একটা ছেলেকে কি সেটা বলার জো আছে মনে করেন? হ্যারাসমেন্টের সকল প্রকার প্রমাণ দাখিলের আগে তাকে যে আগে নিজে চরিত্রবান সেটা প্রমাণ করতে হবে।বিশ্বাসযোগ্য করতে ইনিয়ে বিনিয়ে চোখে পানি এনে বলতে হবে। নাহলে সেই কমপ্লেইন ধোপে টিকবে কেন? স্বভাবতই সেই কমপ্লেইনের কোন সুরাহা হয়নি।
আমার পুরনো অনেক কলিগকে আমি ওই ‘মেয়েমানুষ’ শব্দটা বলা জোর করে বন্ধ করিয়েছি। এখনো সেটা মানে কিনা জানি না, তবে এটলিষ্ট আমার সামনে উচ্চারণ করার সাহস পায় না। আমার আরেক কলিগ রুদ্র একবার দেখেছে, গুলশান মোড়ে সিএনজিতে বসে আমি চিলের মত চিল্লাচ্ছি, আর সিএনজি ড্রাইভার দুই কানে হাত চাপা দিয়ে কান্তে কান্তে বলতেছে, ‘আফাগো মাফ কইরা দেন,আপনেরে মাইয়া মানুষ কইয়া ভুল করছি।’
আমি যখন সারাদিন কামলা দিয়ে, সন্ধ্যা থেকে বাচ্চা পেলে, রাত জেগে একটা বই ট্রান্সলেট করে বইমেলায় ছাপিয়ে ফেলি, তখন আমার চেহারা আমাকে আলাদা করে সাপোর্ট দেয় না। আমি যখন ব্যবসা শুরু করার দেড় বছরের মাথায় অর্ধকোটি (৬০ লাখ বলার চেয়ে কোটিতে বলতে আরাম লাগে 😉 ) টাকার ইভেন্ট প্লানিংয়ের কাজ পাই, সেখানে আমার চেহারা না, আমার মেধা দেখেই ক্লায়েন্ট আমাকে কাজ দিয়েছে। সেই কাজও আমি যমজ বাচ্চা পেটে নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা দৌড়ে করেছি। আজকে রাতে আমার বহুবছর আগের পুরনো ক্লায়েন্ট (মেয়ে) ফোন করে যখন বলে তার ইভেন্টের কাজটা আমি করতে পারবো কিনা, অন্য কাউকে দিতে সে ভরসা পায় না, আমি শিওর সে আমার চেহারা না পুরনো কাজকেই মনে রেখেছে।

আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে,আমি আমার পুরনো কাজের ছবি, বই,লেখা এবং অবশ্যই আয়নায় নিজেকে বারবার দেখি।আমি অনেক স্ট্রং ফিল করি। আমি নিজে কোনদিন মেয়ে হিসেবে আলাদা করে কোথাও সুযোগ নেইনি। কেউ সুযোগ নিতে চাইলে সেই সুযোগ দেই না। আমি আমার সমস্যার কথা লাউডলি বলতে শিখেছি। একটা মেয়ে সব সময় খুব সফট স্পোকেন হবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই।হ্যারাসমেন্টের সঙ্গে ইউজড টু না হয়ে সেটাকে প্রতিরোধ করবে এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত,তাই না?
আমি আমার বাবাকে গর্ব করে বলতে শুনেছি,ছেলে দরকার নেই, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ,আমার দুই মেয়ে থাকতে আমার কোন চিন্তা নেই। আমি আমার নিজের ছেলেদেরকে বলা প্রতিটা গল্পে একটা হলেও সাহসী মেয়ে চরিত্র রাখি,যে পাহাড় পর্বত জয় করে ফেলে, বাঘ-ভালুক একাই সামলে ফেলে, রাক্ষসপুরী থেকে রাজপুত্রকে উদ্ধার করে আনে। আমার ছেলেরা চোখ বড় বড় করে শুনে। ছোট ছোট দুই হাতে আমার গাল চেপে ধরে ধরে বলে, মা রাজকন্যা গুলো এত সাহসী হলো কি করে? উত্তর দিতে গিয়ে আমার চোখে পানি চলে আসে।

ছবি: গুগল