রাতের কলকাতা…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অদিতি বসুরায় (কবি, সাংবাদিক)

এক পরত ডার্ক শেড সময়ের মাত্রা পালটে দেয়। কলকাতার কলোরোলের একেবারে ভিন্ন চরিত্র রাতে। সন্ধ্যা পেরনোর পর, অফিসযাত্রীরা কুলায় ফিরে গেলে, সামান্য হাঁফ জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় কল্লোলিনী। ততক্ষণে ময়দান থেকে উঠে পড়েছে নাছোড় প্রেমিকের দলবল। শেষ নিভৃতিকে কাজে লাগিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে নিয়ে বেড়িয়ে আসছে তারা- পুলিশ আড়ামোড়া ভেঙে ভ্রাম্যমান চা-ওয়ালার কাছে থেকে চা চেয়ে নিচ্ছে এক কাপ- অন্ধকার গাড় হয়ে আসছে শহরের মাথায়। কলকাতার নৈশ-জীবন নিয়ে মহাভারত লেখা হতে পারে আর একবার।ময়দানে আর মেট্রো গলির মুখে এসে দাঁড়ায় খদ্দের-পিয়াসী মেয়ের দল। চীনেবাদাম হাতবদল হয়ে পরিণত হয় সুরায়। সামান্য দূরত্বে পার্ক স্ট্রিট রাজার মুকুট মাথায় পরে প্রতি সন্ধ্যায়। সেখানে রাত মানেই উৎসব। সন্ধ্যার অবসান মানেই আসন্ন পূজোর হইচই। সেখানে এসে দাঁড়ায় সুবেশ জিগোলোরা। তাদের এলোমেলো জিন্সে বিষণ্ণতা লেগে থাকে। হইহই করে পথ চলে আধু্নিকতম পোশাকের মেয়েরা। আলগা সিগারেট জ্বালিয়ে রাস্তা পার হয় যুবকের দল। ভিড় জমতে থাকে অলিপাবে। আরও নানা রেস্তরাঁর সামনে নিজেদের টার্নের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন খাদ্য-রসিক জনতা। যত রাত বাড়তে থাকে,ততই বাড়তে থাকে গাড়ির পার্কিং চার্জও। উদাসী বিদেশিনী ডিনার সেরে সঙ্গীর হাত ধরে হেঁটে যান রাসেল স্ট্রিটের দিকে। পার্ক স্ট্রিটের রাত বড় রংদার। মধ্য রাতের সে রাণী। উত্তর কলকাতার রাতের চাকচিক্য নেই তেমন। বাগবাজার ঘাটে কিছু ভবঘুরে নেশাড়ু বসে থাকে  রাতে। চায়ের দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তালা পড়ে যায় গঙ্গা-তীরের মন্দিরগুলোতেও। বাগবাজার ঘাটের পথ চলে গেছে নিমতলার অভিমুখে। নিমতলা শহরের অন্যতম শ্মশান। সে সারারাত জেগে থাকে। তার সঙ্গে জাগে এই পাড়া। লিট্টিওয়ালা, ফুলওয়ালা, কাপড়ের ঝুপড়ি দোকান, চায়ের দোকান- সব নিয়ে নিমতলা ঘাট জেগে থাকে সারারাত। সারারাত সেখানে শবদেহ আসে। অন্তিমে জাগে নদী। চিতাভস্ম ভাসাবে বলে! এখানেই নেশার বস্তু মেলে রাত হলে। পাওয়া যায় গাঁজা। দেশি মদ। বিড়ি তো যত্রতত্র। আর এখানে রাত জাগে কান্না। শেষ যাত্রার সঙ্গীদের চোখের জলে অন্ধকারও দ্রবীভূত হয়ে ওঠে। ওদিকে বাইপাসে তখন শনশন করে হাওয়া বয়ে যায়। দুরন্ত যানবাহন সিগন্যালের লাল চোখ অগ্রাহ্য করে আরও বেশী স্পিডে নিজেকে ছেড়ে দেয়।  রাতের বাইপাস আসলে দুর্ঘটনার এলাকা। নির্জন ভেরি,  সবুজ জলদেহ নিয়ে বাইপাস শত চেষ্টা্তেও ঘুমাতে পারে না। পুলিশ ভ্যান টহলদারি চালায় রাতভোর এখানে। রাতভোর এখানে গাড়ির শব্দ আসে যায়। বাইপাসের অন্য বিন্দুতে অভিজাত দক্ষিণ পাড়া। আরেক বিন্দুতে সল্টলেক। সল্টলেক বরাবর ‘সাউন্ড অফ সাইলেন্স’। বিকেলের পর থেকে এই পাড়া চলে যায় অন্ধকার এবং নৈঃশব্দের হাতে। সারি সারি গাছ,ছিমছাম রাস্তার গায়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকালের আলোর জন্যে প্রার্থনা করে। মাঝে মাঝে কেবল কানে আসে দ্রুত গতিতে ছুটে যাওয়া বাইকের শব্দ। আর ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকে জনশূণ্য পার্ক, কমিউনিটি হল, সরকারী অফিসের বাড়িগুলো। তুলনামূলক ভাবে, সাউথ কলকাতার নিশিযাপন অনেক জীবন্ত। তবে সম্ভবত কলকাতার যে পাড়া একবারের জন্যেও দুচোখের পাতা এক করতে পারে না, তার নাম সোনাগাছি। শহরের প্রধান রেড-লাইট এরিয়া। রাতে সে পাড়া জেগে ওঠে। বর্ণিল হয়ে পথে নামে মেয়েরা। আসে নানা জায়গা থেকে নাবিকের দল। একরাতের জন্যে নোঙর ফেলতে। এখানে রাতে চিৎকার করে মাতাল, ঝগড়ুটে লোকজন, তুখোড় বেশ্যারা। কানে আসে কাঁচা গালাগাল, কাঁচ ভাঙা হাসির শব্দ। বাতাসে ভাসে আতর। তবে সেকালের খানদানী রইসদের দিন অস্তে গেছে এখন। জুড়িগাড়ি আর গোড়ের মালা হাতে হাস্যমুখ, ফুর্তিবাজের দলবল উধাও হয়েছে বহুকাল। তারপর রাত শেষ হয়ে আসে। পুলিস ভ্যানের চালক বাড়ির পথ নেন…গঙ্গার পথে যাত্রা শুরু করে রাতের আঁধার..রাত শেষ হয়।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]