রাহুল দেববর্মন : জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবদুল্লাহ আল মোহন

বিখ্যাত সুরকার ও শিল্পী রাহুল দেব বর্মন।সবার প্রিয় আর.ডি৷ আদরের ডাক নাম- ‘পঞ্চম’৷ উপমহাদেশের সংগীত জগতে পঞ্চম হিসেবেই সমধিক পরিচিতি তাঁর। অসংখ্য জনপ্রিয় হিন্দি, বাংলা চলচ্চিত্রের গানের সুরকার হিসেবে সংগীত রসিকজনেরা আজও তাঁকে স্মরণ করে বিনম্র চিত্তে। দেশের সংগীতধারায় নতুন এক ঘরানা তৈরি করে

কিশোর কুমারের সঙ্গে

ছিলেন তিনি। তাঁর সুর-ছন্দে আজও মাতোয়ারা সংগীতপ্রেমীরা। মধ্য ষাট থেকে আশির দশক পঞ্চম-সুরের সশব্দ বিস্ফোরণে বলিউড কেঁপেছে।প্রখ্যাত এবং জনপ্রিয় সংগীতগুরু শচীন দেববর্মন আর গীতিকার মীরা দেববর্মনের ঘরে ১৯৩৯ সালের ২৭ জুন সকাল ৯টা ২৯ মিনিটে জন্মগ্রহণ করেন রাহুল দেব বর্মন। জন্মদিনে বিখ্যাত এই বাঙালি সুরকারের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি৷ জন্মের পর তার ডাক নাম ঠিক হলো টুবলু। পরিচিত ‘পঞ্চম’ নামটা তার হয় আরও কিছু দিন পরে। জন্মের পর থেকে নাকি সব সময়েই কাঁদতেন পঞ্চম স্বরে। আর একটা গল্পও আছে। বাবা ‘সা’ গাইলেই ছেলে নাকি ‘পা’ গাইতো। তাই অশোককুমার তার এই নামটা দিয়েছিলেন। পঞ্চমের ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে পাঁচ সংখ্যাটা কিন্তু সত্যি লাকিও হয়েছিলো। ‘তিসরি মঞ্জিল’ (১৯৬৬) ছিলো তাঁর সুর করা পঞ্চম ছবি।

পঞ্চমের জন্মের ৮ বছর পর একটা স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছিলো। দেশটির নাম ভারত। মানুষের মতো, দেশের জীবনেও সমস্যা তো থাকবেই। কিন্তু একটা বিপুল আনন্দও ছিলো। সেই আনন্দ কোটি কোটি প্রাণে সুরে কথায় ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলো হিন্দি ছবির গান। আর তিনি সেই সুরের দুনিয়ার এক আশ্চর্য জাদুকর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জীবনের গল্পটা তাই কেবল তাঁর জীবনের গল্প নয়, একটা গোটা দেশের অনেক মানুষের নানান ভালবাসায় শিউরে ওঠার, নানান কান্নায় চোখ মোছার, অসহনীয় প্রেমে নীল হয়ে ওঠার সুরের গল্প। আমাদের অনেকের হারিয়ে যাওয়া, ধরে রাখা, ভুলে যাওয়া, মনে পড়া জীবনের গল্প। পঞ্চমের সুর দেওয়া গানেই তো আমরা আমাদের কত চাওয়া আর পাওয়া আর হারিয়ে যাওয়াকে সেলিব্রেট করছি। করে চলেছি।

বাবার সঙ্গে রাহুল দেব বর্মন

গান তৈরিই ছিলো পঞ্চমের জীবন। আর ডি’র গানের পেছনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর দলের সঙ্গীরা, যেমন কারসি লর্ড, মনোহারি সিংহ, ভানু গুপ্তা আর আরও অনেকে। আর ডি’র সঙ্গীতের মূল ব্যাপারটাই ছিল নিয়ম ভাঙা এক প্রাণের স্পন্দন। ‘ও হাসিনা…’র কথা ধরুন, ৮০ জন শিল্পীকে ব্যবহার করা হয়েছিলো। তার মধ্যে ৪০ জন বাজিয়েছিলেন বেহালা। আজকের দিনের মতো ট্র্যাকের কারিগরি ছিলো না। একসঙ্গে এতগুলো বাদককে ব্যবহার করা, কী কাণ্ড! শুধু কী বাদ্যযন্ত্র। মোটর গাড়ির ইঞ্জিন, পেডেস্টাল পাখা, কী না চলবে তাঁর গানে। তৈরি হবে জাদু।
বীর সাংভি একটি লেখায় বলেছিলেন যে, দুনিয়া জুড়ে ষাটের দশককে যৌবনের দশক বলে বাড়াবাড়ি করা হয়। ভারতে কিন্তু যৌবনের দশক বলতে সত্তরের দশক। আর সত্তরের দশক মানেই পঞ্চমের দশক। সত্তর জুড়ে শুধুই যেন পঞ্চম। সেই সময়টা যে কী দারুণ সময় তাঁর সুরের সঙ্গীদের। এই সময় কোনও এক জ্যোতিষী রাহুলকে বলেছিলেন, গান না গুনতে, কাজ না গুনতে। তাই তিনি শুধু গুনগুনই করে গিয়েছেন, যোগ-বিয়োগ-ভাগ করেননি কখনও।
১৯৬৫ সাল, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ চলছে। নতুন দু’টো দেশের বয়সই ১৮ বছরের হলো। ঘরের ছেলেরা যুদ্ধে গেছে, ওদিকে কাশ ফুটছে, চালচিত্রে ফুটে উঠছে ছবি। রথের দিনে মাটি পড়ছে খড়ে। পুজোর তিন সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলো, সৈনিকরা ফিরলো ঘরে। বাংলায় সে বার পুজোর গানে এলেন আর ডি বর্মন। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। এর পর ১৯৬৭-তে এলো ‘এক দিন পাখি উড়ে’, ‘আকাশ কেন

স্ত্রী আশা ভোশঁলে সঙ্গে

ডাকে’ আর তার পর ‘মনে পড়ে রুবি রায়’। মনে রাখতে হবে, এই সময়ের কলকাতা খাদ্য আন্দোলনের কলকাতা, নকশাল আন্দোলনের কলকাতা, কংগ্রেসের বদলে প্রথম যুক্তফ্রন্ট আসার কলকাতা। এই কলকাতার মুড ছিলো আলাদা। আর তখনও আর ডি’কে খোলাখুলি গ্রহণ করতে পারেনি বাঙালি। শান্তিনিকেতন, ডোভার লেন আর বামপন্থীদের সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির নানান অনুশাসনের ফাঁকে রাহুলের গান ছিলো আর এক ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত। সে নাকি বড় চটুল, বড় পশ্চিমি, বড় অনৈতিক! ভারতীয়দের অনেকের ভারতীয় হয়ে বেড়ে ওঠার আনন্দে যে সামিল হতে পারিনি আমরা বাঙালিরা, যার ফল সব সময় আমাদের পক্ষে ভালো হয়নি, তার একটা লক্ষণ বোধ হয় এই সময় আমাদের রাহুলকে গ্রহণ করার ব্যর্থতার মধ্যে ফুটে উঠেছিলো। বনফুলের ভাই পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় বনফুলের ‘হিংয়ের কচুরি’ গল্প নিয়ে ছবি বানালেন, ‘নিশিপদ্ম’। সুর দিলেন নচিকেতা ঘোষ। ‘যা খুশি ওরা বলে বলুক’ গানের জন্য মান্না দে জিতলেন তাঁর দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কার। শক্তি সামন্ত ছবিটি হিন্দিতে বানাতে চাইলেন— ‘অমর প্রেম’। সুরকার কে? রাহুল দেববর্মন। শক্তি সামন্ত বলেছেন, ছবির কাজ করার সময় পঞ্চম মিউজিক রুমে ঢুকত সকাল ন’টায়, বেরোত রাত ন’টায়।
পঞ্চমের জীবন আর গানের মেশামেশি দিনলিপি, যা আবার একটা দেশের জীবনগান হয়ে ওঠে, লেখা সহজ নয়। সেই কাজটা অসাধারণ ভাবে করেছেন, অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য আর বালাজি ভিত্তল। গানগুলোর বিশ্লেষণ পড়লেই বোঝা যায় এই দু’জনও এই গানের ভেতর ডুব দিয়ে তার মুক্তোগুলোকে চেনার চেষ্টা করেন। তাঁদের ধন্যবাদ, রাহুলের জীবন আর তার সঙ্গে আমাদের নিজেদের জীবনের তীব্র অনুভূতিগুলোকে আর এক বার ফিরিয়ে আনার জন্যে। রাহুলের মতো মানুষরা ফুরান না, বেঁচে থাকেন নিজেদের সুরলোকে। সেই সুরলোকে বিশ্বাস রাখার জন্য পরলোকে বিশ্বাস করার দরকার নেই।
১৯৯৪ সালের ৪ জানুয়ারি মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে নিঃসঙ্গ রাহুলদেব বুকে ব্যথা এবং এক গভীর আবেগ নিয়ে মারা গেলেন। শেষ দিকে ভালই অর্থকষ্টে ছিলেন। সুর-তাল-সংগীতে যে বিশাল সম্পদ তিনি রেখে গিয়েছেন, তার কোনও ক্ষয় হতে পারে না। আমার আর ডি-প্রেমও তাই অমর, মৃত্যুহীন।

(তথ্যসূত্র : উইকপিডিয়া, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, আনন্দলোক, আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক: অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও বালাজি ভিত্তল, ইন্টারনেট)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]