রায়হান শরীফের চারটি কবিতা

রায়হান শরীফ

আছি!

কিছু টুকরো পাথরের

যোগফল হয়ে আছি!

হাওয়ার চাবুকের

কষাঘাতে নিথর;

শ্রাব্যসীমার উপরে বাজতে থাকা

তীব্র বাঁশীর অব্যর্থ নিশানায়

উদ্ভ্রান্ত হয়ে আছি।

 

আছি হন্তারক ট্রেনের মত

সর্বনাশ সরলরেখা;

আছি সন্ধ্যার বিবশ হাওয়ায়

টুংটাং চাইমের শব্দ;

আছি অসংখ্য প্রেতাত্মার

নিঃশ্বাসে নিমজ্জমান।

 

অভিনয়ের মঞ্চে উটকো

দর্শক হয়ে আছি।

টুকরো পাথরের

যোগফল হয়ে আছি!

সেইকবে

চলেতো গিয়েছি সেই কবে

রয়ে গেছি নির্বিকার চোখে ভাসা

মামুলি দৃশ্য কোন;

যেন ফেলে রাখা আধ-কাপ চা।

 

রয়ে গেছি সন্ধ্যার মুখে কানা-গলি,

বাড়ি না ফেরার চুপচাপ ইচ্ছে,

এভারেস্ট জয়ের স্মৃতি,

যেন পাখি শিকারে ব্যর্থতার লুকোনো আনন্দ।

রয়ে গেছি করুণ সানাই,

পড়ো বাড়িতে নিরুদ্দেশ

জম-জমাট আসবাব,

যেন ড্রয়ারে অপেক্ষাহীন প্রেসক্রিপশন।

 

রয়ে গেছি আগুন জ্বালিয়ে ছাই

ক্লান্ত চোখে ঢুকে পড়ে আশ্রয়ের মুখ নয়

ঝা-চকচক-শতবিপণী-বিতান!

 

চলে তো গিয়েছি সেইকবেই

শুধু রয়ে গেছি বিস্মিত পথিক,

ম্যাপ ও কম্পাস হাতে বিভ্রান্ত যাত্রী;

যেন পড়ো দেয়ালে এক অচিন উদ্ভিদ!

যেদিকে তাকাই

যেদিকে তাকাই, আয়নার মত স্পষ্ট মানুষ

যেদিকে তাকাই, ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস।

যেদিকেই কানপাতি, মানুষ বলছে মুখস্থ কথা।

ফিরিয়ে দিচ্ছে এক ও অবিকল চাহনী, মুখভঙ্গী।

 

যেদিকে তাকাই, দেখি ছুটন্ত মানুষের ট্রেন।

যেদিকে হাত বাড়াই, দ্রুত সরে যাচ্ছে ছায়া।

যেদিকেই হেঁটে যাই, মানুষ ফিরছে বাঙ্কারেএকা।

অনেক যুদ্ধের, অনেক রণাঙ্গনেরএকলা সৈনিক।

 

ক্লাউনের পোশাকে শহরে ঘুরছে আততায়ী।

শহর ঢেকে আছে বিশালাকায় কালবাদুড়ের ডানায়।

যেদিকে তাকাই মানুষ ঘুমিয়ে খুব, চুপচাপ, অন্ধকারে।

যেদিকে তাকাই, জীয়ন্ত গাছের পাশে মৃত আর নির্জীব মানুষ।

 

বলো, বলো আয়না-মানুষ! বেঁচে থাকা কিভাবে এখন?

কিভাবে তুমি ধরাবে আগুন হে সুনিপুণ বঙ্কিম!

কী করে তোমায় পোড়াবে আবার পদ্মা-মেঘনা-যমুনা?

 

যেদিকে তাকাই আয়নার মত স্পষ্ট মানুষ

যেদিকে তাকাই ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস।

এইভাবে

এইভাবে ধরে রাখি হাতের মুঠোয় পাথর;

এইভাবে দেখি আমি নির্মম চাঁদ!

এইভাবে ছুঁয়ে দেখি ধুলোর শরীর

দু’হাতে জড়াই নিষ্প্রভ ঘাস।

 

এইভাবে মেপে দেখি বৃষ্টির গায়ে জ্বর

বুকে ভর দিয়ে লোকালয়ে আসি।

হারাই অভিনয়ের রোল, রণপা

ঘরে ফিরি সারা গায়ে জখম জখম।

 

এইভাবে হারাই বুকপকেটের রোদ

অন্ধকার মুছে ফেলে প্রিয় নাম

এইভাবে ঢুকে পড়ি নির্জন দ্বীপে

শুনি অবোধ্য ভাষায় জরুরী সংবাদ।

 

কখনো দোভাষী হয়ে নিজেকে বোঝাই ভুল

ভিজি অন্ধকারে, মাতৃজঠরে চুপচাপ একা।

এইভাবে রয়ে যাই ধৃত এক গুপ্তচর

নিজেকে নিজের কাছে ফেরাইনা আর।

 

এইভাবে ধরে রাখি হাতের মুঠোয় পাথর;

এইভাবে দেখি আমি নিষ্ঠুর চাঁদ!