রুমডেইট

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুনির আ চৌধুরী

পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছে যারা রাজ কপাল নিয়ে জন্মায়। আমার স্ত্রী সীমার ধারণা আমার মা তাদের একজন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা যেমন আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা পেয়েছে তেমনি আমার মাও আন্তর্জাতিক মায়ের মর্যাদা পেয়েছেন। তিনি একাধারে মার্কিন, বৃটিশ, বাংলাদেশী এবং ভারতীয় নাগরিক। পৃথিবীর কোন অভিভাষণ আইনে তিনি ৪ দেশের নাগরিকত্ব পেলেন সেটা আমার কাছে বোধগোম্য নয়। উনার তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু অবাক করা কান্ড হচ্ছে নিউয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্ট অথবা লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে উনি শেতাঙ্গ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুদ্ধ বাংলা আর হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে শুদ্ধ ইংরেজিতে কথা বলেন। যেমন ধরেন হিথ্রো বিমান বন্দরে শেতাঙ্গ কাস্টম কর্মকর্তা মা কে জিজ্ঞাসা করলো : – I would like to check bag mam !!! মা – (খাঁটি বাংলায়) আমার ব্যাগ চেক করবা ? ঠিক আছে করো কিন্তু আমার কোমরে ব্যথা। আমি টানা টানি করে এত ভারী উঠাতে নামাতে পারবো না। কাস্টম কর্মকর্তা – Thank you mam তারপর লোকটা চেক টেক করে কোমর ব্যথার কথা শুনে লাগেজটা ঠিকই ট্রলিতে তুলে দিলো। আমি ভাবলাম লোকটা মনে হয় বাংলা বোঝে। একটু বাজিয়ে দেখার জন্য বাংলায় বললাম “ বাথরুম আছে আশেপাশে ? “ লোকটা উত্তরে বললো : Sorry only English” অন্য দিকে হজরত শাহজালালে এসে উনি পুরো দস্তুর ইংরেজি বলা শুরু করলেন। হুইল চেয়ার এ বসে তিনি বিমানবন্দরে কর্মরত কোনো কর্মচারী কে বললেন : cluld you please take me outside , my son is waiting . I had a major knee surgery. I can not walk . মা এই বাংলা ইংরেজির মিশ্রণ অঞ্চল ভেদে কেন করেন সেটা আমি অনেক গবেষনা করেও উদ্ঘাটন করতে পারি নাই।

সাইবেরিয়াতে যখন ঠান্ডা পরে তখন শীতের পাখিরা উড়ে এসে আশ্রয় নেয় জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদালয়ের লেক অথবা সুনামগঞ্জের জলাশয়ে। ঠিক আমার মাও পশ্চিমে ঠান্ডা পড়লে দেশে এসে আশ্রয় নেন আমার ফ্ল্যাটে।

আম্মার এই তিন চার মাসের বাংলাদেশ সফরের সময়টা সীমার জন্য কিছুটা অম্ল মধুর । মধুর কারণটা হচ্ছে সীমার জন্য বিদেশ থেকে তার শাশুড়ী অনেক ধরণের প্রসাধণী কিনে আনেন। আর দ্বিতিয় কারণটা হচ্ছে শাশুড়ীর নিরাপদ হেফাজতে ছেলে সায়েম কে রেখে এদিক সেদিক অনায়াসে ঘুরাঘুরি করতে পারে।

আর অম্লের কারণ হচ্ছে আমার মায়ের ভ্রমনের ক্লান্তি দূর হওয়া মাত্রই বাসার সকল কর্তৃত্ব তিনি নিজের হাতে তুলে নেন। মাস চারেক এর জন্য সম্রাজ্য হারানোর বেদনা সীমাকে ব্যথিত করে। না পারে কইতে না পারে সইতে ! – এই যে শুনছো ? – হুম শুনছি বলো – তোমার মার আজকাল তথ্য প্রযুক্তিতে বেশ উৎসাহ – সেটা কেমন – এই ধরো উনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম্যের মোটামুটি সবগুলোতেই একাউন্ট আছে – তাতে তোমার সমস্যা কি ? তোমার সব কিছু দেখে ফেলবে ? – না আমার কোনই সমস্যা নেই। কিন্তু উনি আজকাল উদ্ভট সব প্রশ্ন করেন। – কেমন ? – এই ধরো সেদিন উনি আমাকে প্রশ্ন করলেন “চিল” শব্দের অর্থ কি ? তার পরের

দিন জিজ্ঞেস করলেন LOL এর মানে কি ? কেন মানুষ এটা লিখে ? আচ্ছা বলতো এই সব উত্তর সহজে বলা যায় ? এসব না হয় যেমন তেমন কাল আমাকে বললেন room date মানে কি ? আমি এটার উত্তর কি দিবো ? আজকে দেখি সায়হাম কে জিজ্ঞাসা করছে , সায়হাম সেটা আবার ফোনে গুগলে সার্চ দেয়া শুরু করছে । আমি সায়হামের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিয়েছি। ছোট বাচ্চা আবার কি না কি বুঝে। আজকে এই নিয়ে তিন বার উনি আমাকে একই প্রশ্ন করেছেন।

সীমার এই ধরণের অসহায়ত্ব আমার খুব মজা লাগে। কিছুটা পৈশাচিক আনন্দের পর্যায়ে পড়ে। আমি স্মিত হাসতে হাসতে বললাম – তো রুম ডেইট এর কি ব্যাখ্যা দিলে মা কে ? – না আমি কোন ব্যাখ্যা দেয়নি। বলছি “ আপনার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম সে বলছে অফিস থেকে এসে আপনাকে বুঝিয়ে বলবে।’’ সীমা আমার জন্য এরকম একটা ইঁদুরের ফাঁদ পেতে বসে কাছে আমি স্বপ্নেও চিন্তা করনি। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে আমি মায়ের পায়ের কাছে মিনিট ১৫ শুয়ে থাকি। এটা আমার এক ধরনের অভ্যাস। এক ধরণের ভালো লাগা বলা যায়। রুম ডেইট শুনে আজকে ভালো লাগাটা উবে গেলো। রাতে খাবার পরেই মা তলব করলেন তার রুমে আমাকে। যথারীতি মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। এক কথা দুই কোথায় হঠাৎ মায়ের আচমকা প্রশ্ন : – আচ্ছা রুম ডেইটা কি ? – আমি আমতা আমতা করা শুরু করলাম। মা এবার একটু ধমকের সুরেই বললেন – সীমা বললো তুই নাকি জানিস। আমতা আমতা করছিস কেন ? – আম্মা এই যে আমি তোমার সঙ্গে রুমের ভিতর শুয়ে শুয়ে গল্প করছি এটাই আসলে রুম ডেইট কথা শেষ হতেই এক ধরণের নীরবতা নেমে এলো রুমে। কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর আম্মা বলে উঠলেন – এই জন্যই বলি এই সোজা সাজা সীমা কে তুই কেমনে এতো পাগল করলি…. বিয়ের আগে নিশ্চয়ই তুইও রুম ডেইট করছিস সীমার সঙ্গে তাই না ? – আম্মা আমার অনেক ঘুম পাইসে আমি যাই….. রুম থেকে বের হয়ে দেখি সীমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে হাসি চাপিয়ে রেখে লুটিয়ে পড়ছে।

ছবি: গুগল

 

 

 

 

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]