রুমীঃ ভালোবাসায় মিশে রবে আমাদের হৃদয়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

সহজে পৃথিবীতে আসে নি । দীর্ঘ ১৪ ঘন্টা গর্ভধারিণীকে কষ্ট দিয়ে, নিজেও কষ্ট পেয়ে তবেই সে এই পৃথিবীর আলো দেখে। আমার ডাক্তার জানতেন, রুমীর বাবা ইন্জ্ঞিনিয়ার।

তিনি সদ্যজাত রুমীকে দুই পায়ে ধরে, মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে তার পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘এটা ১৯৫১ সাল । ২০ বছর পর ১৯৭১ সালে এই ছেলে ইন্জ্ঞিনিয়ার হবে ।’

আমি বলেছিলাম, যদি হতে না চায় ?

ডাক্তার হেসে বলেছিলেন, ‘ইন্জ্ঞিনিয়ার না হতে চায় না হবে।তবে কিছু একটা তো হবে ।’

১৯৭১ সালে রুমী ইন্জ্ঞিনিয়ার হতে পারে নি । তবে কিছু একটা হয়েছিল ।সে দেশের জন্য শহীদ হয়েছিল ।”

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এর “৭১ এর দিনগুলিতে এভাবেই রুমির পৃথিবীতে আসার সময়টা বলেন।

‘‘তুইতো এখানে পড়বিনা। আই আই টিতে তোর ক্লাস শুরু হবে সেপ্টেম্বরে ,তোকে না হয় কয়েকমাস আগেই আমেরিকা পাঠিয়ে দেব ’’- শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

“আম্মা,দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকা পাঠিয়ে দাও,আমি হয়তো যাবো শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মত অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইন্জিনিয়ার হবো, কিন্তু বিবেকের ভ্রূকুটির সামনে কোনদিন ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবনা। তুমি কি তাই চাও আম্মা?”

আম্মা জাহানারা ইমাম দুই চোখ বন্ধ করে বললেন,“না,তা চাই নে।ঠিক আছে তোর কথাই মেনে নিলাম।দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে।যা,তুই যুদ্ধেই যা।”

শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর একাত্তরের দিনগুলি গ্রন্থের এক জায়গায় বলেন,স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান বিতার্কিক রুমীর সাথে তর্কে পারবো, সে শক্তি কী আমার আছে?

“আমাদের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কী বলেন, জানো মা? তিনি বলেন, ‘কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না; চায় রক্তাক্ত শহীদ।’ অতএব মামনি, আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব, এই কথা ভেবে মনকে তৈরি করেই এসেছি।”

– শাফি ইমাম রুমী শুধুমাত্র একটি নাম নন তিনি, বাঙলাদেশ নামের ভূখণ্ডের সব’চে গৌরবময় অধ্যায়ের ইতিহাস লিখতে গেলে তাঁর নাম চলে আসবে অবশ্যম্ভাবীরূপেই। তাঁকে বাদ দিয়ে রাজধানী ঢাকা’র বুকে পাকি হায়েনাদের ঘুম হারাম করে দেয়া ‘গেরিলা অপারেশনে’র কথা লেখা সম্ভব নয়।

টার্গেট খানসেনা।২৫-এ আগস্ট রুমী, কামালদ্দিন,বদিউল, স্বপন, হাবিবুর।প্রথমে ধানমন্ডি ৮, পরে মিরপুর রোড সফল ভাবে গেরিলা অপারেশন চালায়।

পরিবারের সঙ্গে ছোট্ট রুমী

রুমি বাড়িতে আসে।যুদ্ধে যাওয়া থেকে সব

কথা জাহানারা ইমামকে বলে।

‘রুমীকে তার মা একদিন বলেছিলেন
কখনো যদি সিগারেট ধরে তাহলে তাকে যেন বলে’।

রুমীঃ ‘আম্মা আমি কিন্তু সিগারেট
ধরে ফেলেছি’।

মা তুমি যদি বল আমি বাহির থেকে সিগারেটা খেয়ে আসি। উত্তরে জাহানারা ইমাম ‘না, তুই
আমাদের সামনে বসে খা’। কারণ এক
মুহূর্ত চোখের আড়াল হয়ে যাবে রুমী।
অথচ, একদিন রুমীর এক বন্ধু সিগারেট খাওয়াতে জাহানারা ইমাম তাকে ঘর থেকে বাহির করে দিয়েছে।

যে রুমী ডালে খোসা দেখলে আর খায়
না। সে যুদ্ধে গিয়ে গমের আটার রুটি আর ঘোড়ার ডাল খায় (যে ডাল ঘোড়ারা খায়)।

রুমীর আম্মা জাহানারা ইমাম যখন রুমীকে বলেছিলেন, ‘রুমী। রুমী। এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো দেখলি না। জীবনের কিছুই তো জানলি না।’

উত্তরে রুমী প্রথমে একটু হেসেছিলেন। সে হাসিতে অনেক বেদনা ছিল বলে জাহানারার মনে হলো। একটু চুপ করে থেকে রুমী বলেছিলেন, ‘বিন্দুতে সিন্ধু-দর্শন একটা কথা আছে না, আম্মা? হয়তো জীবনের পুরোটা তোমার মতো জানি না, ভোগও করিনি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য-তিক্ততা-বিষ—সবকিছুর স্বাদ আমি এরই মধ্যে পেয়েছি, আম্মা।যদি চলেও যাই, কোনো আক্ষেপ নিয়ে যাব না।’

২৮ আগস্ট ১৯৭১ সালে শাফি ইমাম রুমী বলেছিলেন এই কথাগুলো। ২৯ আগস্ট রাত ১২টার পর, মানে যে সময়টায় ৩০ আগস্ট শুরু। সেদিন রুমীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, সঙ্গে তাঁর বাবা শরীফ ইমাম, ভাই জামীকেও। ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন তাঁদের বাসায় থাকা হাফিজ ও মাসুমকেও।

স্মৃতিতে সংরক্ষিত শহীদ রুমী

রাত বারটার দিকে হঠাৎ করে সমস্তবাড়িতে আলো জ্বলে উঠে।নিচে থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়।জাহানারা ইমাম ও শরীফ কারা জানতে চাইলে নিচে আসে কথা বলতে বলে।
‘রুমী সহ শরীফ জামিকে ধরে নিয়ে যাই’।

পরে শরীফ আর জামিকে মারধর করে ছেড়ে দিলেও রুমীকে ছাড়ে নাই। রুমীর সাথে শরীফ আর জামির একবার-ই দেখা তখন রুমীকে শরীফতার সহযোগীদের নাম বলতে না করে দেন।

৫-সেপ্টম্বর ইয়াহিয়া খান সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করলে, রুমী যে দলের কাছে ধরা পরেছে শরীফ তাদের কাছে ক্ষমা চাইবে না। কারণ
ছেলে রুমিও তাকে ক্ষমা করবে না।

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রুমী তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য কোনো কিছু স্বীকার করতে নিষেধ করে দেয় এবং সমস্ত দায়ভার নিজের ওপর নেয়। তার সহযোদ্ধা এবং একই সময়ে ধরা পড়া জনাব মাসুদ সাদেকের কাছ থেকে জানা যায় যে, চরম অত্যাচার সহ্য করেও রুমী কারো নাম প্রকাশ করেনি। অমানুষিক নির্যাতনের পর পরিবারের অন্য সদস্যদের দুই দিন পর ছেড়ে দেয়া হলেও রুমী আর ফিরে আসেনি।

সময় পেরিয়ে যায়, মহাকালের স্রোতে মিশেছে ৪৭ টি বছর। কিন্তু নব প্রজন্মের কাছে কিংবদন্তী শহীদ রুমী রয়ে গেলেন কুড়ি বছরের চিরতরুন হয়ে।

ক্র্যাক প্লাটুন বীরত্বের এক আখ্যান। বাংলাদেশের দুর্ধর্ষ একদল তরুনের রক্তে ঝড় তোলা বীরত্বের গাঁথা। ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যাকারী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বুকে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা। হায়েনার খাঁচা থেকে স্বাধীনতা সূর্য ছিনিয়ে আনার অসম্ভব প্রতিজ্ঞা নিয়ে তাঁরা ঘর ও স্বজন ছেড়েছিলেন। জানতেন, হতে পারে এটাই শেষ যাওয়া।

শাফী ইমাম রুমী বলেছিলেন, “যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না”।

সূর্যকে তাঁরা বন্দি করেছিলেন,প্রাণের বিনিময়ে। আজ যে মাটিতে দাঁড়াই, যে মাটির শস্য আমাদের অন্ন যোগায়। যে মাটিতে আমরা মিশে যাব, সেই মাটি দিয়ে গেছেন একাত্তরের কিছু অসামান্য তুলনাহীন মানুষ। এই ভূখণ্ডের প্রতি ইঞ্চি মাটি পরম শ্রদ্ধেয় রুমী’দের রক্তের দামে কেনা।

রুমি আমাদের তরুণ রক্তের বিমূর্ত প্রকাশ , প্রোটিনের পোস্টারে লেখা দ্রোহের প্রতিশব্দ । রুমী হারিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়েই আমরা তাঁকে ফিরে পেয়েছি।পেয়েছি তাঁর মায়ের লেখায়। আর স্বাধীন বাংলাদেশে পতাকা যে বাতাসে দীপ্তভাবে ওড়ে, সেই আকাশে একটু খেয়াল করলেই টের পাওয়া যাবে রুমী আছেন, রুমীরা আছেন, দিনে-রাতে, আলো-অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে তাঁদের অস্তিত্ব।

শুভ জন্মদিন হে বীর , আজন্ম নত মাথায় শ্রদ্ধায় , ভালোবাসায় মিশে রবে আমাদের হৃদয়ে।

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]