রূপবতী মেয়েদের বন্ধু থাকেনা, থাকে চাটুকার-মনরো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

‘হলিউড এমন একটি স্থান যেখানে হাজার ডলার ব্যয় করা হয় কেবল একটি চুমুর পেছনে অথচ হৃদয়ের জন্য, ভালোবাসার জন্য একটি কড়িও ব্যায় করা হয় না।’

-মারলিন মনরো

মনরোকে হলিউডের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ নায়িকা বললেও হয়তো কেউ আপত্তি করবেন না। ভুবনমোহিনী হাসির মায়াজালে তাঁর সময়কার তরুণদের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন তিনি। হয়েছিলেন অনেক তরুণের দীর্ঘশ্বাসের কারণ। তাঁদের সেই দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘ হয়েছিলো সাফল্যের উত্তুঙ্গ সময়ে এ তারকার জীবনের আলো নিভে যাওয়ায়।

মেরিলিন মনরো যেন রূপকথার গল্পের এক দুখিনি রাজকুমারী। খ্যাতি, যশ, প্রতিপত্তি—সবই তাঁর হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছিলো। কিন্তু তারপরও কোথায় যেনো দুঃখের এক ছবি রাখা ছিলো তাঁর জীবনে। সে দুঃখের বোঝা বইতে না পেরেই হয়তো নিজেই নিভিয়ে দিয়েছিলেন নিজের আলো। কে জানতো, তাঁর ভুবনজয়ী হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিলো অস্ফুট হাজারো কান্নার শব্দ।

দুখিনি এই রাজকুমারীর জন্ম আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস হাসপাতালে, ১৯২৬ সালের ১ জুন। মেরিলিন মনরো তাঁর আসল নাম নয়। শুরুতে তাঁর নাম ছিল নরমা জেন মর্টেনশন। নিষ্ঠুর সভ্যতা সেই সময়ের ছোট্ট এই শিশুকে পিতৃপরিচয় দিতে পারেনি। তাই জন্মসনদে পদবি পাল্টে তাঁর নাম হয়ে যায় নরমা জেন বেকার। মনরোর মা গ্ল্যাডির প্রথম স্বামীর পদবি ওটা। তিনি মেয়ের নামের সঙ্গে সেটাই জুড়ে দেন। ওই নামে দীক্ষিতও হন মনরো। তবে মায়ের আদর বেশি দিন কপালে জোটেনি মনরোর। কারণ, মনরো যখন নেহায়েতই শিশু, তখনই তাঁর মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মায়ের আর্থিক ও মানসিক এই অসংগতির কারণে মনরোকে আশ্রয় নিতে হয় এতিমখানায়। ১১ বছর বয়স পর্যন্ত এভাবেই কাটে। এরপর তাঁর জীবনে কিছু সময়ের জন্য পরিবারের স্নেহ মেলে। মায়ের বান্ধবী গ্রেস গডার্ড তাঁকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু সেই সুখও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৪১ সালে গ্রেসের স্বামী ডক গডার্ড ইস্ট কোস্টে বদলি হলে দারিদ্র্যের কারণে তাঁরা মনরোকে আর তাঁদের সঙ্গে রাখতে পারেননি। পালক বাবা-মা মনরোকে আবার এতিমখানাতেই ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। মনরোর বয়স তখন ১৬। এতিমখানার জীবন এড়ানোর জন্য তাঁর সামনে একটিই পথ খোলা ছিলো। তা হলো বিয়ের পিঁড়িতে বসা এবং শেষ পর্যন্ত মনরো তা-ই করলেন। প্রতিবেশী ব্যবসায়ী জিমি ডগার্থির সঙ্গে মালাবদল করেন। বিয়ের পর জিমি ব্যবসায়িক কাজে দীর্ঘ সময়ের জন্য জাহাজে করে চলে যান সাগরে।

দ্য মিসফিটস ছবির দৃশ্যে মেরিলিন মনরো ও ক্লার্ক গ্যাবল

বেঁচে থাকার সংগ্রামে মনোযোগী মনরো তখন কাজ নেন একটি সমরাস্ত্র কারখানায়। সেখানেই তিনি সুন্দরের সন্ধানী এক ফটোগ্রাফারের নজরে পড়ে যান। সেই ফটোগ্রাফারের মাধ্যমেই মডেলিংয়ে নাম লেখান মনরো। এরপর ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে তাঁর জীবন। মডেল হওয়ার সুবাদে বহু ম্যাগাজিনের কভারে উঠে আসেন তিনি। একপর্যায়ে হলিউডের বিখ্যাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের জন্য স্ক্রিন টেস্ট দেন মনরো। প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে পারেন, মনরো অসামান্য সুন্দরী। সঙ্গে রয়েছে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতা। একই সময়ে মনরোর সঙ্গে তাঁর স্বামীর সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয় এবং ১৯৪৬ সালে তাঁদের ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। ওই বছরই মনরো তাঁর প্রথম ছবিতে সাইন করেন এবং নরমা জেন বেকার পাল্টে হয়ে যান মেরিলিন মনরো। নামের সঙ্গে পরিবর্তন আসে চেহারায়। স্বর্ণকেশী হিসেবে মনরো আবির্ভূত হন সবার সামনে।

তবে ১৯৫০ সালের আগে মনরো তেমন একটা নজর কাড়তে পারেননি। ১৯৫৩ সালে নায়াগ্রা ছবি দিয়ে স্বপ্নপূরণ হয় তাঁর। এই ছবি তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এরপর একে একে রিলিজ হয় জেন্টেলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস, হাউ টু ম্যারি আ মিলিওনিয়ার, দেয়ার’জ নো বিজনেস লাইক শো বিজনেস, দি সেভেন ইয়ার ইচ ও বাস স্টপ-এর মতো সফল সিনেমা।

‘দি সেভেন ইয়ার ইচ’ সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৫ সালে। তারই একটি দৃশ্য শুধু বিখ্যাতই হয়নি, কালজয়ী হয়ে গিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। দৃশ্যে দেখা গিয়েছিলো, আচমকা সাবওয়ের সামনের একটি ঝাঁঝরি থেকে উঠে এলো দমকা হাওয়া, সেই হাওয়ায় অনেকখানি উঠে যাওয়া স্কার্টটি হেসে কোনও মতে দু’হাত দিয়ে সামলে নিচ্ছেন মেরিলিন।

১৯৬২ সালের আগস্ট মাসের পঞ্চম দিন, মেরিলিন মনরোকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্র্যান্টউডের বিলাসবহুল বাড়িতে একাকী মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবনে মৃত্যু হয় এই রূপকুমারীর। সেই পাগল করা দিনের ভক্তকুলের অনেকে জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসেও দীর্ঘশ্বাস গোপন করেন মনরোর জন্য। এখনো প্রশ্ন উঠে, কেন আত্মহত্যা করবেন মনরো! তিনি তো খ্যাতির শীর্ষে ছিলেন তখন। আবার তাঁকে হত্যাই বা করবে কে? কীসের শত্রুতা তাঁর সঙ্গে? সবই রহস্যাবৃত।

শুভ জন্মদিন দু:খিনী রাজকন্যা, ভালোবাসায় স্মরণ করছি।

মেরিলিন মনরো কি দারুণ বলেছিলেন- রূপবতী মেয়েদের বন্ধু থাকেনা, থাকে একদল চাটুকার।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]