রূপের যে তার নেই কো শেষ

নিজামুল হক বিপুল

বিশ্ব কবির ‘সোনার বাংলা’, নজরুলরে ‘বাংলাদেশ’

জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’, রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশ।

গীতিকার ও সঙ্গিত শিল্পী গৌরী প্রসন্ন মজুমদার নিজের ভূখন্ড সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন। বাংলাদেশের যে রূপের কোন শেষ নেই, তা নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। বাংলাদেশ যে কত সুন্দর, কত সুন্দর, কত সুন্দর সেটি লিখে বা বলে বোঝানো যাবে না। সে

রাখাইন পল্লীতে বৌদ্ধমন্দির

টির জন্য দরকার সুন্দর খোলা চোখ। দরকার সুন্দর মন। দরকার ঘুরে বেড়ানো।

আমি ছোটবেলা থেকেই অনেকটা বাউন্ডুলে প্রকৃতির। সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করতাম। বেরিয়ে পড়তাম ঘর থেকে। সেই সুযোগটাকে আরো প্রসারিত করেছে আমার পেশা। মানে ‘সাংবাদিকতা’। তাই সাংবাদিকতা পেশার কাছে আমি ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ। এই একটি পেশার কারণেই প্রায় আড়াই দশক ধরে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে দেশের নানা অঞ্চলে। গ্রাম থেকে গ্রামে। শহরে, বন্দরে, রেল স্টেশনে…। ঘুরে বেড়িয়েছি হাওড়-বাওর।ে পাহাড়-টিলায় ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে আমার কাছে নেশার মত। সাগর, তার নোনা জল, নরম বালি মাটি আমাকে কাছে টানে। সুযোগ পেলেই ছুটে যাই সেসব স্থানে।তবে বাংলাদেশের সৌন্দর্য্য শুধু আমাকে বা আমাদেরকেই মুগ্ধ করে না। কাছে টানে হাজারো বিদেশীকে। দূর দেশ থেকে তারা ছুটে আসেন এই রূপসী বাংলায়…রূপের বাংলায়…ষড় ঋতুর বাংলায়…। দু’নয়ন ভরে তারা উপভোগ করেন বাংলার সবুজকে…সৌন্দর্য্যকে, উপভোগ করেন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে। বাংলার কৃষ্টি কালচার আমাদের মত বিদেশীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ফাতারার বনে আছে সুন্দরী গাছ

অপরূপ সৌন্দর্য্যমন্ডিত এই বাংলাদেশে দেশি-বিদেশী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটের অভাব নেই। এরকম একটি আকর্ষণীয় স্পট হচ্ছে সাগর কন্যা ‘কুয়াকাটা’। এই সমুদ্র সৈকতটি শুধু সৈকত হিসেবেই আকর্ষণীয় নয়। এর আকর্ষণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এর চারপাশ ঘিরে। এর প্রধান আকর্ষণই হচ্ছে এই সৈকত থেকেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত’ের অনন্য দৃশ্য উপভোগ করা যায়। আছে সুন্দরবন, ঝাউবন, লাল কাঁকড়া, বৌদ্ধ মন্দির, রাখাইন পল্লী, সৎসঙ্গ মন্দির, লেবুর বন, সুটকি পল্লী, কাউয়ার চর। আছে সাগরে মিশে যাওয়া তিন নদীর মোহনা ‘আন্ধারমানিক’। আছে ন্যাচারাল ফরেস্ট ফাতরার বন আর ট্যাংরাগিরি। দেখা যায়, সবুজে ঘেরা সুন্দর সুন্দর গ্রাম। অসংখ্য নদ-নদী…নদীর ঢেউ…।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ কিলোমিটার। পটুয়াখালী জেলার অন্তর্গত এই সমুদ্র সৈকতটি শত বছর ধরেই বিদ্যমান। কিন্তু এটি যে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি সমুদ্র সৈকত সেটি আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগেও কেউ জানতো না ।
দীর্ঘ দিন ধরে কুয়াকাটার নাম শুনলেও আমার কখনই যাওয়া হয়নি এই সাগর কন্যার কাছে। নেওয়া হয়নি তার ভালোবাসার স্পর্শ। এবার বিচ কার্নিভাল উপলক্ষে একটা সুযোগ এসেছিল। সঙ্গে সঙ্গেই সেটি লুফে নেই। এই কার্নিভালের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। সংবাদকর্মী হিসেবে আরো কয়েকজনের সঙ্গে আমাকেও সেখানে আমন্ত্রণ জানায় (বিটিবি)। ট্যুরিজম বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ….এর সাধারণ সম্পাদক মিজান রহমান ঢাকা থেকে যাওয়া সাংবাদিকদের বিষয়ে সব দায়িত্ব পালন করছিল। সেই আমাকে জোর করে নিয়ে যায় কুয়াকাটা।
১৩ জানুয়ারি রাতে সুন্দরবন-১০ লঞ্চে আমরা জনা বিশেক সাংবাদিক রওয়ানা হই বরিশালের পথে। লঞ্চের আড্ডাবাজি আর গাল গল্পের মধ্যেই চলে আমাদের খাওয়া পর্ব। ইলিশ, রূপচাঁদা আর নানা রকম ভর্তা দিয়ে রাতের ভরপেট খাবার শেষে ধীরে ধীরে আমরা সকলেই ঘুমের রাজ্যে। ভোর রাতে লঞ্চের সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। আমরা পৌঁছে গেছি বরিশাল। বাইরে ঠান্ডা আবহাওয়া। কিন্তু তেমন টের পাওয়া গেল না। কা

ফাতারার বনের ওপারে আমতলী

রণ লঞ্চ থেকে নেমেই আমরা আগে থেকে আমাদের জন্য রাখা গাড়িতে করে রওয়ানা হই কুয়াকাটার পথে। প্রায় তিন ঘণ্টার পথ। গাড়ি ছুটে চলছে পিচ ঢালা পথ ধরে। রাস্তার দুই পাশে নানা প্রজাতির গাছ সড়কটাকে করে তুলেছে দৃষ্টি নন্দন ও আকর্ষণীয়। এমন সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে আর পুরোনো দিনের সব গান শুনতে শুনতে আমরা যাচ্ছি কুয়াকাটার দিকে। গান শুনে আমাদের গাড়ির চালকের রুচী বোধ দেখে আমরা মুগ্ধ। এর ফাাঁক ফাঁকেই মাঝে মধ্যে হাতে থাকা ডিএসএলআর এ ক্লিক…ভোরের সূর্যোদয়ের ছবি…। প্রায় মিনিট ২০-২৫ এর মধ্যেই গাড়ি থেমে গেল একটি নদীর পাড়ে। ফেরি পার হতে হবে।
অগত্যা কি আর করা সবাই গাড়ি থেকে নেমে ফেরি ঘাটে থাকা চায়ের দোকানে ঢুকে এক পেয়ালা করে গরুর দুধের গরম চা মেরে দিলাম। সঙ্গে কেউ খেলেন কলা, কেউবা বিস্কুট…। চা পর্ব শেষে মিজান বিল পরিশোধ করতে না করতেই ফেরি হাজির। আমরা উঠে পড়লাম। ফেরিতে চললো ক্যামেরার ক্লিকবাজি…কেউ বা ব্যস্ত সেলফি বাজিতে…।
বলাই হল না, আমরা যে ফেরিঘাটে ছিলাম সেটি লেবুখালি ফেরি ঘাট। এই পাড়ে বরিশাল আর ওই পাড়ে পটুয়াখালী মাঝখানে বিশাল ‘পায়রা’ নদী। আরেকটা তথ্য, আর বেশি দিন এখানে ফেরিতে পারাপারের সুযোগ থাকবে না। সেতু নির্মাণের কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। এটি নির্মাণ হয়ে গেলে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যেতে আর কোন ফেরিই পার হতে হবে না। বরিশাল থেকে কোন রকম বিড়ম্বনা ছাড়াই এক ঝটকায় চলে যাওয়া যাবে সাগর কন্যার কাছে।
ফেরী পার হয়ে সকালের নাস্তার জন্য বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কের পটুয়াখালীর বান্দাকাটা বাজারে থামলো গাড়ি। এই বাজারের জলিলের ভাতের দোকানের সুখ্যাতি ওই অঞ্চল জুড়ে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই দোকানে কয়েক মণ চালের ভাতা বিক্রি হয়। সঙ্গী মিজানের বাড়ি যেহেতু বরিশাল সে কারণে সে বললো এই দোকানের ভাতের খ্যাতি অনেক। আলু ভর্তাসহ নানারকম ভর্তা দিয়ে মানুষ সকালে এই দোকানেই খায় নাস্তা হসিবে।ে কিন্তু আমি সকালে ভাত খাওয়ার বিপক্ষে। অন্য সঙ্গীরা ভর্তা-ভাত খেলেও আমি রুটেিতই আস্থা রাখলাম। তবে এটা সত্য যারা ভাত খেয়েছেন প্রত্যেকেই বলেছেন, এই হোটেলের ভাত-ভর্তা অনেক সু-স্বাদু। আমি না কি মিস করেছি এমন খাবার…আফসোস থাকবে না কি…। সকালের নাস্তা পর্ব শেষে আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম কুয়াকাটা। শেষ হল আমাদের ১০৬ কিলোমিটারের মিনিবাস জার্নি। আর রাতের লঞ্চ জার্নি তো ছিল বোনাস।

এমন খাল দিয়ে যেতে হয় ফাতারার বনে।

রাতে লঞ্চ আর প্রায় তিন ঘণ্টার মাইক্রোবাস জার্নির পর আমরা যখন কুয়াকাটা পৌঁছলাম তখন ঘঁড়ির কাটায় সকাল সোয়া ১০টা। পর্যটন মোটেলে আমাদের জন্য আগে থেকেই রুম বুকিং ছিল। মোটেলের রিসিপশন থেকে চাবি নিয়ে যথারীতি রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হলাম। তারপর মিনিট কয়েকের মধ্যেই আমরা বের হয়ে পড়লাম। কুয়াকাটা শহরটা এক রাস্তার র শহর। বরিশাল থেকে পটুয়াখালী হয়ে পিচ ঢালা যে সড়কটি কুয়াকাটা পৌঁছেছে তার শেষ হচ্ছে জিরো পয়েন্ট। মানে সাগরের মুখে। ওইখান থেকে ভাঙ্গাচোরা বেড়িবাঁধ দুই দিকে চলে গেছে। জিরো পয়েন্ট থেকে নেমে গেলাম সমুদ্র সৈকতের দিকে।

সমুদ্র সৈকত বলতে যা বুঝায় তার সব বৈশিষ্ট্যটুকুই আছে কুয়াকাটায়। বেশ দীর্ঘ সৈকত। শীতের সকালে ভাটার সময়ে সাগরের ম্লান ঢেউয়ের সঙ্গে হিমেল বাতাস। দুপুর পর্যন্ত সাগর পাড়েই কাটলো সময়। যেহেতু পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত হচ্ছে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের রাণী… তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সূর্যাস্তরে সময়েই সৈকতে থাকব। দুপুরের খাবার ও কিছু সময় বিশ্রাম শেষে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম সহকর্মী মিজান, সেরাজুজ্জামান আর আমি। মোটেল থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই সমুদ্রের ছোঁয়া পাওয়া যায়। সৈকতে নামতেই দেখলাম শত শত মানুষের ভীড়। পর্যটকরা মেতে উঠেছেন সূর্যাস্ত উৎসবে। আমার কাছে মনে হয়েছে কুয়াকাটা গিয়ে সূর্যাস্ত উৎসবে মেতে না উঠলে কুয়াকাটা যাওয়াটাই বৃথা। কুয়াশা না থাকায় আকাশ বেশ পরিস্কার ছিল, তাই প্রথম দিনেই সূর্যাস্তটা উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। সেরাজুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে মেতে উঠলাম ক্যামেরার ক্লিকবাজি আর হালের সেলফিবাজিতে। এই সেলফিবাজি করতে গিয়ে হাল সময়ে কত না প্রাণ ঝড়ে গেছে, তবুও থামছে না এই নেশা…।
সূর্য ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে…তেজহীন আস্ত সূর্য ধীরে ধীরে অর্ধেক হয়েছে…তারপর আরও ক্ষয়িঞ্চু…। এক সময় রক্তবর্ণ সূর্য হারিয়ে গেল পশ্চিম দিগন্তে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তরকে আলোকিত করতে। অন্ধকার গ্রাস করতে লাগলো কুয়াকাটাকে। তাই বলে পর্যটকরা একটুও চিন্ততি নয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে যতই রাত হচ্ছে পাল¬া দিয়ে বাড়ছে জোয়ারের তীব্রতাও। বাড়ছে সমুদ্রের গর্জন…আর পর্যটকরা সমুদ্রের সেই গর্জনই শুনলেন কাছ থেকে।

সাগর পাড়ে বসা বিভিন্ন খাবারের দোকানে মানুষের ভীড় দেখে আমরা গেলাম রাখাইন স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের পিঠার দোকানে। পাটিসাপ্টা, মিষ্টি পিঠা আর কলাপাতার পিঠাসহ বিভিন্ন রকম পিঠা নিয়ে তারা একটি স্টল বসিয়েছেন। একটি পিঠা তো আমাদের মুগ্ধ করলো। প্রথমে পা

সৈকতে সূর্যাস্ত

টিসাপ্টা খেলেও কলাপাতার পিঠা নিয়ে আমার মনে সংশয় ছিল। রাখাইন তরুণ তরুণীদের অনুরোধে একটি পিঠা খেয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আরেকটি নিলাম। এটি হচ্ছে রাখাইনদের তৈরি বিশেষ পিঠা। বিন্নি চাল আর নারিকেল কলাপাতার ভিতরে দিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়। এর নাম ‘বিন্নি পিঠা।’

পিঠা পর্ব শেষে রাত একটু গভীর হলে শীতকে সঙ্গী করে সহকর্মী সেরাজুজ্জামান, মিজান, সোহাগ ও আমি বরিশালের সংবাদ কর্মী কাজী মিরাজের নিমন্ত্রণে গরম রুটরি সঙ্গে হাঁসের মাংস আর পানীয় ভক্ষণ করতে ছুটে গেলাম তাদের হোটেল রুম।ে প্রায় দুই ঘণ্টার আড্ডাবাজি আর পাণীয় শেষ করে গভীর রাতে ফিরলাম পর্যটন মোটেলে। মোটেলে ফেরার পথেই সিদ্ধান্ত নিলাম সূর্যোদয় দেখতে গঙ্গামতির চরে যাবো।
সূর্যোদয়ের সন্ধানে ভোর রাতে মোটরবাইকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে গঙ্গামতির চরে যাবার সদ্ধিান্ত নলিাম। দূরত্ব খুব বেশি না। পাঁচ-সাত কিলোমিটার। কুয়াকাটায় গিয়ে সূর্যোদয় দেখতে চাইলে গঙ্গামতির চরের বিকল্প নেই। আর সূর্যোদয় না দেখলে কুয়াকাটায় যাওয়াটাই অনর্থক। কিন্তু সূর্যোদয় উপভোগ করা যত সহজ ঠিক ততোটাই কঠিন গঙ্গামতির চরে যাওয়াটা। সেই কঠিন কাজটাই করার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। যেতে হয় মোটরসাইকেলে। ভোর রাতেই জিরো পয়েন্টে জড়ো হয় মোটরসাইকেলগুলো। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে সোজা মোটেলের প্রধান ফটকে। তীব্র শীত। ঠান্ডায় জবুথবু অবস্থা। শুধু মাত্র দুই চোখ খোলা রেখে সামনে পা বাড়ালাম। এরই মধ্যে সামনে হাজির দু’টি মোটরবাইক। বাইক চালককে জানালাম আমরা প্রায় সাত আট জন। প্রতি মোটরবাইকে চালকসহ তিনজন করে যাওয়া যায়। তিনটি মোটরসাইকেলে আমরা উঠলাম ছয় জন। বাকি থাকল আমাদের সঙ্গে যাওয়া সহকর্মী অন্তরা বিশ্বাস। তাকে একটি মোটরসাইকেলে উঠিয়ে দিয়ে একসঙ্গে যাত্রা করলাম সবাই। উদ্দেশ্যে গঙ্গামতির চর।

আছে এমন ঝাউবন

জিরো পয়েন্ট থেকে মোটরবাইক ভাঙ্গাচোরা বেঁড়িবাঁধ ধরে একটু সামনে গিয়েই নেমে গেল সমুদ্র সৈকতে। চালক বেলাল জানালেন,এখন পুরো রাস্তাই যেতে হবে সৈকতের নরম বালু মাড়িয়ে। সাগরের গর্জন শোনা যাচ্ছে। চালকের পিছনে শক্ত করে বসালাম। তীব্র শীতে অবস্থা একেবারেই কাহিল। মিনিট বিশেক এর মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম কাক্ষতি গন্তব্যে। সূর্যোদয়ের তখনও ঢের বাকি। ভোর তখন পাঁচটা। আমরা গঙ্গামতির চরে গড়ে উঠা চায়ের দোকানে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহালাম। এরই সঙ্গে সিদ্ধ ডিম, গরম চা আর বিস্কুট পর্ব শেষ করলাম।
ধীরে ধীরে রাতের আঁধার কাটছে। কুয়াশার তেমন একটা দাপট নেই। সাগরের দিকে চোখ যেতেই দেখলাম সামনে শুধুই চর…সাগর অনেক দূরে। চালক বেলালকে বললাম, এখান থেকে তো সূর্যোদোয় ভালোভাবে দেখা যাবে না। তখনই বেলাল জানালো, স্যার আরেকটু সামনে গেলে সূর্যোদয়টা দেখতে পারবেন ভালোভাবে। কিন্তু সেখানে যাওয়াটা বেশ কষ্ট হবে। একটি চ্যানেল পার হতে হবে। কোন রকম দ্বিধা না করেই বললাম চলেন। কিছু দূর যেতেই চ্যানেলের সামনে আটকা পড়লাম। শুধু আমরা নয়, বহু লোক পার হবেন এই চ্যানেল। সঙ্গে মোটরসাইকেলও। মাত্র দু’টি নৌকা। সবাই পার হলাম কয়েকবারে। তারপর বনের ভিতর দিয়ে আবারো বালুকাময় সৈকত ধরে আমরা পৌঁছে গেলাম সেই কাক্ষতি স্থানে।
অতপর সূর্যের অপেক্ষা…
সবাই তাকিয়ে আছি পূর্ব দিগন্ত.ে..কিন্তু সূর্য মামার দেখা নেই। কুয়াশা যেন কিছুটা বাধা সৃষ্টি করেছে। ঘঁড়ির কাটা ক্রমেই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এরই মধ্যে সূর্য মামা হাজির হলেন সাগরের নোনা জল থেকে খানিক উপরে। কুয়াশাকে উপেক্ষা করে শত শত পর্যটককে আনন্দ দিতেই যেন সূর্য মামার চোখ রাঙানি। সে কি সুন্দর ভোরের সূর্য। সবার মধ্যে আনন্দের বন্যা। নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে রূপালী পর্দার সেলিব্রেটি সবাই চিৎকার করে উঠলেন… ওই দেখা যায় রক্ত লাল সূর্য…। কুয়াকাটাকে দেখা গেল তার আসল চেহারায়।

গঙ্গারচরে প্রথম প্রহরে সূর্যোদয়

সূর্যোদোয় উপভোগ করার পাশাপাশি হিড়িক পড়লো ছবি তোলার। এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে সাধ্যমত চেষ্টা চললো। আমরাও পিছিয়ে ছিলাম না। চললো একক ও গ্রুপ ছবি তোলা। সেলফি তো আছেই।
সেখান থেকে ঝাউবন,লাল কাঁকড়ার চর হয়ে রাখাইন পল¬ী ঘুরে দেখা। লাল কাঁকড়ার চর হচ্ছে চমৎকার এক স্থান। শুধুমাত্র এখানেই দেখা পাওয়া যায় লাল কাঁকড়া’র। দল বেঁধে এরা ঘুরে বেড়ায় সমুদ্র সৈকতে। আর রাখাইন পল¬ীতেই আছে ৩৬ ফুট উঁচু বৌদ্ধ মন্দির। সেটি দর্শন শেষে আমরা ফিরলাম কুয়াকাটায়। কিন্তু ঘুরতে গিয়ে ক্লান্তকিে কোন রকম ছাড় না দিয়েই আমরা দুপুরে বেড়িয়ে পড়লাম বন দেখতে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে স্প্রিডবোটে করে সাগর ধরেই রওয়ানা হলাম ফাতরার বন আর আন্ধারমানিক মোহনা দেখতে।
ফাতরার বনের পুরোটাই পড়েছে বরগুনার আমতলী উপজেলায়। সাগরের মাঝ দিয়ে বিশাল বিশাল ঢেউ উপেক্ষা করে তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে আমাদের বহনকারী স্প্রিডবোট। প্রায় ৩৫ মিনিট জার্নি শেষে সাগর থেকে একটি ছোট খাল ধরে ঢুকে গেলাম বনের ভিতরে। এটি টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এরই একটি অংশ ফাতরার বন। অনেকটা দেখতে সুন্দরবনের মত। ঘন বন। এই টেংরাগিরিতে গড়ে তোলা হয়েছে ইকোট্যুারিজম। যেখানে একটি এলাকা জুড়ে আছে মায়া হরিণের দল। বন ঘুরে দেখার সময়ই দেখা মিললো বন কর্মকর্তা সজিব মজুমদারের সঙ্গ।ে পরিচয় যেনে তিনি জানালেন, ফাতরার বন খুবই গভীর বন। এখানে এখনও অনেক স্থান আছে যেখানে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। তাই গভীর বনে কখনই যাওয়া ঠকি না। অজগরসহ সরিসৃপ জাতীয় প্রচুর প্রাণী আছে।
ফাতরার বনে দু’একটি সরু গলি পথ আছে। যেগুলো দিয়ে পর্যটকরা ঘুরে দেখার চেষ্টা করেন। বনের সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করেন। বনের অপর অংশে গিয়ে সরু একটি পথ ধরে আমরা ভিতরের দিকে যেতেই পিছনে দেখা মিলল আন্ধারমানিক নদীর। চমৎকার দৃশ্য। নদীর তীরে থাকা গাছের শিকড় তুলে ধরছিল তার সৌন্দর্য্য। এই সৌন্দর্য্য উপভোগ করতেই শত শত পর্যটক ভিড় করেন ফাতরার বনে।
ফাতরার বন ঘুরে দেখা শেষে আন্ধারমানিক মোহনা হয়ে আমরা ফিরে আসলাম কুয়াকাটায়। আন্ধারমানিক মোহনাটি হচ্ছে দুই নদীর মিলনস্থল বা মোহনা। আন্ধারমানিক আর রামনাবাদ নদী এখানে মিলিত হয়ে সাগরে নেমেছে। এটিও পর্যটকদের কাছে অন্যতম একটি আকর্ষণ। এরইমধ্য দিয়ে শেষ হল আমাদের কুয়াকাটা দর্শন।

ছবি: লেখক