রেহানা মরিয়ম নূর কেমন সিনেমা

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবিটা একেবারেই পুতু পুতু মার্কা নয়।সিনেমা হলের হালকা আলো আঁধারে নরম সিটে শরীর এলিয়ে দিয়ে, পপকর্ণের হালকা উষ্ণ বক্স উজাড় করে এক ধরণের তৃপ্তি নিয়ে বের হয়ে আসার চেনা প্রতিক্রিয়াটাও এই ছবির দর্শকদের ওপর কাজ করেনি তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ নিঃসন্দেহে ঝাঁঝ মাখানো। ছবি দেখার পর দর্শকদের ভ্রুকুটি, সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লেখার ছররা ছিটানোর বহর দেখে অন্তত তাই মনে হয়েছে।

রেহানা মরিয়ম নূর ছবিটা কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার পর থেকেই আলোচনায় উঠে আসে। উৎসবে ছবিটি প্রশংসিত হবার পর তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এবং তার সিনেমা নিয়ে চায়ের কাপে আরেক দফা আলোচনার ঝড় ওঠে। ছবিটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন সিনেমা ভালোবাসেন এমন দর্শকরা। বাংলাদেশের সিনেমা হলে প্রদর্শন পর্বে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। এবার অবশ্য আলোচনার টেবিল বেশ সরগরম। বাক্যবাণ আর বাক্য ব্যয় দুটি-ই সামাজিক গণমাধ্যমের পৃষ্ঠাকে আগুনে করে রেখেছে।

কেমন ছবি রেহানা মরিয়ম নূর? এ ছবির ত্রুটিগুলো কী কী? রেহানা মরিয়ম নূর কি নারীবাদী চেতনাকে ভুল বার্তা দিচ্ছে? এই সিনেমাটির স্ক্রিন ইষৎ নীলাভ কেন! ক্যামেরা ইচ্ছাকৃত ভাবে কাঁপানো হয়েছে না হলের পর্দাই কাঁপে? অনেকদিন পর অভিনয় শিল্পী বাঁধন পর্দা কাঁপানো অভিনয় করলেন না তার চরিত্রটি এক ধরণের বিভ্রান্তিকর জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলো-এমন ধরণের অসংখ্য মন্তব্য আর জল্পনা আর প্রশ্নে ভাসছে রেহানা মরিয়ম নূরের নৌকা।

অনেকদিন পরে বাংলাদেশে একটা সিনেমা নিয়ে দর্শকদের এতটা সরব হতে দেখে আমার অন্তত ভালো লেগেছে। ছবিটাকে প্রায় ময়নাতদন্তের টেবিলে তুলে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন দর্শক। এই ছবির দর্শন,  প্রায়োগিক কৌশলে বিচ্যুতি ইত্যাদি নানান বিষয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা চলেছে, চলছে। একদল  এক তুড়িতে ছবিটাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্য দল মাথা নেড়ে বলছেন, উড়িয়ে দেয়া যাবে না; ভাবনার অবকাশ আছে।

আমিও সিনেমাটা দেখেছি হলে বসে। সেই সন্ধ্যায় হলভর্তি দর্শক ছিলো না। থাকার কথাও নয়। কারণ এই ধরণের ছবি সবাই হুড়মুড়িয়ে হলে গিয়ে টিকেট কেটে দেখবে সেটা এখনও দুরাশাই। সেদিন সন্ধ্যায় হলে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে কয়েকজন সিনেমা শেষ হওয়ার আগেই বের হয়ে গেছেন। হয়তো তারা ভুল করে ঢুকেছিলেন অথবা টিকেট কেটে আসনে বসার পর নিজেদের সিনেমা নির্বাচনের ভুলটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। শুরুতেই তো লিখেছি, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ সাধারণ ফর্মূলার স্বস্তিদায়ক সিনেমা নয়। একটু প্রেম, একটু হাসি, একটু ভুল, একটু কাছে আসি-প্রভৃতি উপাদান মিশিয়ে  আর মিলিয়ে তৈরি অরুণ বরুণ কিরণমালা টাইপ সিনেমার কাতারে নেই রেহানা মরিয়ম নূর।যেমন এই ছবির টাইটেল কার্ডে কোথাও লেখা নেই এটি একটি নারীবাদী সিনেমা।পরিচালক এমন কথা বলতে চানওনি বোধ হয়। কোনো কোনো সমালোচক বলেছেন, এই সিনেমা নারীবাদের জন্য ভুল বার্তা দিচ্ছে। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার দেখে মনে হয়েছে, নারীবাদ নিয়ে এই সিনেমাটি বড় পরিসরে ডিল করতে যায়নি। তবে হ্যাঁ, মাঝে রেহানার নাক ফুল পরা এবং সংসারে উইমেন লিবারেশন নিয়ে এক ভাবী চরিত্রের মিনিট পাঁচেকের বক্তৃতা দেখেশুনে কেউ যদি বলেন, রেহানা মরিয়ম নূর নারীবাদ নিয়ে কথা বলতে চেয়েছে তাহলে তাকে ভুল বলা যায় না।

বিক্ষিপ্ত, বিপর্যস্ত মনের এক নারী এই সিনেমায় সারাক্ষণ সচল ছিলেন তার চরিত্রের ভেতরকার অস্থিতিশীলতাকে বুঝিয়ে দিতে।ক্যামেরায় শুরু থেকেই রেহানা চরিত্রটিকে মুভমেন্টের ভেতরে দেখা যায়। এই মুভমেন্টটা রেহানা ছবির সর্বত্রই করেছেন।বাইরে বৃষ্টি, ব্যাকগ্রাউন্ডে আকাশে বজ্রের গর্জন মূখ্য চরিত্রের ভেতরকার ডিপ্রেশনটাকেই বাড়িয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে আমার। এই ডিপ্রেশন, মনের ভেতরে অপ্রাপ্তিজনিত তিক্ততা আর অনিশ্চয়তাই হয়তো রেহানাকে স্ক্রিপ্টে করে তুলেছে নিজের শিশু সন্তানটিরও বিপক্ষ শক্তি। কেউ কেউ বলেওছেন, শিশুর প্রতি অভিবাবকের অবিচার দেখানো হয়েছে, রেহানা চরিত্রটি নিজের সন্তানকেই নিপীড়ন করেছেন।যা সমাজকে খারাপ বার্তা দিতে পারে। আমার কিন্তু ছবিটি দেখতে দেখতে রেহানার আচরণকে অস্বাভাবিক মনে হয়নিেএ ধরণের একটি অথবা একাধিক চরিত্র আমাদের সমাজে আছে। টানা ডিপ্রেশন থেকে অনেক মানুষই এরকম আচরণ করতে পারেন। কিন্তু এই রেহানা চরিত্রটি দেখে কেউ এ ধরণের আচরণ শিখবে বলে আমার মনে হয়নি। যারা রেহানা মরিয়ম নূর দেখতে হলে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে এটুকু গভীরতা আশা করি আছে।

আমি আসলে সিনেমার বোদ্ধা দর্শক নই। খুব লেখাপড়াও নেই নারীবাদ বা অন্যান্য প্রশ্নে। পর্দায়  দেশের এক তরুণের তৈরি করা একটি সিনেমা দেখতে আমার ভালো লেগেছে। তার প্রচেষ্টার পাশে থাকতে পেরে আননন্দ হয়েছে। ভালো লেগেছে মূখ্য চরিত্রে বাঁধন আর শিশুটির অনবদ্য অভিনয়। আমি মনে করি, ছবি নিয়ে যতো আলোচনা, সমালোচনা তাও খুব ইতিবাচক। চলুক বিতর্ক, আলোচনা, আমাদের কাজিয়া। একটা সিনেমাকে কেন্দ্র করে এসব তো স্বাস্থ্যকর। দিন শেষে পরিচালক, অভিনয় শিল্পীরাই উপকৃত হন।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box