রোদে লেপ বলে, শীত…

কলম্বাসের শহর নিউ ইয়র্কে এখনও বরফ পড়া শুরু হয়নি। কনকনে ঠাণ্ড হাওয়ার পতাকা উড়ছে সেখানে। ডিসেম্বরের শেষেই নাকি আকাশ থেকে নেমে আসবে সাদা তুষার।আর এই ভিড়ের শহরের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছি, কাল ছাদে লেপ রোদে দিতে হবে; শীত আসছে।

নিউ ইয়র্ক শহরে লেপ-কম্বল রোদে দেয়ার বালাই নেই। অথচ গগন ডাক্তারের ডিসপেনসারির সামনের বেড়ায় সকাল থেকে রোদ পোহাচ্ছে হারিসের পুরনো আর লোম উঠে যাওয়া কম্বলটা। আকাশ বড় বড় নীল চোখ মেলে তাকিয়ে আছে শীতের স্বচ্ছ হাওয়া ভেদ করে মাটির দিকে। খড়ের গাদায় পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে বিড়াল।  দরজায় কাঠি ভাঙা একটা ঝাড়ুও কবে থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে শীতের আসা।এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো ‘রোদে লেপ বলে, শীত…’

কলম্বাসের শহরে শীত আসা-না-আসার সঙ্গে হারিসের জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই।  তেমন কোনো শীত হারিস স্বপ্নেও কোনোদিন দেখেনি তার এই সত্তর বছরের জীবনে। তবু সে টের পায়, শীত নেমেছে মাঠে মাঠে। বড়ই গাছে পাতার ঝিলিমিলিতে লেখা আছে আরেকটা নতুন শীতের গল্প। পৌষের সকালের রোদে কম্বলটা এখনই গরম করে রাখতে হবে। রাতে রণ’পায় চড়ে ডাকাতের মতো শীত এসে হাজির হলে তখন কী করবে হারিস?তার গালে কয়েকদিনের না-কামানো দাড়িও জানে গ্রামে শীত বড় ভয়ংকর।বিকেল থেকে পাতা পোড়ানোর ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যায় গভীর কুয়াশা।আলো কমে এলে হ্যারিকেন প্যাঁচার মতো চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে ঘরের অন্ধকারগুলোর দিকে একমনে। কেরোসিন কেনার পয়সা থাকে না বলে রাত গভীর হওয়ার পর সেই চোখও বন্ধ হয়ে আসে। বাইরে মাঠ থেকে মাঠে বয়ে চলে হাওয়া। ঠাণ্ডায় কান ব্যথা করে হারিসের। তখন তো ওই লোম ওঠা বিগত জন্মের কম্বলটাই একমাত্র ভেলা।

শহর ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে দু’সপ্তাহের অফিসিয়াল শীত পোস্টার সেঁটে দিয়েছে ইতিমধ্যে। উত্তরের হাওয়া ঢুকে পড়ে জানান দিচ্ছে শীত এসে গেছে। আসলেই এসেছে কি? করোনাভাইরাসের দাপটকে পাশ কাটিয়ে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর সুপর্ণার কাছে শীতকাল সত্যি এসে পৌঁছালো? শীতকাল পৌঁছালো এই ভিড়ের শহরে, প্রতিদিন যানজটে নাকাল হয়ে?

১৯৬২ সালের নভেম্বর মাস। শীত ছেয়ে আছে লন্ডন শহরে।মা-কে চিঠি লিখছেন সিলভিয়া প্লাথ। সেটাই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ শীত। আর তিন মাস পরেই মৃত্যু যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো তাঁর জন্য। ‘আমি থাকার জন্য একটা ভালো বাড়ি খুঁজে পেয়েছি এবং আন্দাজ করো মা ওই বাড়িতে কে থাকতেন? ডব্লিউ বি. ইয়েটস। বাড়িটার দরজায় নীল রঙের বোর্ডে নামটা লেখা আছে!’। কিন্তু সেই বাড়িটাতে সিলভিয়া প্লাথের আর থাকা হয়নি। ১৯৬৩ সালের ১১ ফ্রেব্রুয়ারী তার আগেই চলে এসেছিলো। শেষ শীতের অন্তরালে তিনি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন নিজেকে।মাঝে মাঝে মনে হয়, শীতের আত্মার ভিতরে কোথায় যেন একটা ব্যথা আছে। প্রত্যাহার শব্দটা সেই ব্যথার অনুভূতিটাকে হয়তো কিছুটা প্রকাশ করতে সক্ষম। শীত ঋতু মুখ ফিরিয়ে নেয়। বাড়ির উঠানে আলকাতরা মাখিয়ে তুলে রাখা নৌকা সেই প্রত্যাহার শব্দটাকে চেনে। চেনে টান ধরা নদী, চরে ঘুরে বেড়ানো একলা বক।কিন্তু শীত তো দেয়ও অনেক কিছু। মৌসুমী ফুলের চাষে মগ্ন নাগরিক হৃদয় শীতের কাছ থেকেই হাত পেতে নেয় শীতের ভোরে ছাদে এক কাপ গরম চা। চায়ে ভাসে হয়তো আধ খানা তুলসি পাতার মৃদু ঘ্রাণ। বাজারে আমিষের প্রতাপ ঢাকা পড়ে কপি আর পালংয়ের দাপাদাপিতে। তবুও শীত এসে সব হাত ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় কোথায়! মনে টান পড়ে।

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে এই কঠিন শহরেও শোনা যায় ঘুঘু পাখি ডাকছে। নিঃসঙ্গ কুকুর কাদের বাড়ির দরজার কাছে নাক লুকিয়ে ঘুমের রাজ্যে তখনও।বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে পা রাখতেই ছ্যাঁৎ করে ওঠে শরীর শীত লাগার অনুভূতিতে।জানালার কাঁচে তখন শেকড় ছড়ায় বাইরের সামান্য নির্জনতাটুকু। পথে বের হলে মোটরের তেলপোড়ানো গন্ধ নয়, কেমন শুষ্ক, উদাসী, ঘরপালানো ঘ্রাণ কোনো নাগরিকের অন্যমনষ্ক মনের প্রান্তরকে চমকে দেয়।তখন কোথায় যায় মানুষ? কোথায় অন্য গল্পের ছাই ওড়ে? শহরের নির্জন ঘরবাড়িগুলো কেমন অচেনা আর নরম হয়ে থাকে শীতের ভোরে।

শীত আসার আগে কত কিছুর আয়োজন পৃথিবীতে। পূর্বপুরুষদের চিহ্নিত করা কত লক্ষণ প্রকৃতির পাল্টে যাওয়াকে নির্ণয় করে। অভিবাসী পাখিরা কি এবার মাটি থেকে অনেক উঁচুতে উড়ে যাচ্ছে? তাহলে সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া সুন্দর থাকবে। এই পাখিরা কি খুব নিচু দিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে উষ্ণমন্ডলীয় কোনো দেশে? তাহলে এবার শীত আসবে রুদ্র চেহারা নিয়ে। শীতের ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে আসা দিন কতকিছু জানায় আমাদের। লোহা আর কংক্রিটে পা গেঁথে দাঁড়িয়ে থাকা শহুরে সীমায় কোথাও একটা গাছ লাগাতে না-পারার অক্ষমতা জ্বলজ্বল করলেও শিউলিফুল ঠিক এসে হাজির হয় শহরতলায়।  অসুখের আগুনে পোড়া পৃথিবীর মানুষ। তবু শীত কত কী গল্প করে তাদের সঙ্গে! বিকেলে কমলা রঙের আলোর ভিতরে ডাক টিকেটের মতো সেঁটে থাকে পাতা পোড়ানোর ঘ্রাণ। চালতা ফুল ঝরে পড়ে  আলতো ভঙ্গিতে।

কবি আবুল হাসান তাঁর কবিতায় স্বাতীকে শীতে কার্ডিগ্যান পরে আসতে বলেছেন। এখনও কার্ডিগ্যান পরে কেউ? বেণী দুলিয়ে কলেজে আসে শীতের মেয়েরা? তাদের ঠোঁটে তখনও শুকিয়ে না-যাওয়া নিভিয়া ক্রিমের চকচক। চিবুকে অথবা কানের লতিতে হয়তো তিব্বত স্নো‘র একটু বাড়তি বিজ্ঞাপন। নাহ, এক ফুঁয়ে যেন উড়ে গেছে কয়েক শতাব্দী জীবনের পাতা থেকে। প্রতিবার শীত আসে, এসেছে। কিন্তু পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। তাই তো যাবার কথা। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তবুও কেন জানি না উলের বল, কাটা আর নীল সোয়েটারের মাপ দিতে আগ্রহী এক বালক আজও শীত এলে পাশের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। স্পষ্ট দেখতে পাই তাকে।

শীত এলে কত কী করে মানুষ! বেড়ানোর নাম করে ছোটে। সমুদ্র শহরে গিয়ে শহুরে জীবনের উদ্বেগ আর উৎকন্ঠাকে ঝেড়ে আসতে চায় ওই শহরে গায়ে-গা লাগা ভিড়ে। পারে কি? তাদের উদভ্রান্ত কন্ঠস্বর মিছিমিছি পতাকা ওড়ায় ছুটির দিনের  ক্যালেন্ডারে। হারিসের লেপ রোদে পোহায় শুধু গগন ডাক্তারের ডিসপেনসারির সামনের বেড়ায়।শীত আসে কোনো কোনো একা ঘুমের ভিতরে। নির্জন পথ ধরে হেঁটে গেলে আচমকা কোনো বাড়ির দেয়ালের পাশে ছড়িয়ে পড়ে থাকা অলস রোদ বলে-শীত আসছে। তখন চাওয়া পাওয়ার খুনোখুনিতে ভরা এই শহরকে অলৌকিক নদীর পাড়ের এক দেশ বলে মনে হয়।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ প্রাণের বাংলা, গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box