রোমাঞ্চকর নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে…

সালমা রহমান শুভ্রা

এক.

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯। দিনটা ছিলো আমার ভ্রমণপাগল বাবা’র জন্মদিন। এবছর ৮৫ পূর্ণ করতেন।আগের মাসে আলীকদম ট্যুরের সঙ্গী ছিলো নিতুল। চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে যাবার ইচ্ছের কথা জানালো ক’দিন আগে। তবে এই ট্যুরটা হবে শেয়ারড বেসিসে, মানে- পুরো খরচটা আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবো। যথারীতি একটা মেসেঞ্জার গ্রুপও তৈরি করে ফেললো নিতুল, যেখানে আগে থেকে কিছু প্রস্তুতির কথা জানিয়ে রাখা হচ্ছিলো।

আগের সপ্তাহে চারদিন ধরে লামা আর আলীকদম ট্রেকিং করে ক্লান্ত থাকলেও নাপিত্তাছড়া যেতে রাজি হয়ে গেলাম। ভাবলাম, বাবা’র মৃত্যুবার্ষিকীর মতো জন্মদিনটাও বরাবরের মতো ঘরে বসে না কাটিয়ে এবার একটু আলাদাভাবে পালন করা যাক। আর ট্রেন কিংবা বাসে চট্টগ্রামে আসা-যাওয়ার পথে পড়ায় মীরসরাই-সীতাকুণ্ডের ট্রেইলগুলোতে ঘোরার ইচ্ছে বহুদিন ধরে মনের মধ্যে পুষে রাখতে হচ্ছিলো। দূর থেকে দেখা পাহাড়ে ট্রেকিং করতে না পারার মনোকষ্টও থেকে গিয়েছিলো।

ফোন করলাম মানুকে। ওরও বহুদিন থেকে ইচ্ছে আমরা একসঙ্গে ট্যুর করবো। দোনোমনো করতে করতে মানু শেষপর্যন্ত জানালো ১১ বছরের মেয়ে জারাসহ ও সপরিবারে আসছে! আর নিতুল আসছে নীরব আর শেহনীলাকে নিয়ে। যারা আসছে, তাদের অনেকের জীবনে প্রথমবার ট্রেকিঙের অভিজ্ঞতা হবে এটা। কাজেই কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না।এদিকে খবর দিলাম টিটোকেও। লামা থেকে হাজির হয়ে গেলো ও। ওরে পইপই করে বলে দিয়েছিলাম সঙ্গে লম্বা দড়ি নিয়ে আসতে। যেহেতু এখনও মাঝেমাঝে বৃষ্টি হচ্ছে, কাজেই হড়কাবান বা ফ্ল্যাসফ্লাডে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। আর পাহাড়ি এলাকায় হড়কাবান যারা দেখেন নি, তার ধারণাও করতে পারবেন না হঠাৎই পানির স্রোত আপনাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে! হড়কাবানের মাঝে পড়ে পাহাড়ি এলাকায় বিশেষ করে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনাও কম নয়!

টিটো এসে টিকেট করতে চলে গেলো। কক্সবাজার থেকে ফেনীগামী স্টারলাইনের টিকেট করে আনলো। টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়বে রাত ১১টায়। রাতে খেয়ে ১০টার পরপরই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। রাতে জার্নি করলে এমনিতেই আমার ঘুম আসে না। ফলে পরের দিনটা শরীরে ক্লান্তির ভাবটা থেকেই যায়। অথচ, এর কোনো বিকল্পও আপাতত নেই!মীরসরাই বাজারে পৌঁছালাম সম্ভবত ভোর সাড়ে ৪টার দিকে। বাইরে তখনও ঘুটঘুটে অন্ধকার। ফুটওভার ব্রিজের নিচে একটা দোকানের ভেতরে বাতি জ্বালানো দেখে ওখানেই বাকিদের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এসে ওপারেই নামবে ওরা।

বাকিরা মীরসরাই বাজারে এসে পৌঁছালো সকাল ৬টার দিকে। ফ্রেস হয়ে সাত জনের হালকা নাস্তা করতে করতে বাজলো ৭টা। নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে যেতে হলে নামতে হয় নয় দুয়ারী বাজারে। এতো সকালে লেগুনা কিংবা সিএনজি অটোই ভরসা। সিএনজি অটো অতিরিক্ত ভাড়া চাইছিলো। আমরা লেগুনার খোঁজে থাকলাম। হঠাৎ করেই একটা খালি লেগুনা দেখে নীরব দৌড়ে গেলো ড্রাইভারকে পাকড়াও করতে। সফলও হলো। রওয়ানা হলাম নয় দুয়ারির পথে। ভেতরে ঢোকার পথে রাস্তার মোড় থেকে বাঁশের লাঠি কিনে নিলাম সবাই।

পাকা রাস্তাটা এক জায়গায় গিয়ে ইটের রাস্তায় পড়েছে। লেগুনা আমাদের সেখানে নামিয়ে দিলো। এরপর থেকে হাঁটা পথ। রেললাইনের ওপার থেকে শুরু হলো একেবারেই কাঁচা রাস্তা।রেললাইনের পাশেই বেশ কয়েকটা বাঁশ আর টিনের তৈরি হোটেল। পর্যটকরা এসব হোটেলে খাওয়া-দাওয়া, ট্রাভেল ব্যাগ রাখা, টয়লেট সারা, জামা-কাপড় বদলানোর মতো প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিতে পারেন। এখানে বেশ ভিড় থাকায় আমরা রেললাইনের ওপারের কোনো হোটেলে প্রয়োজনীয় কাজ সারার সিদ্ধান্ত নিলাম।

রেললাইন পার হওয়ার পর আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন ‘ইশরাত‘ হোটেলের মালিক। বললেন, তার হোটেলে ব্যাগ রাখা যাবে, ট্রেকিং শুরু ও শেষে কাপড় বদলানো যাবে, আর দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু তার দোকানে সকালের নাস্তার ব্যবস্থা ছিলো না! সবারই অপরিচিত ট্রেইল। কতোক্ষণে ফিরবো ঠিক নেই। তাই আমরা ভরপেট নাস্তা করে ট্রেইলে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিলাম। হোটেল মালিক বাড়ি থেকে নাস্তা আনিয়ে দেবেন বলে জানালেন। আমরাও অপেক্ষায় থাকলাম। হোটেলটা আসলে চাষের জমিতে তৈরি। আশপাশে ক্ষেত। এসব দেখে আর গল্প করে সময় কাটাতে হচ্ছিলো। দূর থেকে চোখে পড়ছিলো পাহাড়চূড়ার চারদিকে হালকা মেঘের আনাগোনা।

এদিকে অপেক্ষার পালা তো ফুরোয় না! ক্ষুধায় সবারই অস্থির অবস্থা! আর আমি তো ডায়াবেটিক পেসেন্ট! তারওপর সারারাত ঘুমাই নি! ফলে, ব্লাডসুগার কমতে আর মেজাজ চড়তে শুরু করলো! হোটেল মালিককে বারবার তাগিদ দিতে থাকলাম সবাই মিলে। শেষপর্যন্ত গরম গরম নাস্তা এসে পৌঁছালো প্রায় ৯টার দিকে। আটার রুটি, ডিমভাজি, সব্জি দিয়ে নাস্তা সারলাম। এরপর পেছনে সদ্যতৈরি টয়লেট আর চেঞ্জরুম থেকে ঘুরে এলাম একেএকে সবাই।

সব্জিক্ষেত পেরিয়ে পাহাড়ের পথে এগিয়ে গিয়ে ট্রেইলে ঢুকলাম। এদিকে আকাশে মেঘ। সাগরে চলছে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত। বোঝা গেলো বৃষ্টি শুরু হতে আর বেশি সময় নেবে না। কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটা কতোটা থাকবে, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ট্রেইলে বৃষ্টি মানেই হড়কাবান।এক জায়গায় গিয়ে বেশ খানিকটা লাফ দিয়ে ঝিরিপথে নামতে হলো। পানি বেশি না। ঝিরিটা এখানে চওড়া নালায় রূপ নিয়েছে। ক্ষেতে সেচের পানি এখান থেকেই যায়।

মূল ট্রেইলে ঢোকার মুখে পথনির্দেশনার দু‘টো সাইনবোর্ড চোখে পড়লো। একটু পর শুরু হলো টিপটিপ বৃষ্টি। ঝিরিপথে পানি বাড়তে শুরু করলো। সঙ্গে স্রোতের বেগ। যতোই সামনে আগাচ্ছিলাম, বৃষ্টির বেগ ততোই বাড়ছিলো। ঝিরির তীব্র স্রোত উল্টো পথে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে তাই খুব সাবধান থাকতে হচ্ছিলো।এর আগের মাসে নিতুল, টিটো আর আমি সারাদিন ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে দামতুয়ায় ঘুরে এসেছি। তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো নতুন ট্রেকারদের নিয়ে। অথচ তারা সবচেয়ে সাবধানী হয়ে খুব ভালোভাবে পুরো পথটা কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই ট্রেকিং করেছে! বিশেষ করে জারা যেভাবে ট্রেকিং করলো, আমরা সবাই রীতিমতো অবাক! ভাবছিলাম, ওর বয়স থেকে ট্রেকিং শুরু করলে অনেক বাচ্চাই হয়তো দেশের সবগুলো ঝর্ণা আর জলপ্রপাত দেখে শেষ করতে পারবে।(চলবে)

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box