রোমাঞ্চকর নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালমা রহমান শুভ্রা

দুই.

বৃষ্টির কারণে পুরো ঝিরিপথে ব্যাপক স্রোত থাকায় এই ট্রেইলটা আমার কাছে বেশ চ্যালেঞ্জিং, এক্সাইটিং আর অ্যাডভেঞ্চারাস মনে হয়েছে। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া বিশাল বিশাল পাথর আর স্রোতের কারণে জায়গায় জায়গায় পানির গভীরতা বোঝা যাচ্ছিলো না। ঝিরিপথের ডান-বাম ধরে মাঝে মাঝে ছোটছোট পানির ধারা বা ছড়া নেমে এসেছে। ঝিরিপথে হারিয়ে যাবার ভয় না থাকলেও নিরাপত্তার কথা ভেবে মানসের প্রস্তাবে এরমধ্যে অনিল ত্রিপুরাকে গাইড হিসেবে সঙ্গে নেয়া হলো। ও অনেকক্ষণ ধরে আমাদের পেছনে ঘুরঘুর করছিলো সঙ্গে রাখার অনুরোধ জানিয়ে। কিছুদূর এগোতেই দেখা পেয়ে গেলাম প্রথম ক্যাসকেডের। স্থানীয়রা একে ডাকেন ‘উজিল্লা’ বলে। বেশ ঢালু এই ক্যাসকেডটার নিচে গভীর খাদ। পানির গভীরতা বোঝা যাচ্ছিলো না। অনেকে সেখানে দড়ি ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিলো।

আমরা ঝুঁকি নিলাম না। অনিলের পরামর্শমতো পাশের পাথুরে পাহাড় ধরে ওপরে চলে এলাম। এখানে কয়েক ঘর ত্রিপুরার বাস। একটা বাড়ির জানালায় দুই শিশু দাঁড়িয়ে ছিলো। সেই জানালা খুললেই দেখা যায় ক্যাসকেডটা। পাহাড়বেয়ে খানিকটা নামতেই চোখে পড়লো ‘কুপিকাটা খুম’। বৃষ্টির কারণে গর্জন করতে করতে তীব্রবেগে পানি আছড়ে পড়ছিলো নিচের খুমে। বেশ গভীর। ভালো সাঁতার জানা লোকজনও পানির তোড় দেখে এর কাছে যাবার চেষ্টা করতে দেখলাম না! আমি পানির স্রোত দেখে পাহাড়ের গা ঘেঁষে পিচ্ছিল পথ ধরেই সামনে আগালাম। বুঝলাম, খুবই ঝুঁকি নিয়ে ফেলছি। পানির তীব্র স্রোতের কারণে অন্যের সাহায্য ছাড়া ওপারে যাওয়া সম্ভব না। টিটো এসে হাত ধরে পার করালো ঠিকই, কিন্তু উপরে উঠতে গিয়ে পিছলে হাঁটুতে ব্যথা পেলাম। তবে সবাই মিলে বেশ কিছুটা সময় ঠাণ্ডা পানিতে শরীর জুড়িয়ে নিলাম ওখানে।

এরপর আরেকটা বেশ খাড়া পাহাড়বেয়ে ওপরে উঠতে হলো। বৃষ্টি আর লোকজনের ভেজা পায়ে যাতায়াতের কারণে পথটা বেশ পিচ্ছিল হয়ে ছিলো। ওপরে পাওয়া গেলো ইসমাইলের দোকান। ওর নিজ হাতে তৈরি সুস্বাদু লেবুর শরবত, শসা আর ডিম দিয়ে আরেকদফা নাস্তা করলাম।

ওখান থেকে বাঁয়ের পথ ধরে হেঁটে বেশ খানিকটা পথ নিচে নামতে হলো। আবারও শুরু হলো দারুণ সুন্দর আর অনেকটা বুনো পরিবেশের আরেকটা ঝিরিপথ। এখানে পাথরগুলো বিশালাকৃতির আর বিচিত্র সব সাইজের। অনেকটা পথ হাঁটার পর একটা জায়গায় ঝিরিপথ দু’দিকে চলে গেছে। একটা ওয়াই জংশন, যার বাঁ দিকেরটা বান্দরখুম বা বাঘবিয়ানির পথ, আর সোজা পথটা গিয়ে শেষ হয়েছে বেশ উপর থেকে আছড়ে পড়া মিঠাছড়ি জলপ্রপাতে, যাকে অনেকে বলেন নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা। অথচ এটা ঝর্ণা না, জলপ্রপাত এবং এর আপস্ট্রিমও আছে। তবে ওপরে ওঠার পথটা বেশ বিপজ্জনক হওয়ায় আপস্ট্রিমে যাবার চিন্তা আপাতত মাথা থেকে বাদ দিতে হলো।

দীর্ঘসময় ধরে মিঠাছড়িতে ভিজলাম আমরা। গভীর কোনো খুম না থাকায় সহজেই এর নিচে চলে যাওয়া যায়। ব্যাপক ফটোসেশনও হলো। একজনকে অনুরোধ করলাম মিঠাছড়ির সামনে আমাদের একটা গ্রুপ ছবি তুলে দিতে।

সেই ওয়াই জংশনে ফিরে রওনা দিলাম বান্দরখুমের পথে। কিন্তু যাবার পথে বাঁকা হয়ে থাকা একটা পাথরে পা পিছলে চোট পাওয়ায় বান্দরখুম দেখার আশা বাদ দিতে হলো। সামনের পথটা আরও বুনো আর আরও বড় বড় পাথরের চাঁই আছে জেনে আমার সঙ্গে থেকে গেলো মানু আর জারা। ঘণ্টাখানেক ওখানেই ফটোসেশন হলো। বিশেষ করে বুনো প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের অসীম সাহসী শিশু ট্রেকারের অনেকগুলো মুহূর্ত ছবি আর ভিডিওতে ধরে রাখলাম।

পরে নিতুলের কাছ থেকে বান্দরখুমের ভিডিওটা ধার নিয়েছিলাম। ওর বর্ণনা অনুযায়ী চেপে আসা দুই পাহাড়ের খাঁজ ধরে অনেক ওপর থেকে নেমে এসেছে ‘বান্দরখুম’। পাহাড়ের দেয়ালে ওদের কথাগুলো প্রতিধ্বনিতও হচ্ছিলো।

ওদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো আমাদের। এদিকে ফোনের নেটওয়ার্কও নেই যে খবর নেবো কতোদূরে আছে ওরা। ঘণ্টাখানেক পর উঁচু পাথরটার ওপরে মানসের দেখা মিললো। আমরা ফিরতি পথ ধরলাম।

তবে এবার আগের পথে না ফিরে ইসমাইলের দোকানের কাছে এসে বাঁয়ের পথ ধরলাম। ততোক্ষণে টানা বৃষ্টি আর লোকজনের চলাচলের কারণে পথটা বেশ অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছিলো পাহাড়ের কিনারা ধরে পিছলে পিছলে নামছি। একটু এদিক-ওদিক হলেই সোজা নিচের জঙ্গলে হারিয়ে যেতে হবে।

সবারই জুতা কিংবা স্যান্ডেল কাদায় আটকে যাচ্ছিলো। এরমধ্যে কেবল মানুকেই ভালোবেসে একটা জোঁক পাশের বাঁশঝাড় থেকে লাফিয়ে পড়লো ওর গালে! পেছনের একজন সেটা ছাড়ানোর ব্যবস্থাও করলো।

নামছি তো নামছিই! পথ আর শেষ হয় না! শেষপর্যন্ত এসে পৌঁছুলাম প্রথম সাইনবোর্ডের কাছে। যাবার সময় বাঁয়ের ঝিরিপথ ধরে চলে গেছিলাম আমরা। হড়কাবানের সঙ্গে যুদ্ধ করা আমরা বিধ্বস্ত অবস্থায় এসে পড়লাম ‘ইসরাত’ হোটেলে ঠিক ৪টায়। খাবার রেডিই ছিলো। ভেজা কাপড় পাল্টে কোনোরকমে ফ্রেস হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম এরইমধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের ওপর।

আসার পথটা তখন আরও কাদাময়! ক্লান্ত শরীরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিলো কখন পিঠ সোজা করে বিছানায় ঘুমাতে যাবো!

এদিকে ওদের ঢাকায় ফেরার বাসের সময় হয়ে যাচ্ছিলো। রাস্তা পেরিয়ে ওপারে পেট্রোল পাম্পে এসে একটা লোকাল বাস পেয়ে গেলাম। সবাই মীরসরাই ফিরলাম। কাউন্টারে গিয়ে জানা গেলো আমরা পৌঁছানোর কয়েক মিনিট আগে ওদের বাসটা এখান থেকে চলে গেছে! নীরব ঢাকায় ফোন করে পরের বাসে ফেরার ব্যবস্থা করে ফেললো।

ওদের বিদায় দিয়ে আমি আর টিটো চট্টগ্রামের বাসে উঠে বসলাম। মাঝে ছোটো কুমিরায় নেমে চলে গেলাম ভার্সিটির ব্যাচমেট‘র বাসায়। ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে কোনোরকমে খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। অনেকদিন পর গভীর আর দীর্ঘসময় ধরে ঘুম!

পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় নাস্তা করে আবারও ঘুমিয়েছি দেড়টা পর্যন্ত। লাঞ্চ করে ছোট কুমিরা থেকে ৩টায় রওয়ানা দিয়ে চট্টগ্রাম এসে দামপাড়া থেকে কক্সবাজারের বাসে উঠলাম বিকেল ৪টায়। নিজ ডেরায় এসে পৌঁছুতে বাজলো প্রায় ১০টা! (শেষ)


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box