লক্ষী,সাতই কার্তিক ১৪২৫

অদিতি বসুরায় (কবি, সাংবাদিক)

(কলকাতা থেকে): লক্ষী এক আশ্চর্য মিথ। লক্ষী এক যোজন-গন্ধা চাঁদের আলো। লক্ষীবারে আগে মেয়েরা বাপের বাড়িও যাওয়ার অনুমতি পেত না জানা গেছে।
লক্ষীদি বলে যে মেয়েটি বাড়ি বাড়ি রেশন দিয়ে আসত সামান্য পয়সার বিনিময়ে, সে মারা গেছে গত বছর। টিবিতে। এদিকে শুনতে পাই, টিবিতে নাকি এখন আর কেউ মরে না! 
পদ্মলক্ষীর নাম শোনে নি আমাদের লক্ষীদি। পদ্মলক্ষীর মত আয়ত আঁখি- আমি খুব কম দেখেছি। সবচেয়ে বেশি দেখেছি, লক্ষীমেয়েদের। তারা উলু দিতে পারে। প্রতি পুজোয় জামদানি শাড়ি উপহার পায়। বাড়ির সবার খাওয়া হলে, খেতে বসে। তারা সব ঢাকা-চাপা দিতে শেখে ছেলেবেলা থেকে। তাদের নালিশ নেই। স্তুতি আছে। তাদের সমস্ত সম্পর্ক, সাদা আলপনার মতোই গ্লানিহীন। শীতকালে তারা মোজা দিয়ে কোলাপুরি চপ্পল পরে। স্নিকার্স নৈব নৈব চ। তাদের হাতের মাছের ঝোল খেয়ে ধন্য ধন্য করে শ্বশুড়বাড়ির লোক। তাই লক্ষীমেয়েদের বিয়ে ভাঙে না। শুধু মাঝে মাঝে হাতের কালশিটে ঢাকতে লম্বা হাতা ব্লাউজ পরা, তাদের বাধ্যতামূলক। আসলে লক্ষী মানে ওদিককার ফার্স্ট বেঞ্চের মেয়ের দল।
লক্ষী চলে গেলেন এই পুজোতে। লক্ষী চট্টোপাধ্যায়। বয়েস পঞ্চাশ। মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু। প্রেসক্রিপশনে অসহায় চিকিৎসক যা লিখতে পারেন নি।
আসলে লক্ষী মানে লক্ষী মুর্মু। ধূপগুড়ির জঙ্গলে যাঁর যোনীতে পুঁতে দেওয়া হয়েছে মাছমারার কোঁচ। হাঁসুয়া বসিয়ে দেওয়া হয়েছে নিমাঙ্গে। চিরে দেওয়া হয়েছে পেট। আগে সেখানে ঝাঁপ দিয়েছিল তিন তিন জন সমর্থ পুরুষ। আমার সেই লক্ষী এখন অজ্ঞান। লক্ষী এখন জীবনের কান্ট্রি সাইডে লড়াই দিচ্ছেন। আর সেই শয্যায় প্রায় চেতনাহীন মায়ের স্তন্যপান করছে সাত মাসের লক্ষী-শাবক।
আজ পূর্ণিমা। আজ লক্ষীপুজো। আজ সাতই কার্তিক,১৪২৫। আজ সারারাত জাগবে যারা, তারা এই আদি-লক্ষীমায়ের জন্য প্রার্থনা রেখো।
বলো, বাঁচো। বলো, বেঁচে থাক।
যোনী যায়, যাক!
চলে যাক, স্ত্রী অঙ্গ – শুধু থাক মা, লক্ষী মা আমার, এ অনন্ত অন্ধকার কোনদিন কাটবে না, জ্যোৎস্না উঠবে না, সমস্ত মূর্তি নির্মাতার হাত খসে পড়বে – তুমি চলে গেলে, মা!
এখন হেমন্ত।
সামনে শীত। সামনে অঘ্রাণের হিম- ভয়ানক রাত।