লন্ডনের জীবন শুরু

ঊর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

প্রিয় মাতৃভূমি ছাড়ার জন্য বুকের ভেতর চিন্চিন্ ব্যথা আর অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা নিয়ে লন্ডন পৌঁছলাম। তখন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ভোর পাঁচটায় লন্ডন পৌঁছতো। প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম সাদা বরফে চারদিক ঢেকে আছে। সেটা ছিলো ফেব্রুয়ারী মাস। আমাকে নিতে এসেছিলেন বিবিসি বাংলা বিভাগের সিনিয়র প্রডিউসর সিরাজুর রহমান। তাঁকে অত ভোরে কষ্ট দেবার জন্য একটু খারাপই লাগলো। বিবিসির একটা হোস্টেল আছে। নতুন যারা আসে, তারা সেখানেই থাকে। কিন্তু আমি যেহেতু শিশু পুত্রসহ এসেছি, সেজন্য আমার সেখানে জায়গা হলো না। পরে অবশ্য সে ব্যবস্থা পাল্টে গিয়েছিলো। সিরাজ ভাই আমার জন্য দক্ষিণ লন্ডনে একটি বাড়ির একটি ঘর ঠিক করে রেখেছিলেন। সেখানে নিয়ে তুললেন আমাদের। সেখানে যাবার পর জানলাম সেটি এক পাকিস্তানী পরিবারের বাড়ি।

সিরাজুর রহমান

আমার পাকিস্তানীদের ব্যাপারে কিছু সমস্যা আছে। তাদের মেনে নেওয়াটা সহজ ছিলো না। কিন্তু সিরাজ ভাই নতুন বলে তাঁকে কিছু বললাম না। তিনি চলে গেলেন। তখনো বেশ সকাল। বাড়ির লোকজন ঘুমাচ্ছে। ঘরটা বেসমেন্ট’এ অর্থাৎ মাটির তলায়। হীটিং আছে, তবে তখন তাতে পয়সা ঢুকিয়ে সেটাকে চালু করতে হতো। সিরাজ ভাই চালু করে দিয়ে গেলেন। আমি তখন ব্রিটিশ কয়েন কোথায় পাবো? বুদ্ধি করে একটি কম্বল নিয়ে এসেছিলাম। সেটি জড়িয়ে মা-ছেলে ঘুম দিলাম। একটু বেলা হলে বেবী আপা এলেন। তিনি হাশেম ভাইর (সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশেম) স্ত্রী, আমাদের প্রিয় বুলু ভাবীর মেজবোন। তিনি সব দেখেশুনে বললেন, ‘এখানে তুমি থাকতে পারবে না। আমার সঙ্গে চলো।’ ঐ ঘরটির জন্য এক সপ্তাহের ভাড়া দেওয়া ছিলো। সেসব ভুলে জিনিসপত্র নিয়ে বেবী আপার সঙ্গে তাঁর বাড়ি গিয়ে উঠলাম। তাঁর ভাল নাম রিজিয়া ওয়াহাব। তাঁর স্বামী ড. আব্দুল ওয়াহাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।

বুশ হাউস

বিলেতে থেকেও তিনি আদ্যোপান্ত বাঙালি জীবন কাটান। খেয়ে উঠে পান খান। ঘরে লুঙ্গি পরেন। বুলুভাবী তাঁকে মেজভাই ডাকেন বলে আমিও তাই ডাকলাম। তাঁরা দু’ জনেই অত্যন্ত ভাল মানুষ। তাঁদের দুই পুত্র খোকন ও ছোটন এবং কন্যা বীথি আছে বাড়িতে। তারা বেশ বড়। কিন্তু রূপকের সঙ্গে মেজভাইর খুব জমে গেলো। রূপক বেশ স্বচ্ছন্দে তাঁদের সঙ্গে মিশে গেলো। তবে ও বরাবরই খুব মিশুক। বেবী আপা বললেন, ‘আগে চলো তোমাদের জন্য গরম জামা-কাপড় কিনি।’ গেলাম। রূপকের জন্য কোট, গরম টুপি, স্কার্ফ, গ্লাভস্ কেনা হলো। আমারও সেরকম কিছু কেনা হলো। বেবী আপার বাড়িতে থাকার জন্য হোমসিক হলাম না। বুলু ভাবীর মত তাঁরাও খুৃব ¯েœহপ্রবণ। গল্প-আড্ডায় সময় ভালই কাটলো। পরদিন বিবিসি’তে গেলাম। আন্ডারগ্রাউন্ড বা টিউবে যেতে হলো। দক্ষিণ লন্ডন থেকে মধ্য লন্ডন।

ছোটন আমাদের বালাম স্টেশনে নিয়ে গেলো। বললো, ভায়া ব্যাংকের ট্রেনে চড়তে হবে আর ব্যাংক স্টেশনে ট্রেন বদলাতে হবে। রূপককে নিয়েই গেলাম। এত বরফ আর ঠা-ায় বাচ্চাটার কষ্টই হচ্ছিলো। শুধু বললো, ‘মা, ঠোঁট ব্যথা করছে।’ যাহোক আমরা বুশ হাউজে পৌঁছে গেলাম। সেটাই ছিলো তখন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দফতর। রিসেপশনে নাম ও বিভাগের নাম জানাবার পর ওপর থেকে একজন এলো আমাদের নিয়ে যেতে। সেদিন সবার সঙ্গে আলাপ পরিচয় আর কিছু প্রশাসনিক দফতরে যেতে হলো। পার্সোনেল অফিসার অ্যান ডেন্ট’এর সঙ্গে আলাপ হলো। ফিনান্স বিভাগে গিয়ে কিছু সই-সাবুদ করতে হলো। বিভাগীয় প্রধান জন রেনার স্বাগত জানালেন। ইস্টার্ণ সার্ভিসের প্রধান উইলিয়ম ক্রলীর সঙ্গে দেখা হলো, তিনিও আমাকে স্বাগত জানালেন।

জন ও তাঁর সঙ্গে ঢাকায় দেখা হয়েছিলো। আলাপ হলো ইস্টার্ণ সার্ভিসের সহ-প্রধান ডেভিড পেজের সঙ্গে। বাংলা বিভাগে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আলাপ হলো। বাংলাদেশের ছেলে সৈকত রুশদী সেখানে খ-কালীন কাজ করছিলো। আমি ঢাকায় থাকতেই আমাকে জানিয়েছিলো, একজন সার্বক্ষণিক কর্মী গোলাম কাদের নতুন বাড়ি কিনেছেন। তাঁর বাড়িতে একটি ঘর ভাড়া নিতে পারি। কাদের ভাইর সঙ্গে আলাপ হলো। খুব হাসিখুশি-মিশুক মানুষ। বললাম, যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেদিনই তাঁর ঘরটি দেখতে যেতে চাই। তিনি বললেন, ‘আপনি তো খুব ডিটারমাইন্ড মহিলা।’ সেদিনই ঘর দেখে কাদের ভাইর সঙ্গে সমস্ত কথাবার্তা সম্পন্ন হলো। আমার বিলেতবাস শুরু হলো।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box