লাইফ উইথ ক্যান্সার-দুই

রুখসানা আক্তার

( ইংল্যাণ্ড থেকে): পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন যারা খুবই শিক্ষিত ভদ্র, সাংস্কৃতিমনা , ইন্টেলেকচুয়াল, ইত্যাদি। কিন্তু কিছু জিনিসের অভাব থেকে যায় , আর সেটা হলো মনুষত্ব এবং মানবিকতা। যাদের মধ্যে এই দু’টু গুন থাকে, তারা জন্মগত ভাবেই তা ধারণ করে।

আগের আমি

জোর করে মনুষত্ব এবং মানবিকতা অর্জন করা যায় না। কারণ এ দু’টু গুন শাশ্বত। আরোপিত ভাবে ধারণ করলে সেটা দেখানো এবং বলা পর্যন্তই সার। কিন্তু কার্যে অসার। আমার জীবনের এই অধ্যায়ে আমাকে যে সহযোগিতা সাহস এবং এই দুর্যোগের মোকাবিলা করার হিম্মত যুগিয়েছেন তার নাম না লিখে পারছিনা। যদিও উনার ভীষণ আপত্তি । কিন্তু যদি না লিখি তাহলে আমার জীবনের এই অধ্যায় পূর্ণাঙ্গতা পাবে না। ফেরেশতা আসলে মানুষের মধ্যেই বাস করে। আমি সুহেব ভাইর কথা বলছি। চ্যানেল আই এমডি রেজা আহমেদ ফয়সল চৌধুরী সুহেব। সুহেব ভাই আমাদের পারিবারিক বন্ধু। প্রায় দীর্ঘ সতেরো আঠারো বছরের পরিচয়। আমার প্রাক্তন এর সঙ্গে উনার পরিচয় ছিলো। সেই সুবাদে আমার বন্ধু। আমাদের ইমিগ্রেশনের সমস্যার সময়ে সুহেব ভাই অনেক সহযোগিতা করেছেন। যাইহোক , যখন সুহেব ভাই এর সঙ্গে ফোনে একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম তখন আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর কথা জানাই এবং অনুরোধ করি যে ভাবি মানে সুহেব ভাইয়ের স্ত্রী ডাঃ আনোয়ারা আলী কে এ ব্যাপারে একটু জিজ্ঞাস করতে কারণ ভাবি ব্রেষ্ট ক্যানসারের উপর গবেষণা করেছেন। সুয়েব ভাই আমার ভেতরের ভয়টা আমার কথা থেকেই টের পেয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার সঙ্গে কে যাবে।

এখন আমি

আমি বললাম কে যাবে আর । মেয়েতো কাছে নেই।এইতো আরেকটা শহরে নতুন জবে জয়েন করেছে। একাই যেতে হবে। সুহেব ভাই বুঝতে পেরেছিলেন যদি কোন খারাপ রেজাল্ট হয় তাহলে আমার জন্য একা এই দুঃসংবাদ ধারণ করা খুব কঠিন হবে। বলেন তুমি একা যেও না কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেও। আর যদি কাউকে না পাও তাহলে আমাকে জানিও। আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর একদিন আগে জানাই যে হয়তো আমার একাই যেতে হবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আগামী কাল কয়টার সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট । আমি বললাম নয়টা চল্লিশে। বললেন রেডি থেকো আমি ট্যাক্সি নিয়ে আসবো। আমি ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখি। এদিকে ছেলে বলে সেও সঙ্গে যাবে । কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম না কারণ যদি রেজাল্ট খারাপ হয় তাহলে হসপিটালে ছেলে যেন আমার তখনকার ভঙ্গুর অবস্থাটা না দেখে । দেখলে হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু ছেলের চাপা চাপিতে রাজি হই। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বার বার মনে হয়েছিলো যে আগামী কালকের দিনটাতে হয়তো আমার জীবনে আর একটা নতুন টর্নেডো শুরু হবে । অনেক কিছুই বদলে যাবে । গায়ে একটা অস্পষ্ট কাঁপুনি টের পাচ্ছিলাম। ছেলেকে বললাম আজ আম্মুর সঙ্গে ঘুমাও। ছেলে আমার ভালো ম্যাচিউর। আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তার বালিশ নিয়ে আমার কাছে শুয়ে পড়ে। আমি একটা হাতে ছেলের হাতটা জড়িয়ে ধরে রাতটা পার করার চেষ্টা করি কখনও জেগে আবার কখনো ঘুমিয়ে।। ভোরে ঘুম ভাঙে। কেমন উজ্জ্বল একটা দিনের শুরু ।উঠে নামাজ পড়ি। তারপর আস্তে আস্তে তৈরি হয়ে ছেলেকে ঘুম থেকে উঠাতে ডাকি। ছেলে উঠে রেডি হয়। ওকে নাস্তা দিয়ে আমি চা আর বিস্কিট খেয়ে সুহেব ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করি।(চলবে)

ছবি: লেখকের ফেইসবুক ও গুগল