লাইফ উইথ ক্যান্সার -৪

রুখসানা আক্তার

অগাস্টের নয় তারিখ সকাল নয়টায় Bartholomew’s হসপিটালে ক্যান্সার ইউনিটে প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। মনে প্রচন্ড দুশ্চিন্তা এবং তীক্ষ্ণ একটা ভয় নিয়ে সুহেব ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার ল্যাম্পের সাইজ দেখে কেন জানি আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিলো যে খারাপ কিছু একটা আমার জীবনে আসছে। যা এখন অজানা কতটুকু নিতে পারবো আর কত টুকু পথ ভাঙেতে ভাঙেতে যাবো। অনেকগুলো বন্ধুর পথ তো পাড়ি দিয়ে এলাম। আর কতটুকু সাহস বা শক্তি আমার মধ্যে অবশিষ্ট আছে । জানি না ,এই বোধ আমাকে খুঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে খাচ্ছিলো। আহা রে আমার দু’টো বাচ্চা। আর আর ভাবতে পারছিলাম না।

ছেলের সঙ্গে আমি

যথা সময়ে সুহেব ভাই ট্যাক্সি নিয়ে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। আমার মুখ দেখে বললেন এত দুশ্চিন্তা করছো কেন? কাল রাতে তোমার ভাবি আনোয়ারার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করেছি(ভাবি একজন ডাক্তার এবং ব্রেষ্ট ক্যান্সারের উপর উনি পড়াশুনা করেছেন) ও বলেছে এখনই এত এত দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই আগে টেস্ট গুলো হউক কনসালটেন্ট দেখুক তারপর দেখা যাবে। আর যদি কিছু হয়ও তবে এখন এটা নিরাময় যোগ্য। তারপর ও আমার মন থেকে ভার নামে না।

যেতে যেতে মনকে শান্ত রাখার জন্য সূরা ফাতেহা পাঠ করে যাচ্ছিলাম।
এক সময় হাসপাতালে পৌঁছে যাই। আমার হার্টবিট আরো দ্বিগুন জোরে বেড়ে যায়। শরীর দুর্বল লাগছিলো। হাসপাতালের ওয়েস্ট উইং এর প্রথম ফ্লোরের রিসিপিশনে গিয়ে আমি , নির্বাণ আর সুহেব ভাই বসি। আমরাই প্রথম সেখানে উপস্থিত হই। সুহেব ভাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর কাগজ নিয়ে রিসিপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলেন। ওরা বললো যথা সময়ে ডাকা হবে। প্রথমে মেমোগ্রাম হবে ,তারপর আল্ট্রাসাউন্ড এবং বায়োপসির সেম্পল নেয়া হবে তারপর কনসালটেন্ট দেখবেন। আমরা অপেক্ষা করছি। আস্তে আস্তে আরো লোকজন আসা শুরু করে। খুবই সুন্দর পরিবেশ। নার্স ,ডাক্তার, টেকনিশিয়ান সবাই খুবই কোপারেটিভ এবং খুব দরদ দিয়ে সেবা দেয়ার একটা পজেটিভ পরিবেশ। একদম মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতো।

আমার ডাক পড়লো। প্রথমে আমার ওয়েট এবং হাইট নেয়া হলো। তারপর আমাকে গাউন দেয়া হলো একটা রুমে নিয়ে । আমি কাপড় বদলিয়ে নিলাম। মেমোগ্রাম হলো তারপর আল্ট্রাসাউন্ড এবং বায়োপসির জন্য আরেকটা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। রিসিপিশনের  ভিতর দিয়ে ওই রুমে যেতে যেতে ছেলের শুকনা মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভিতর থেকে একটা কান্না দল পাকিয়ে গলা দিয়ে উঠে আসছিলো। কোনরকম ঢোক গিলে কান্না টাকে দাবিয়ে রাখি কিন্তু চোখের কোল ভিজে আসে। নার্সের সঙ্গে ওই রুমে যাই। প্রথমে আল্ট্রাসাউন্ড করা হয় । তারপর বারবার সেই ডাক্তার পরীক্ষা করছিলেন বুকের ডান পাশ এবং বাম পাশে। বাম পাশে সমস্যা ছিলো। উনি আমাকে বলছেন হাত দিয়ে তোমার আন্ডার আর্মের নিচে কোন লাম্প পাচ্ছিনা তবে সেডের মত আসছে আর বুকের উপর যে লাম্পটা  আছে সেটা চার সেন্টিমিটার মতো। আমি এটার সেম্পল নিচ্ছি বায়োপসির জন্য। নিলেন এবং রিপোর্ট লিখে আমার হাতে দিয়ে বললেন, তুমি দোতলায় যাও কনসালটেন্টের হাতে এই রিপোর্ট গুলো দাও তোমাকে আরো কিছু স্টেপ পার হতে হবে।

আমি তখন বুঝে গেছি আমার আশঙ্কাই সত্যি। যে একটু ক্ষীণ আশা ছিলো যে হয়তোবা এটা খারাপ না হয়ে ভিনাইল হবে । সেটা উবে গেল মুহূর্তে ।আমি রিসিপশনে এসে কোনরকম সুহেব ভাইকে বললাম দোতলায় যেতে হবে কনসালটেন্ট দেখবেন। ছেলে আমার মুখ দেখে এসে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার কিচ্ছু হবেনা। আমরা লিফটে দোতলায় গিয়ে রিসিপশনে কাগজ গুলো দিয়ে বসি। আমি আর পারছিলাম না। আমার সব মনোবল ,সব আশা ভেঙে পড়ছিলো। শুধু ভাব ছিলাম বাঁচার জন্য কিছু সময় কি পাবো কি? আমার ছেলেটা যে এখন ও ছোট । মাত্র পনেরো বছর। তার সামনে জিসিএসি পরীক্ষা , কত স্বপ্ন। মেয়েটা মাত্র চব্বিশ বছর বয়স। তার ক্যারিয়ারের ধাপ গুলো সে খুব সাফল্যের সঙ্গে পেরুচ্ছে। মা ছাড়া আমার দুটো বাচ্চার তো কেউ নেই। ওরা এই বয়সে জীবনের অনেক কঠিন বাস্তবতা আপনজনের স্বার্থপরতা, দেখেছে। শুধু মায়ের জন্য সব ভুলে থাকতে পেরেছে কিন্তু আমার কিছু হলে ওরা কিভাবে সামলাবে। আমি মরবো না বাঁচবো এই চিন্তা একবার ও আসেনি আমার নিজের জন্য।

যাই হউক নির্বানকে রিশিপশনে রেখে আমি আর সুহেব ভাই কনসালটেন্ট এর রুমে যাই। দুজন ক্যানসার স্পেশালিস্ট নার্স আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। এই পর্ব ছিল একজন রোগীকে তার দুঃসংবাদ দেয়ার আগে তাকে শান্ত রাখার প্রয়াস। আমাকে নার্সরা বলছিলেন আমরা এই চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুব সাকসেসফুল ইত্যাদি। আমি কাঁদছিলাম আর সারা শরীর জুড়ে কাঁপুনি দিচ্ছিলো। সুহেব ভাই পরম মমতায় আমার হাত খানি ধরে সান্তনা দিচ্ছিলেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে নার্সদের বলছিলাম আমার ছেলেটা মাত্র পনেরো বছর বয়স আমি কি আর চারটা বছর বাঁচতে পারবো। ওরা বলছে তুমি পৃথিবীর কয়েকজন বিখ্যাত ব্রেষ্ট ক্যানসার কনসালটেন্ট এর এক জন হলেন আন্থনী পীল তার আন্ডারে এসেছ। সে এদেশের একজন টপ স্পেশালিস্ট এ বিষয়ে, চিন্তা করো না।

যথা সময়ে আন্থনী পীল আসলেন ।বয়স্ক লম্বা খুবই নরম মনের একজন মানুষ।এসে খুব সুন্দর করে আমাকে হাত ধরে প্রথমে বসালেন তারপর পরিচয় পর্বের শেষে সব জিজ্ঞেস করে করে চেকআপ এ ডাকলেন।আমার লাম্প দেখলেন , আন্ডারআর্ম পরীক্ষা করলেন, কলার বোন এবং স্পাইন আরো কিছু পয়েন্ট চেক করে নিলেন। আমি তখন তাকে কাঁদতে কাঁদতে বলছি, মিস্টার পীল আমার ছেলেটা মাত্র পনেরো বছর বয়স , আমি শুদু আর চারটা বছর বাঁচতে চাই। তা কি পারবো। উনি আমাকে উনার কাছে চেয়ারে বসিয়ে বললেন, আমরা সন্দেহ করছি তোমার ব্রেষ্ট ক্যানসার তবে বায়োপসির রেজাল্টের আগে আমরা একশত ভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারবোনা এবং দুশ্চিন্তা করোনা এটা নিরাময় যোগ্য। অবশ্যই তুমি বাঁচবে । চার বছর কেন আরো বেশি ।আরো বলেন আমাকে একজন ব্রেষ্ট স্পেশালিস্ট নার্স এবং কাউন্সিলার একটা রুমে নিয়ে যাবেন ওখানে যেন আমি কিছু সময় কথা বলি। কিছু জানতে চাইলে ওদের কাছ থেকে জেনে নেই।

উনাকে ধন্যবাদ দিয়ে , আমি আর সুহেব ভাই নার্সের সঙ্গে যাওয়ার জন্য রিশিপশন থেকে নির্বানকে নেই । ছেলে জিজ্ঞাস করে কি বললো?আমি কেঁদে বললাম ওরা যা বলেছে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে চিন্তা করো কেন ওরা তো বলেছে যে এটা ট্রিটেবল। আমরা কাউন্সিলিং রুমে বসে কথা বলি। তারপর বাসায় রওয়ানা দেই। আসতে আসতে পথেই মেয়ে ফোন দেয় নিউক্যাসেল থেকে । সব বললাম মেয়েকে , মনে হলো ফোনের ওপর প্রান্তে পিন পতন নীরবতা। বুঝতে পারছিলাম মেয়েটা আমার কান্না টাকে ঢোক গিলে ভেতরে পাঠাচ্ছে। আমি একটু টাইম দিলাম তাকে। তারপর বললাম কনসালটেন্ট যা বলেছে। আরো বললাম অগাস্টের একুশ তারিখে বায়োপসির রেজাল্ট দিবে।……..চলবে