লাইফ উইথ ক্যান্সার-৬

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুখসানা আক্তার

জীবনের রং ,রূপ ,রস এবং গন্ধ একেক জনের কাছে একেক রকম। সময়ে সময়ে এর অনুভূতি এবং আবেদন ও পরিবর্তন হয়। বিশেষ করে আমাদের পরিবার এবং সমাজে বেশিরভাগ মানুষের জীবন অনেকটা যুদ্ধ ক্ষেত্রের মত। প্রতিনিয়ত লড়ছেন খাদ্য, কর্ম ,বাসস্থান , শিক্ষা , চিকিৎসা ,সামাজিক প্রথা যেমন কন্যদায় গ্রস্থ পিতা। একজন দরিদ্র পিতার জন্য কন্যা একটা দায় হয়ে যায় । এভাবে ই কোন না কোন কিছুর জন্য প্রতিনিয়ত লড়ে যেতে হয়। যেহেতু রাষ্ট্রের কোন নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণের কোন পরিপূর্ণ ব্যবস্তা নেই । যা আছে তা ও ঠিকঠাক নেই। যাই হউক আমি নিজেকে একজন সৌভাগ্য বান মানুষ মনে করি যে অন্তত কষ্ট করে হলেও একটা উন্নত বিশ্বের একটা দেশে বাস করছি। যেখানে বিপদে পড়লে বা চাকরি চলে গেলে অথবা অসুখে পড়লে রাষ্ট্র পুরো দায়িত্ব নিয়ে নেয়।

ছেলের সঙ্গে লেখক

আমার ব্রেষ্ট ক্যান্সার ডায়াগনোসিস হওয়ার পর অঙ্কলজিস্ট আমাকে আমার পুরো চিকিৎসার ডিজাইন বাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন সেদিন যেদিন অফিসিয়ালি জানানো হয় যে আমার ক্যানসার। আরো জানান হয় যে ,সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই আমার ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে যাবে মানে কেমোথেরাপি শুরু হবে তবে তার আগে আমার অনেকগুলো এক্সরে এবং টেষ্ট হবে কারণ ক্যান্সার টা কোন স্টেইজে আছে জানার জন্য এবং এই টেষ্ট আর স্ক্যানগুলো শুরু হয়ে গিয়েছিলো এই দিন থেকেই মানে ২০১৮এর আগস্টের একুশ তারিখ থেকে।
প্রথম হয় CT Chest/Andulon Pelvis + Contrast
তারপর আগস্টের একত্রিশ তারিখে হয় পর পর MRI Breasts , CT Scan এবং NM Bone Whole Body.
এই সময়টা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন একটা সময় ছিলো। কারণ তখন আমি জানি না আমার অসুখটা কতটুকু শরীরে ছড়িয়েছে । জানি না আর কতটুকু সময় আমি হাতে পাবো। আমার নিজের মৃত্যু চিন্তার চাইতে ও একজন মায়ের উদ্বেগ দুশ্চিন্তা বেশি ছিলো যে , বাচ্চাদের জীবনের একটা অপরিপূর্ণ অবস্থায় রেখে যাবো। ছেলেটার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না কারণ মাত্র পনেরো বছর বয়স।

এরই মধ্যে জীবনের অনেক কঠিন সময় পার করেছে সে।মাকেই তার জীবনের প্রধান অবলম্বন করে জীবনের পথে পা ফেলছে ।এখন এই মায়ের কিছু হলে সে কিভাবে নিজেকে সামলাবে ভাবতে ভাবতে আমি ভেঙে পড়ছিলাম বার বার। আবার মেয়ে তার জীবনের একটা ধাপ শুরু করেছে এরমধ্যে আবার যদি মা বিহীন এতবড় দায়িত্ব নিতে হয় তবে তার বাকি জীবন কতদূর আগাবে? অনেকে বলে আরে চলবে ,এত চিন্তার কি আছে তুমি বেশি চিন্তা করো। তাদের বলি আমার জুতোটা পায়ে দিয়ে তারপর আমার জায়গায় থেকে আমার অতীত বর্তমান জীবন যাপন করে তারপর বলেন। একটা আলাদা অবস্থান থেকে উপদেশ দেয়া আনন্দের কিন্তু যার ক্ষত সে বুঝে এর যন্ত্রনা।

প্রতিটি স্ক্যান বা টেষ্টের জন্য হাসপাতালে একা যাওয়ার মতো মনোবল বা সাহস ছিলো না। সুহেব ভাইয়ের এই অবদান কখনো ভুলবনা। উনি পাশে না দাঁড়ালে ,সাহস না যোগালে আজ এত মনোবল আর সাহস নিয়ে এই জায়গায় দাঁড়াতে পারতাম না। প্রতিটি টেষ্টের সময় আমি কাঁদতাম ভয়ে কি জানি টেস্টে আসে ।পুরো শরীর কাঁপতো ,চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়াতো। সুহেব ভাই আমাকে ছোট একটা মেয়ের মতো হাত ধরে এই অবস্থায় সান্তনা দিতে দিতে এক ডিপার্টমেন্ট থেকে অন্য ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যেতেন। একেকটা স্ক্যান বা টেষ্টে প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টা লেগে যেতে। এর মধ্যে সুয়েব ভাই কফি এবং হালকা খাবার এনে খাওয়াতেন। আমি দুশ্চিন্তায় খেতে পারতাম না। কাঁদতাম। সুয়েব ভাই পরম স্নেহ মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝাতেন যে শক্ত হতে হবে তাই খেতে হবে আগে। মাঝে মাঝে জোক শুনিয়ে হাসাতে চেষ্টা করতেন।
আমার লাস্ট স্ক্যান ছিল বনমেরুর ।এই স্ক্যানটার সময় প্রচন্ড দুশ্চিন্তায় ভুগছিলাম । কারণ জানতাম ক্যানসার যদি বোনমেরু পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে তবে কঠিন হবে চিকিৎসা। তাই যখন স্ক্যানের মেশিনে আমাকে শুইয়ে দিয়ে নার্স বললো ,তোমাকে বিশ মিনিট রাখা হবে তবে যদি ডাক্তাররা আরেকটু দেখতে চায় তবে আরো পাঁচ মিনিট অতিরিক্ত রাখা হবে। আমি তখন বুঝে গিয়েছিলাম যে , যদি বোনমেরু এফেক্টেট হয়ে থাকে তবে ওরা আরো পাঁচ মিনিট রাখবে দেখার জন্য যে এফেক্টেডের লেবেল টা কতদূর গিয়েছে। আমি মনে প্রচন্ড ভয় আর দুশ্চিন্তা নিয়ে সূরা ফাতেহা মনে মনে পড়ে যাচ্ছি মনকে শান্ত করার জন্য। বিশ মিনিট তো আর পার হয় না। সে যেন এক যুগ। এক সময় নার্স এসে বললো তুমি বাড়ি যেতে পারো। ডাক্তার বলেছে আর অতিরিক্ত পাঁচ মিনিট তোমাকে স্ক্যানে রাখার দরকার নাই। বুক থেকে বিশাল এক পাথর নেমে গেল আমার। এই প্রথম আমি একটু খুশি হয়ে হেসে নার্সকে ধন্যবাদ দিয়ে রেডি হয়ে বাহিরে এসে সুয়েব ভাইকে বললাম। আমার সেজ ভাই যিনি চায়নাতে ডক্টরেট করছেন । পেশায় ডাক্তার। জানতেন আজ বোনমেরুর স্ক্যান আছে। উনি ফোন করে আমার কাছ থেকে ডিটেলস জেনে বললেন , আলহামদুলিল্লাহ, তোর বোন মেরু সেইফ আছে। আমার যে সাহস আর মনোবল পালিয়ে গিয়েছিল ওরা একটু একটু করে আবার ফিরে আসতে লাগলো। (চলবে)

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]