লাইফ উইথ ক্যান্সার-৭

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুখসানা আক্তার

গত বছর অগাস্ট মাসে আমার শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে । ট্রিটমেন্ট শুরু হয় সেপ্টেম্বরের চার তারিখ থেকে । সেই সঙ্গে শুরু হয় স্টেরয়েড খাওয়া। কেমোথেরাপির আগের দিন থেকে স্টেরয়েড খেতে হতো।এইভাবে প্রথম ছয়টা কেমোথেরাপি নিতে প্রত্যেকটিতেই আমাকে চারটা করে স্টেরয়েড খাওয়ানো হয়েছে এবং শেষের দু’টো কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় আমাকে প্রতিটিতে চব্বিশটি করে স্টেরয়েড খেতে হয়েছে । অর্থাৎ সপ্তম এবং অষ্টম কেমো দু’টোতে মোট আটচল্লিশটি স্টেরয়েড খেতে হয়েছে। আমি শখ করে খাইনি। ডাক্তার খেতে দিয়েছে। কারণ স্টেরয়েড না খেলে কেমোথেরাপির ভয়াবহ যে প্রতিক্রিয়া সেটার এফেক্ট সহ্য করতে না পেরে আমি মারা যেতাম তখনই। আর স্টেরয়েড খেলে ওজন বেড়ে যায়। কেমোথেরাপির এক মাস পর আমার সার্জারি হয় ।তার ছয় সপ্তাহ পর আমার ১৮ টি রেডিওথেরাপি নিতে হয়। যা গত জুন মাসের চার তারিখ শেষ হয়ে। কেমোথেরাপির পর এখন পর্যন্ত প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর আমাকে হারসেপ্টিন নামক একটা ইনজেকশন দেয়া হয় যা আগামী সেপ্টেম্বর মাসে শেষ হবে। এই যে কেমোথেরাপি , সার্জারি, রেডিও থেরাপি , হারসেপ্টিন প্রত্যেকটির সাইড এফেক্ট হিসাবে অনেক অনেক শারীরিক যন্ত্রনা আছে । যেমন হাড়ে , মাসলে প্রচন্ড ব্যথা , মাথা ঘুরানো , ঘুম কম হয় , প্রচন্ড ক্লান্ত বোধ করা। স্টেরয়েড যেমন কেমোথেরাপির সাইড এফেক্ট কমিয়ে আনে তেমনি শরীরের ওজন আগের চেয়ে বাড়িয়ে দেয়। আগে মানুষ জন আমার নেড়া মাথা এবং প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া আই ভ্রু নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করতো । এখন আমি মানুষের দু’টো প্রশ্নের বা কথার সম্মুখীন হই। কারণ , আমাদের বেশির ভাগ মানুষের অজ্ঞতা , হীনমন্যতা এবং কৌতূহল থেকে।
প্রথমত, আমার ট্রিটমেন্টের কারণে ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিনা অথবা মেনোপজ শুরু হয়ে গেছে কি না??
দ্বিতীয়ত, তোমার ওজন বেড়ে গেছে বা কেন বেড়েছে?
আমাদের সমাজে নারীদের নিয়ে অনেক ট্যাবু আছে। এই যেমন , গায়ের রং, উচ্চতা , চুল , নখ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের সমাজে শুধু পুরুষরাইই না নারীরা ও করেন এই সব বিষয় নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ এবং গসিপ। বরং নারীরা বেশি করেন, হীনমন্যতা একটু বেশি বলে।
আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষই মনে করেন মেনোপজ মানেই একজন নারী শেষ কারণ ধারণা করা হয় সেই মেনোপজ হয়ে যাওয়ার কারণে নারী যৌন জীবনে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। একজন পঁচিশ বছরের নারী ও যৌন জীবনে অনীহা বোধ করতে পারেন যদি তার সঙ্গী বা স্বামীর প্রতি চরম বিতৃষ্ণা বোধ করেন। মন থেকে বিরক্তি বোধ করলে বা আকর্ষণ বোধ না করলে মস্তিস্ক এবং শরীর সেই কাজে সাড়া দিবে না। আবার মেনোপজ হয়ে যাওয়া একজন নারী যদি সঙ্গীর প্রতি ভালবাসা এবং আকর্ষণ অনুভব করেন তবে তিনিও মন থেকে সঙ্গীকে নিবিড় ভাবে চাওয়ার আগ্রহ অনুভব করতে পারেন। মন উষ্ণতা চাইলে মস্তিস্ক এবং শরীর দু’টোই সক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু আমরা আমাদের অজ্ঞতা থেকে বের হতে চাই না। কারণ আমরা পুরাতন ধ্যান ধারণা বা জানাটা আঁকড়ে ধরে রাখতে পছন্দ করি। একটু জানার পরিধি বাড়াতে হলে বা ট্যাবু ভাঙতে হলে যে দু’পাতা বইয়ের পড়তে হবে অথবা দু’কদম হাঁটতে হবে সেই সময় বা স্থিরতা বা আগ্রহ কি আছে?? তাই কান কথার উপর আস্থা বেশি ।ব্রেষ্ট ক্যানসারে কৃত্রিম উপায়ে ঋতুচক্র বন্ধ করে দেয়া হয় তা না হলে এই ক্যানসার দ্রুত আবার ফেরত আসার পার্সেন্টিস বেশী। এখন এই আমি ‘মানুষ’ হিসাবে বাঁচাটা জরুরি নাকি ঋতুবতী থাকা জরুরী??
ওজন প্রসঙ্গ: আমাকে আমার অঙ্কলজিস্ট প্রতিটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের আগে ওজন পরীক্ষা করেছে। রেডিওথেরাপি পর্যন্ত আমি ওজন নিয়ে কথা বললে বলেছে এখন এটা নিয়ে কিছু করার সময় আসেনি। কারন তাড়াহুড়া করে ওজন কমাতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। রেডিওথেরাপি শেষ হয়েছে আজ ছয় সপ্তাহ হলো। আরও ছয় সপ্তাহ এর সাইড এফেক্ট থাকবে। ইতিমধ্যে কনসালটেন্ট আমাকে ফিজিও , ইয়োগা এবং ডায়েটেশিয়ানের কাছে রেফার করেছে। কারণ ট্রিটমেন্ট প্রায় শেষের পথে। এখন শুরু করবে ক্যানসার প্রিভেনশন এবং শরীর পুনর্গঠনের সেশন। আমাকে কঠোর ভাবে সেগুলো ফলোআপ করে যেতে হবে। আর ওজন কমানো টা ও সুস্থ থাকার অংশ হিসাবে জরুরি এই কারণে না তা না হলে ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ওজন বাড়াতে থাকলে ক্যানসার পুনরায় তাড়াতাড়ি ফেরার সম্ভাবনা থাকে । তাই বেঁচে থাকতে হলে ডাক্তারের সব পরার্মশ কঠিনভাবে মেনে চলতে হবে।
আমার মনে জোর একটু বেশি এবং কোন কিছুর সিদ্ধান্ত নিলে সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করি। আমি সচেতন আমার স্বাস্থ্য নিয়ে। আমি জানি কখন , কোন সময় কি শুরু করতে হবে। আমাদের সমাজে যে কোন রোগে মানুষের বিজ্ঞের মত উপদেশ ,নিষেধ এবং পরামর্শ দেয়া দেখলে মনে হয় এক একজন পারেনা নিজেকেই ডাক্তার হিসাবে উপস্থাপন করে। আমি আমার ক্যানসার হওয়ার পর গুগুলে গিয়ে এই ব্যাপারে কিছু জানার চেষ্টা করিনি। খুব মনোযোগ দিয়ে স্পেশালিস্ট দের কথা শুনেছি , প্রশ্ন করে জেনে নিয়েছি, আলোচনা করেছি , উপদেশ নিষেধ শতভাগ পালন করছি । কারণ উনারা এই ক্ষেত্রে পড়াশুনা, গবেষণা এবং প্র্যাকটিস করেই একেক জন তাদের সেক্টরের সর্বোচ্চ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং আমি তাদের চিকিৎসায় আছি। গায়ের ওজন সময় আসলে আমি কমাবো। আমি পারি। এটা এমন কঠিন কোন বিষয় না । যাদের ক্যানসার হয়নি তাদের নিজেদের ভাগ্যবান মনে করা উচিত কারণ যে ট্রিটমেন্ট- এটা সহ্য করতে বুকের পাটা দরকার। আমি হাসি খুশি থাকি , বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করি , বাচ্চাদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটাই। সবকিছু পজেটিভ মনোভাব নিয়ে এগুতে চেষ্টা করি।

বেঁচে থাকাটাই মনে হয় এখন গড গিফ্টেড। আমি যখন হসপিটাল থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়ে ঘরে ফিরি তখন ছেলে জড়িয়ে ধরে বলে , হাই আম্মু , আর ইউ অলরাইট, ইজ এভরিথিং ওকে ।তারপর আলতো করে আমার লম্বু ছেলে আমার মাথায় চুমু দেয়। আমি তখন মনে মনে বলি , হে পরমকরুনাময় শুকরিয়া, সার্থক আমার এই বেঁচে থাকা। আমার মেয়ে প্রতিদিন ফোন করে খোঁজ নেয়। প্রতি তিন সপ্তাহ অন্তর এসে দেখে যায়। কাজ থেকে ফিরে সাড়ে তিন ঘন্টা জার্নি করে আমার সঙ্গে দু’রাত কাটিয়ে আবার চলে যায়। কিন্তু যতক্ষন থাকে আমাকে রান্না করে , খাইয়ে ঘর দোর গুছিয়ে দিয়ে যায়। আমি ওদের খুব মসৃন জীবন দিতে পারিনি কিন্তু এই যে আমার সরব উপস্থিতিটা পাচ্ছে এত কিছুর পর তাতেই ওরা অনেক সুখী যে মা তাদের কাছে আছে। তাইতো জীবন গতিময়, গীতিময় । প্রার্থনা করি আমাদের সমাজে আমরা যেন শিষ্টাচার শিখি আর একে অপরকে সম্মান করতে শিখি।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক ও গুগল থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]