লাইফ উইথ ক্যান্সার

রুখসানা আক্তার

(লণ্ডন থেকে): ডাক্তারের চেম্বারে ফোন করে বিকেল চারটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম। কাজের জায়গায় ফোন করে বললাম তিনটার পর আর কাজ করতে পারবোনা কারণ ডাক্তার দেখাতে হবে। ছেলেকে নাস্তা দিয়ে , স্নান  সেরে কাজে গেলাম। কিন্তু মনটা একটু অস্থির টের পাচ্ছিলাম।আমি যে চ্যারিটি অর্গানাইজেশন এর সঙ্গে কাজ করি ,সেখানে একটা স্কিম আছে যেটাতে সব ধরণের ক্যানসার পেশেন্টদের জন্য সব ধরণের যেমন ,মানসিক ,শারীরিক ,অর্থনৈতিক সহ সব ধরণের সহযোগিতার ব্যবস্তা করা হয়। আমি সেই স্কীমে ও কাজ করি। অনেকটা কাউন্সিলিং এর মত। ক্যানসার পেশেন্টদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের যে সমস্যাগুলো হয় বিশেষ করে শারীরিক এবং মানসিক সেটার অভিজ্ঞতার কারণেই একটু দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিলো। আসলে মানুষকে উপদেশ দেয়া সহজ কিন্তু নিজের উপর পড়লে তখন বুঝা যায় উপদেশ দান আর ভুক্তভুগির মধ্যে পার্থক্য কি? আমি আমার বিষয়ে বলতে গিয়ে অনেক বিষয়েরই অবতারণা করছি কিন্তু সেগুলো যদি না লিখি তাহলে অনেক কিছু পরিষ্কার ভাবে ব্যাখ্যা দেয়া বা বুঝানো একটু কঠিন । আবার এই বিষয় গুলো থেকে অনেক বিষয় সম্পর্কে একটু আধটু ধারণাও পাওয়া যাবে বলে আমি এসব লেখায় নিয়ে আসছি।

যাই হউক এর মধ্যে লাঞ্চ টাইমে মেয়েকে ফোন দিয়ে বললাম ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি। মেয়ে বললো জানিও কি বললো। চারটা বাজার টিক পনেরো মিনিট আগে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকি। ঠিক চারটা দশে ডাক্তারের রুমে ডাক পরে আমার। ডাক্তার পূজাকানা । দেখতে একদম পঁচিশ চব্বিশ বছরের একটা হালকা পাতলা ছোটখাট গড়নের একটা মেয়ে ।তার প্রফেশনে সে পুরোই একজন ডেডিকেইটেড এবং প্রফেশনাল ব্যক্তি। সে আমাকে চেকআপ এর টেবিলে নিয়ে চেক করে বললো প্রায় সাড়ে তিন সেন্টিমিটার একটা লাম্প মনে হচ্ছে। তোমাকে আমি ইমারজেন্সি রেফারেল দিচ্ছি হসপিটালে কারণ এটা একটু বড় মনে হচ্ছে। তবে ডায়োগনাইসড হওয়ার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। সে একটা কাগজ দিয়ে বললো রিসিপশনে গিয়ে দেখাও ওরা সব সিস্টেমে আপডেট করে নিবে আর যদি হসপিটাল থেকে পনেরো দিনের মধ্যে তোমাকে না ডাকে তাহলে আবার আমার কাছে এসো আমি আবার হসপিটালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর ব্যবস্থা করবো। আমি ডাক্তারের রুম থেকে বেরিয়ে রিসিপশনে গিয়ে কাগজটা দেই ওরা সিস্টেমে সব আপডেট দিয়ে বললো এসব ক্ষেত্রে হসপিটাল সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই ডাকে পরীক্ষা করার জন্য। তারপরও যদি না ডাকে তা হলে আমি যেন তাদের জানাই। আমি দ্বিগুন ভয় আর দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরি।সেদিন ছিলো থার্ড সেপ্টেম্বর শুক্রবার। পাঁচ তারিখ সোমবার ঠিক সাড়ে দশটায় Bartholomew’s হসপিটালের ক্যানসার ইউনিট থেকে ফোন। তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নয় তারিখ বৃহস্পতিবার সকাল দশটা দশে । অ্যাপয়েন্টমেন্ট যাতে মিস না করি সতর্ক করা হলো।টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার পর লাঞ্চ টাইমে মেয়েকে ফোন দিলাম। জানালাম যে নয় (অগাস্ট) তারিখে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছি। বললো ভয় পেওনা আম্মু ,দেখো কিছুই হবেনা। এটা নিশ্চয়ই নরমাল লাম্প। মনে প্রাণে আমিও চাইছিলাম যেন এটা একটা নরমাল লাম্প ই হয় ।কিন্তু মনের ভেতর কোথায় জানি একটা অজানা ভয় আশঙ্কা খুঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে যাচ্ছে আমাকে । মুখে মেয়েকে কিছু বললাম না। বেচারি শুধু দু’দিন আগে বেশ দূরে আরেকটা শহরে গিয়েছে নতুন জব নিয়ে। পরে কথা হবে বলে ফোন রাখলাম। তারপর মনের ভয় থেকেই খুব কাছের কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করলাম এবং জানালাম। সবাই অভয় দিল কিছু হবে না। শুধু শুধু টেনশন না করতে। কিন্তু আমাকে মনের বাঘ খেয়ে ফেলছিলো। হঠাৎ করেই আমার খাওয়ার রুচি চলে গেলো । আমি সারাদিনে কোন রকম তিন চারটা রিচটি বিস্কিট চা দিয়ে গিলি। দুশ্চিন্তায় অন্য কোন খাবারে মুখে দিতে পারছিলাম না। গত চার পাঁচ বছরে যেখানে একদিন ও জিম বাদ দেয়নি সেখানে জিমে যাওয়ার শক্তি যেন কোথায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। ছেলের জন্য কোনরকম খাবার তৈরি করা ,কাজে যাওয়া ,বাজার আর ঘরের কাজ নিজেকে যেনতেন প্রকারে ফোর্স করে সেরে নিচ্ছিলাম। আমার চারিদিকে কেমন একটা বিবর্ণ আবরণ তৈরি হচ্ছিলো। আসলে আমার মস্তিষ্কে , চিন্তা চেতনায় ভয় নামক এক আঁধার আস্তে আস্তে গ্রাস করছিলো। কারণ আমার জীবনটা খুবই ঝড় ঝঞ্ঝায় পূর্ণ ছিল প্রায় বিগত দুই যুগ। এমন ছিলো যে টর্নেডোর ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে ঘুরতে ঘুরতে দিশাহারা হয়ে যেতাম কিন্তু ক্লান্ত হতাম না বরং এর মধ্যেই পায়ের নিচে একটু মাটি খোঁজার চেষ্টা করতাম। একসময় পায়ের নিচে জমিন খুঁজে পেতাম। তারপর আস্তে আস্তে আবার আশায় বুক বেঁধে সেই জমিনে চাষবাস শুরু করতাম। ফসল তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে আবার কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হযে যেতো আর আমি সেই ঝড়ের মধ্যেই হাতের কাছে যে কোন একটা খুঁটি চেপে ধরে আমার নড়বড়ে ঘর খানি বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। এভাবেই এক সময় আমি আমার জীবনের বন্ধুর পথটা প্রায় অতিক্রম করে ফেলছিলাম কিন্তু এই ঘটনায় আবার আমাকে যেন সেই আগের যুদ্ধের জায়গায়টায় নিয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছিলো। আমি কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছিলাম না যে, যদি আমার খারাপ কিছু হয় তাহলে আমার বাচ্চাদের আমি কিভাবে সামলাবো।
যাই হউক বড় আপা আমেরিকা থেকে ফোন করলে উনাকে জানাই। আমার সেজভাই উনি ডাক্তার বর্তমানে সাংহাই উনিভার্সিটিতে ডক্টরেট করছেন উনাকে জানাই। বড় ভাবী গাইনকলজিস্ট উনার সঙ্গেও কথা বলি ।সবাই একই কথা বললেন যে এখনই এত দুশচিন্তা না করতে। আগে টেষ্ট হউক রেজাল্ট কি হয় দেখা যাক।

ছবি: সজল