লিখে যাও ভজু’দা…

রাহুল পন্ডা

রাহুল পন্ডা

পাড়ার ভজুদা সেদিন ডেকে বললে, ‘বুঝলি বাবাই একখান উপন্যাস ফাঁদছি, তোর হেল্প চাই।’ শুনেই সটকে যাবার তালে ছিলুম, ভজুদা পাকড়ে বসালো। শালার বাংলা পড়ে যত কুফল ফলেছে তার মধ্যে এইটা ট্র্যাজিক। লোকে ধরেই নেয় বাংলার ছাত্র মানেই বিপুল সাহিত্যজ্ঞান, রবীন্দ্রনাথ থেকে রাদারফোর্ড সবই জানে। সুতরাং ব্যাটাকে দড়ি বেঁধে কবিতা শোনাও। এদিকে লোককে বলা যায় না বিএ, এমএ ফুল চোতা গাঁতিয়ে কেটে গেছে আমার। নামে পাঁচতারা হলেও যাদবপুরে চোতা কালচার হাসপাতালে দালাল চক্রের মতোই সক্রিয়। সেসব চোতা পুরুষানুক্রমে বিতরিত হয়, লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে জেরক্স করে। সেম এলেই আর্টস বিল্ডিং-এর তলায় ভূতনাথদার জিনা হারাম হয়ে যায় জেরক্সের ঠেলায়। দু দুটো জেরক্স মেসিন সারাক্ষণ হাঁই হাইঁ করে চালিয়েও কুলিয়ে ওঠা যায় না। চোতা, চিৎকার, রমণী, এ ফোর ইত্যাদির জাঁতাকলে গলদঘর্ম ভূতনাথদা কি করে সব সামাল দেয় খোদায় মালুম। ভারতচন্দ্র বোধহয় এই জেরক্স দোকান দেখেই লিখেছিলেন, ‘ভূতনাথ ভূথসাথ দক্ষযজ্ঞ নাশিছে/ বভম্বম বভম্বম সিঙ্গা ঘোর বাজিছে’। তবে গুচ্ছ জেরক্স করলেই কী আর পড়া হয়? পরীক্ষার আগে হয়তো দু-চার পাতা উলটে-পালটে দেখা, বাকি সব থরে থরে জমা হতে থাকে খাটের তলায়। পাঁচ বছর বাদে লোকজন যখন বাক্স প্যাঁটরা গুটিয়ে বাড়ি ফেরে, সঙ্গে চলে দুজন কুলি, তাদের মাথায় খান চারেক ইয়া সাইজের কার্ডবোর্ডের বাক্স। বাড়ি ফিরলে বাপ শুধোয়, ‘বিগত পাঁচ বছরে কী করলে খোকা? কেমন হল উন্নয়নের হালচাল?’ খোকা উত্তর দেয় না, চুপ থাকে। বেচারি, কী করে বলে যে চরিত্র আর চোতা সামলাতেই বছরগুলো কেটে গেছে তার।

তা যা বলছিলাম, লোকে ধরেই নেয় বাংলা পড়েছি মানেই সাহিত্যে বৃহস্পতি আমি। পাড়ার কালীপূজায় অনুষ্ঠান সঞ্চালনার ভার আমার ঘাড়ে ন্যাস্ত হয়, এই ভরসায় যে, আমি কুহু কুহু করব। আমার ভেতরের কাব্যকোকিল জেগে উঠবে, স্বরের তাড়নায় নেমে আসবে অকাল বসন্ত, দীপক গেয়ে জ্বালিয়ে দেব আগুন, দেখেশুনে স্থির থাকতে না পেরে মৃন্ময়ী মাও চিন্ময়ী হয়ে দেখা দেবেন। অনুষ্ঠানের মাঝে প্রায়ই স্টেজ সাজাতে সময় লাগে, বিশেষত মেয়েদের নাচ-ফাচের এখন হাজার বায়নাক্কা, সব সামলে স্টেজ রেডি করতে দেরি হয়। তখন এমন প্রস্তাব একাধিকবার পেয়েছি, ‘বাবাই, এই সময়টা ফাঁক যাচ্ছে। দু-চারটে কবিতা বলে ম্যানেজ কর না। তোরা বাংলার ছেলেপুলে, কত্ত কবিতা জানিস।’ এখন মুখের উপর কী করে বলি যে, বাংলা পড়া আর কবিতা মুখস্ত, এই দুটো এক নয়। মুখস্তটা একটা স্কিলের ব্যাপার, সবার সাধ্যে কুলোয় না। আমার তো একদমই কুলোয় না। বলতে কী ছোটবেলায় শেখা একখানা মাত্র ছড়া, ‘আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ/ বিয়ের পরে ছাল ছিঁড়ে নেয়, হাড়জ্বালানী বৌ’, এইটা ছাড়া কোনকিছুই মনে নেই আমার। ফলে মাইক হাতে আমি দাঁড়িয়েই থাকি, স্টেজ সাজানো চলতে থাকে নিজের তালে।inside-chobi

কিন্তু লোককে বললে তো বিশ্বাস করবে না। ঘাড় ধরে ঠিক সাহিত্য শোনাতে বসিয়ে দেবে। ভজুদা যেমন দিল। টেনে নিয়ে গেল বেড রুমে, দরজার ছিটকিনি এঁটে জানলাটা ভিজিয়ে দিল। অপাঙ্গে দেখে নিলাম একবার, শালা বেডরুমে টেনে আনল, খারাপ অভিসন্ধি নেই তো? ওই দেড়মণি ওয়েট নিয়ে হামলে পড়লেই তো গেছি। যতই হোক দেখতে শুনতে খারাপ নই, এককালে একটি মেয়ে আমায় নরসুন্দর বলেছিল। ভজুদা অবশ্য ছ্যাবলামির ধারপাশ দিয়ে গেল না। খাটের উপর পাজামা, বালিশ, ডায়াপার, বৌয়ের শায়া ডাঁই করা ছিল, সেগুলো ঝটিতি সরিয়ে একখানা দেড় লাখি ম্যাকবুক সেট করে দিল চোখের সামনে। পাশে এনে রাখল সল্টেড কাজু। সুইচ টিপতেই পিছন বাগে আধখাওয়া আপেল জ্বলে উঠল প্রেমিকার শরীরের মতো, আর স্ক্রিনে ফুটে উঠল আগামীর উপন্যাস। আমি সবে লোলায়িত চিত্তে কাজুর দিকে হাত বাড়াচ্ছিলাম, উপন্যাসের নাম দেখে থমকে গেলাম। লেখা রয়েছে ‘কষায়িত শির নগ্ন পালক’ !

খেয়েছে! পেগলে গেল নাকি, এতো নাম নয়, কাপালিক বামাচার! চোখ তুলে দেখি ভজুদা ভুরু-টুরু তুলে চেয়ে রয়েছে। চোখ জুড়ে প্রত্যাশা আর উদ্বেগ মাখামাখি। গলার হাড়টা উঁচু, একেই বোধহয় উৎকণ্ঠা বলে।

আমি ঝাপটে বললাম, ‘করেছ কী ভজুদা, এরম নাম দেয় কেউ?’

ভজুদার এক্সপেক্টেশন হাই ছিল, তোপের মুখে দপ করে নিভে গেল। মিনমিন করে বলল, ‘নামটা পছন্দ হয়নি তোর? আজকালকার বইপত্রের তো এমনই নাম হয়।’

আমি ফের একহাত নিলুম, ‘এমন নাম হয়! কোথায় দেখেছ তুমি? একটা নাম দেবে তার অর্থ হবে না কিছু?’

ভজুদা একটু থেমে গেল। তারপর কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘দেখ নামটার মধ্যে খানিক কবিত্ব রাখতে চেয়েছিলাম। কবিতার বইগুলোর নাম তো এমনধারাই হয়। জয় গোস্বামীর একটা বই আছে আমার কাছে, সেটার নাম ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা?’ এখন ঝাউপাতা কী কখনো ঘুমোয় বল? আমাদের বাগানেই তো দুটো আছে, তারা সারাক্ষণ মাথা দুলিয়েই যাচ্ছে। তারপর ধর, তোর বউদি সেদিন শ্রীজাতর খান কয়েক বই কিনে আনল। অদ্ভুত নাম সেগুলোর ‘উড়ন্ত সব জোকার’, ‘কফির নামটি আইরিশ’, কী অর্থ হয় বল এদের…’

‘কী বললে, শ্রীজাত!’ আমি একমুঠো বাদামভাজা তুলে নিয়েছিলাম, শ্রীজাত শুনেই রেখে দিলাম। আমাদের অ্যাকাডেমিক জাহ্নবীতে সৃজিত এবং শ্রীজাত গোরক্ত বলে চিহ্নিত। ছবি ও কবি, দুজনেই সমান পরিত্যাজ্য। ফলে শ্রীজাতর নাম শুনেই ঘ্যাঁক করে উঠলাম, ‘শ্রীজাত মারাচ্ছ তুমি, শ্রীজাত! ওটা কবি? ওটা কবি হলে আমাদের ইস্ত্রিওয়ালা রামলখন কী দোষ করল? সেও তো দিব্যি ছন্দ মিলিয়ে গুনগুন করে। দাও ওকেও একখানা কবিশ্রী দাও। শ্রীজাত যার আইডল তার দেড় হাতের মধ্যে আসি না আমি। চললাম।’

thalia-chavezরাগের চোটে উঠেই যাচ্ছিলাম, ভজুদা কাঁচুমাচু মুখে আরও খানিক কাজু ঢেলে দিচ্ছে দেখে বসে পরলাম। মিনিট পনেরো বাদে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হল। রেকাব ভর্তি কাজু-নাড়ু-নারকেলের তক্তি সালটে, একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম। ধোঁয়া ওঠা কফির কাপও ততক্ষণে পৌঁছে গেছে। ঠোঁটের কাছে ফুঁ দিতে দিতে বললাম, ‘দেখ ভজুদা, যাই লেখ না কেন নাম মানানসই হওয়া উচিৎ। বিষয়ের সঙ্গে যাবে এমন। এই ধর না, রবীন্দ্রনাথ, পারফেক্ট নাম দিয়ে গেছেন সব। যেটা খুশি তুলে নাও, বিসর্জন বা রক্তকরবী, ওই নামটা ছাড়া ভাবাই যায় না। ভাব দেখি একবার ‘চোখের বালি’র নাম যদি হত ‘রগুড়ে বিনোদ’, বা ‘শেষের কবিতা’-র নাম হত ‘লবণহ্রদে অমিত নাচে’, মানাত? বটতলা ভেবে লোকে হ্যাট হ্যাট করে ভাগিয়ে দিত। সেখানে তুমি কী ভেবে এই নামখানা ঠুকে দিলে? তাছাড়া তুমি তো লিখছ উপন্যাস, তোমার এতো কবিত্ব করার কী আছে? সোজাসাপ্টা নাম দাও না।’

ভজুদা চুপ করে বসে রইল খানিক। তারপর ধীর গলায় বলল, ‘ঠিকই বলছিস বোধহয়। নামটা এতো কঠিন দিয়ে লাভ নেই। যে প্লটটা নিয়ে লিখছি, সেখানে কবিতা একদমই যায় না। তা, তুই পড়ে দেখবি একটু?’

সত্যি বলতে একদমই পড়ার ইচ্ছে ছিল না। পাড়ায় ছেলে-পিলে মিলে বল পেটানো শুরু করেছে, ক্যাম্বিস বলের ধুপধাপ আওয়াজটা শুনেই ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছিল। নেহাত সদ্য সদ্য আড়াইশো গ্রাম কাজু পেটে চালান গেছে তাই, চক্ষুলজ্জায় ঠিক করলাম একপাতা অন্তত পড়ে যাই। পড়া শুরু করতেই কিন্তু স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। লেখার সুরটা খুব চেনা। ছোটবেলায় দিনের পর দিন এই সুরে মজে হুঁশ উড়ে গেছল আমার। রাতদিন এক করে পড়ে গেছলাম একটাই উপন্যাস, দিনের পর দিন। হুবহু সেই টান, সেই মায়া। ভজুদা লিখেছে,

‘সবে আঘ্রাণ মাস। শীত নেই তেমন। তবু বিকেলেবেলা চুল্লীতে কয়লা না তুলতেই মশার দাপটে স্থির থাকা দায়। রামহরি পই পই করে বিপিনকে বলে রেখেছিল রোদটা নাবলেই যেন নারকেল খোলা পুড়িয়ে রাখে। শুনলে তো? কাজে মন নেই ছেলের, খালি টো টো করে ঘোরে। দেখ কোথায় গিয়ে খেলতে লেগেছে। এদিকে ডাউন লাইনে ট্রেনের সময় হল বলে। অফিস ফেরতা মানুষের ভিড় লেগে যাবে দোকানের সামনে। জলদি জলদি চা, ডিম টোস্ট, ঘুগনি এগিয়ে দিতে হবে বাবুদের হাতে। ক্ষিদের সময় পেটে তর সয় না মোটে। ইদানীং চা-টোস্টের সঙ্গে সিঙ্গাড়াও ভাজছে রামহরি। অল্প দিনেই বেশ খ্যাতি রটেছে, দু তিন লটে কয়েকশো ভেজে রাখতে হয়। নটা অব্দি ঝুড়ি ফাঁকা রাখা যায় না, কাস্টমারদের ডিমান্ড খুব। এইসময়ে বিপিনটা পাশে থাকলে সুবিধে হয় রামহরির, চটপটে ছেলে। ওই টুকুন বয়স হলে কী হয়, মাথা পরিষ্কার। চা, সিঙ্গাড়া কে কি খেল বেশ মনে রাখতে পারে। …’

downloadঅল্পই লিখেছিল ভজুদা। একটানে পড়ে ফেলা গেল। চোখ তুলে দেখি ভজুদা সেই একই ভাবে তাকিয়ে, চোখে-মুখে প্রত্যাশা। কিছু বলি না, চুপচাপ বসে থাকি। পলকহীন মুহূর্ত কেটে যেতে থাকে। ম্যাকবুকে দেখি সময়টা ভুল সেট করা আছে। ইংরেজি জিএমটির বদলে বাংলা সাল দেখাচ্ছে। কথা বলি না দেখে শেষে ভজুদাই মুখ খোলে ‘কী রে কেমন লাগল?’ উত্তর না দিয়ে উঠে পড়ি। ভজুদা আপনমনে বলে ওঠে, ‘ভালো হচ্ছে না, তাই না রে? লিখতে গিয়েই বুঝতে পারছিলাম প্লটটা বোকা বোকা হয়ে গেছে। আসলে এর বাইরে কিছু তো জানিও না তেমন। ছোটবেলায় বাবার দোকানে যেমন দেখেছি…’। ভজুদাকে কথা শেষ করতে দিই না। হাতটা চেপে ধরি, অস্ফুটে বলি, ‘লিখে যাও ভজুদা। লিখে যাও। যা জান, যা দেখেছ, সব লিখে যাও।’

বাইরে বেরিয়ে দেখি মাথার উপর রোদ। ছেলে-পুলে তখনও তুমুল উৎসাহে বল পিটিয়ে যাচ্ছে। ওরা ডাকল খেলার জন্য, হাত তুলে চলে আসি। বাড়ি এসে স্নান করি অনেকক্ষণ। মনটা খচখচ করছিল, খাওয়া-দাওয়ার পর জং ধরা চাবিটা খুঁজে বের করি মায়ের সিন্দুক থেকে। ঘরের কোনে বই-আলমারিটা আজকাল বন্ধই পড়ে থাকে। পুরু ধূলো জমেছে খোপে খোপে। তালার ফুটোটা বুজে এসেছিল প্রায়, চাবি ঘোরাতে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে খুলল। কোনের তাকে সেই চেনা লাল মলাটের বই। বইটা বের করে চুপি চুপি ছাদে উঠে আসি। পশ্চিমে রোদ ঢলে পড়েছে অনেকখানি। শীতের ওম, বেশ মিঠে। ছাদের একপাশ মাদুরটা গুটিয়ে রাখা ছিল। পেতে ফেলি লম্বা করে, গুছিয়ে বসি। বইটা রাখি সামনে, ছিঁড়ে-খুঁড়ে গেছে অনেকখানি, এককালে উপদ্রব কম হয়নি। মলাটটা সাবধানে উলটাই, শুকনো কাগজ, চাপ দিলেই ভাঙ্গে। হলদেটে প্রথম পাতা, ধৈর্য সয় না আর, ঘাড় ঝুঁকিয়ে পড়তে শুরু করি,

‘রাণাঘাটের রেল-বাজারে বেচু চক্কত্তির হোটেল যে রাণাঘাটের আদি ও অকৃত্রিম হিন্দু-হোটেল এ-কথা হোটেলের সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা না থাকিলেও অনেকেই জানে। কয়েক বছরের মধ্যে রাণাঘাট রেল-বাজারের অসম্ভব রকমের উন্নতি হওয়ার সঙ্গে অঙ্গে হোটেলটির অবস্থা ফিরিয়া যায়। আজ দশ বৎসরের মধ্যে হোটেলের পাকা বাড়ী হইয়াছে, চারজন রসুয়ে-বামুনে রান্না করিতে করিতে হিম্‌শিম্‌ খাইয়া যায়, এমন খদ্দেরের ভিড়।…’

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস ও গুগল