লীলা, সম্ভব হলে কলকাতায় এসো…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চারু মজুমদারের মৃত্যুর পর তার মেয়ে অনিতা মজুমদারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তার বাবার মৃতদেহের কাছে। তখন একজন পুলিশ অফিসার আরেকজন অফিসারকে বলেছিলেন, ‘শেষমুহূর্ত পর্যন্ত চারুবাবু মাথা নোয়ালেন না’। অনিতা মজুমদার স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে কথাটা।চারু মজুমদার মাথা নোয়াননি। ভারতবর্ষে নকশাল আন্দোলনের নেতা ছিলেন ছোটখাট গড়নের, শান্ত মুখশ্রীর এই মানুষটি। গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল ধরে নাড়া দিয়েছিলেন। আজও তিনি ভারতের মার্কসবাদী বিপ্লবের ধারায় উজ্জ্বল এক নাম হয়ে আছেন।

চারু মজুমদারের জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে এ বছর।

চারু মজুমদার গ্রেফতার হন কলকাতার এন্টলি এলাকার এক গোপন আস্তানা থেকে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাওয়া চারুবাবুর লেখা একটি চিঠি-ই হয়ে ওঠে তাঁর গ্রেফতার হওয়ার মূল সূত্র। চারু মজুমদারের চিঠির ক্যুরিয়ার ছিলো। এই ক্যুরিয়াররা তাঁর চিঠি এক জায়িগা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতো। এদেরই একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় পুলিশ পেয়ে যায় সেই কর্মীকে যে ছিলো এই চিঠি আদানপ্রদানের মূল লোক। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা অফিসার রুণু গুহ নিয়োগী সেই ছেলেটিকে নিয়ে ফাঁদ পাতেন শিয়ালদহ স্টেশনে। তারপর একদিন তাদের পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে সেই বিশেষ পত্রবাহক। তার কাছেই পুলিশ পেয়ে যায় চারু মজুমদারের চিঠি। স্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন চারুবাবু, ‘প্রিয় লীলা, তোমাদের খবর পাই না অনেকদিন…চিঠির শেষে তিনি স্ত্রীকে লিখেছিলেন, ‘আমি একরকম আছি। ভালোবাসা নিয়ো। সম্ভব হলে কলকাতায় এসো।’

এই চিঠি থেকেই গোয়েন্দারা বুঝে যায় চারু মজুমদার কলকাতায় আত্মগোপন করে আছেন।

১৯৬৭ সালের ১১ নভেম্বর। কলকাতা শহরের মনুমেন্টের তলায় সিপিআই(এম এল)পার্টির জনসভায় উঠে দাঁড়ালেন চারু মজুমদার। তাঁর চোখে তখন সত্তরের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার স্বপ্ন। উঠে দাঁড়িয়ে সমেবেত মানুষদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নকশালবাড়ির নেতা আমি নই, নকশালবাড়ির নেতা কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, কদম মল্লিক, খোকন মজুমদার। নকশালবাড়ির কৃষক জমি বা ফসলের জন্য লড়াই করেনি। তারা লড়াই করেছে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য।’

হয়তো এভাবেই একটু একটু করে চেনা হয়ে ওঠেন চারু মজুমদার, সারা জীবন যার কেটেছে রাজনীতির সঙ্গে। তাঁর রাজনীতির মূল কাণ্ডারি ছিলো কৃষক এবং শ্রমিক। তাঁর ডাকে ভারতের অসংখ্য ছাত্র-যুবক পথে নেমেছিলো, জীবন দিয়েছিলো শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে।

১৯১৯ সালের ১৫ মে তখনকার রাজশাহীতে মামার বাড়িতে জন্ম নেন বীরেশ্বর মজুমদারের পুত্র চারু মজুমদার। ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হয়েছিলেন পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে। আর সে সময়েই এলো তেভাগা আন্দোলনের ঝড়। চারু মজুমদার সখ্য গড়লেন সেই ঝড়ের সঙ্গেই।জেল খাটলেন, দাঁড়ালেন আন্দোলনের পুরোভাগে।

চল্লিশের দশক থেকেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থায়ী। বিয়ে করেন ১৯৫২ সালে। স্ত্রী লীলা সেনগুপ্তও ছিলেন পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী।

১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সিপিআই) থেকে আদর্শিক মতপার্থক্যের কারনে বের হয়ে সিপিআই (মার্ক্সিস্ট) এ যোগ দেন। এসময় শারীরিক অসুস্থতার কারনে তাকে দীর্ঘদিন বিশ্রামে থাকতে হয়। তখন তিনি মাও সেতুং-এর চীন বিপ্লবকে খুব ভালভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করেন এবং  সে পথেই ভারতবর্ষে বিপ্লবের পরিকল্পনা করেন। ১৯৬৭ সালে সিপিআই (মার্ক্সিস্ট)নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে চারু মজুমদার ও অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনভিত্তিক নেতৃবৃন্দের চরম তিক্ততার সৃষ্টি হয়।সিপিআই(এম) নেতৃত্ব বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে অস্বীকার করায় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পথ গ্রহণ করায় সি এম এই নয়া সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তত্ত্বে ও অনুশীলনে সত্যিকার বিপ্লবীদের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন চারু মজুমদার। নকশালবাড়ি নামটি উঠে আসে কৃষক অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত পথ ধরে। সিপিআই(এম)-এর মধ্যকার এবং বাইরের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ১৯৬৮-র শেষ দিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে (এআইসিসিসিআর) মিলিত হন এবং ১৯৬৯-এর ২২ এপ্রিল সিপিআই(এমএল) গঠিত হয়। রাতারাতি চারু মজুমদার শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা ভারতের বিশেষ করে তরুন সমাজের নায়কে পরিনত হন। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষ এই আন্দোলনকে তাদের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র পথ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

‘কিপ এলার্ট। চারু মজুমদারে ইজ ডেড। উই মাস্ট বি অন দ্য অফনেসিভ।’ অয়্যারলেসের মাধ্যমে গোটা পশ্চিম বাংলার থানায় ঘন ঘন মেজেস ছড়িয়ে যেতে থাকে। ১৯৭২ সালের ২৮ শে জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।  গ্রেপ্তার হবার মাত্র বারো দিনের মাথায় পুলিশ কাস্টডিতে মারা যান চারু মজুমদার। কড়া পুলিশ প্রহরায় মৃতদেহ দাহ করা হয় বৈদ্যুতিক চুল্লীতে অতি গোপনে। কোন সাংবাদিক, কোনো ক্যামেরা পৌঁছাতে দেয়া হয়নি সেদিন তাঁর মরদেহের কাছে। পুলিশের কাছে  কঠোর নির্দেশ, কোন প্রশ্ন করা চলবে না। শুধু সমস্ত মন্ত্রী ও নেতাদের বাড়ীর সামনে গিজ গিজ করছিলো পুলিশ আর পুলিশ তাঁর মৃত্যুর পরও।

নকশালবাড়ির মৃত্যু হয়নি, তেমনি অবলুপ্ত হননি চারু মজুমদারও। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় শোষিত মানুষের জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামে চারু মজুমদার আজও এক উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকলেন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]