লেখার আড়ালে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লিও টলস্টয়ের ‘আনা করেনিনা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে। কিন্তু তার আগে ১৮৭২ সালের জানুয়ারী মাসে আরেকটি ঘটনা ঘটে যায়। কয়েকটি রুশ পত্রিকায় ছাপা হয় এক তরুণীর মৃত্যু সংবাদ। খবরে বলা হয়, ৩৫ বছর বয়সী একজন মহিলা ইয়েসানকি রেলস্টেশনে আত্মহত্যা করেছে। তার পরনে পোশাক ছিলো সম্ভ্রান্ত। হাতে একটি সুদৃশ্য ব্যাগও ছিলো।সেই তরুনী একটি মালগাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে।কে ছিলো সেই তরুণী? আনা কারেনিনা উপন্যাসের সঙ্গেই বা তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর সম্পর্ক কোথায়?     

সস্পর্ক তো ছিলোই। আর সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই লেখা হয়েছিলো আনা কারেনিনার মতো বিশ্বসাহিত্যে আলোড়ন তোলা উপন্যাসের পরিণতি।ইতিহাস অন্তত তাই বলে। লেখকদের লেখার অনুপ্রেরণা আসে নানান ভাবে। সামান্য কোনো দৃশ্য, কোনো বড় ঘটনার অভিঘাত অথবা কোনো এক মানুষের মুখ তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় আশ্চর্য সব লেখা। অনুভূতির গভীরে সেই ঘটনাগুলোর অনুরণন লেখককের মনের মধ্যে হয়তো অজান্তেই সাজিয়ে তোলে লেখার উপাদান। এমন অনেক ঘটনাই জড়িয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত সব উপন্যাস রচনার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। এমন আরও ঘটনা জড়িয়ে আছে ফিওদর দস্তয়োভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ ড্যানিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুসো’ অথবা স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের ‘হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিল’ নামে রহস্যকাহিনীর সঙ্গে।

এই অদ্ভুত যোগাযোগগুলো হয়তো কাকতালীয় বিষয়। হয়তো একেবারেই শূন্য থেকে আচমকা কোনো এক ধাক্কায় তৈরি হয়ে ওঠা একটি অফাস্তো উপন্যাসের বিস্তার।

শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে যাই। রাশিয়ার সেই রেলস্টেশনে মালগাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়া তরুণীর নাম ছিলো আন্না পিরোগোভা। আন্না ছিলেন টলস্টয়ের স্ত্রী‘র দূর সম্পর্কের আত্মীয়। অদ্ভুত ভাবে তার আরেকটি পরিচয় ছিলো। আন্না ছিলেন টলস্টয়ের প্রতিবেশী এবং বন্ধু আলেকজান্ডার বিবিকভের রক্ষিতা। টলস্টয় আন্নাকে চিনতেন। আন্নার সঙ্গে বিবিকভের সম্পর্ক ভেঙে যায়। বিবিকিভ আন্নাকে ছেড়ে তার শিশু পুত্রের গভর্নেসকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। এই ঘটনাটা মন ভেঙে দেয় আন্নার। বিদায় নেয় সে বিবিকভকে একটা চিরকুট লিখে। সেখানে লেখা ছিলো,‘ তুমি আমার হত্যাকারী। সুখী হও, একজন হত্যাকারী যতোটা সুখী হতে পারে।’

তার পরের গল্প আত্নহনন পর্ব। ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেয়ে আন্না মৃত্যুকে বেছে নিলেন। কিন্তু লিও টলস্টয়কে সহ্য করতে হয়েছিলো সেই ঘটনার বেদনাপর্বের আরও খানিকটা। ট্রেনের ধাক্কায় থেৎলে যাওয়া আন্নার মৃতদেহের ময়নাতদন্তের পুরো সময়টাই টলস্টয় উপস্থিত ছিলেন।তিনিই আন্নার মৃতদেহ সনাক্ত করেছিলেন। আর এই ঘটনাটি থেকেই এক বছর পর টলস্টয় যে উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছিলেন তার করুণ পরিণতি পর্বটুকু তাঁর মাথার ভেতরে লেখা হয়ে গিয়েছিলো।

হারম্যান মেলভিলের ‘মবিডিক’ উপন্যাসের পেছনেও ছিলো ঔপন্যাসিকের তিমি শিকারী এক জাহাজের সঙ্গে ভেসে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। বলা হয়ে থাকে, ১৮৪০ সালে সেই জাহাজের অভিজ্ঞতাটাই প্রাথমিক ভাবে মেলভিলকে উৎসাহিত করেছিলো উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে। কিন্তু মেলভিলের ডায়েরি ঘেঁটে দেখা যায় ১৮২০ সালে ‘এসেক্স’ নামে একটি জাহাজ তাঁর এই উপন্যাস রচনার পেছনে মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এই জাহাজটি একটি সাদা তিমির আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছিলো গভীর সমুদ্রে। মেলভিল ওই জাহাজের বেঁচে যাওয়া আট নাবিকের একজনের ছেলের সঙ্গে ঘটনাচক্রে পরিচিত হয়েছিলেন ১৮৪০ সালে। তার কাছে তিনি শুনেছিলেন সেই নাবিকের তিমি শিকারের অভিজ্ঞতা। মাথার ভেতরে রয়ে গিয়েছিলো সেই অভিজ্ঞতা যা তাকে দিয়ে হয়তো লিখিয়ে নিয়েছিলো ‘মবিডিক’।

ঔপন্যাসিক ড্যানিয়েল ডিফোর লেখা ‘রবিনসন ক্রুসো’ ১৭১৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হবার পর চারটি সংস্করণ হয়ে যায়। পাঠকদের কাছে ভীষণ ভাবে সমাদৃত হয় এই উপন্যাসটি। সাহিত্যের সমালোচকরা বলেন, রবিনসন ক্রুসো ভূমধ্যসাগরে জাহাজ ডুবিতে পড়া নাবিক আলেকজান্ডার শেলকার্কের গল্প। কিন্তু বিশ্লেষকরা এ উপন্যাসের কাটাছেঁড়া করে বলেছেন, শেলকার্কের জাহাজ ডুবেছিলো ভূমধ্যসাগরে। আর ক্রুসো জাহাজডুবিতে আটকা পড়েছিলেন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। সেক্ষেত্রে এই উপন্যাসটির বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিফোর উপন্যাসের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে সতেরো শতকে এক জাহাজের ক্যাপ্টেন রবার্ট নক্স। নক্সের জাহাজ তখনকার সিলোনের কাছে একটি দ্বীপে ধাক্কা লেগে ডুবে গিয়েছিলো। পরে এই ক্যাপ্টেন সিলোনে প্রায় ১৯ বছর জেল খাটেন। পালিয়ে যাওয়া এক বৃটিশ চিকিৎসক এই কাহিনি লিখে প্রকাশ করে। বিশ্লেষকদের ধারণা ড্যানিয়েল ডিফো এই কাহিনি পাঠ করেই রবিনসন ক্রুসোর গল্পলেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল তার বিখ্যাত শার্লক হোমস কাহিনি ‘দ্য হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিল’ লিখেছিলেন জাহাজে পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে গল্প শুনে। ফ্লেচার রবিনসন পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। কোনান ডয়েলের সঙ্গে হঠাৎ করেই তার পরিচয় ঘটে জাহাজে। ফ্লেচার রবিনসন দক্ষিণ পূর্ব ইংল্যান্ডের ডেভন নামে এক জায়গায়। জাহাজ থেকে নেমে চলে যাওয়ার সময় ফ্লেচার তার বাড়িতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান কোনান ডয়েলকে। একদিন ডয়েল সত্যি সত্যি গিয়ে হাজির হন ডেভনে।সেখানেই এক জঙ্গলে বেড়াতে বেড়াতে ফ্লেচার গল্প বলেন কোনান ডয়েলকে। তাদের এলাকায় লোককাহিনীর মতো প্রচলিত ছিলো রিচার্ড কেবল নামে এক ব্যক্তির কথা। এলাকার মানুষ গল্প করতো যে অত্যাচারি ও দুশ্চরিত্র সেই রিচার্ডের মৃত্যুর পর দুটো কালো ভয়ালদর্শন হাউন্ড জাতের কুকুর আকাশ থেকে নেমে এসে তাকে নিয়ে গিয়েছিলো নরকে। ডয়েল গল্পের সূত্র পেয়ে যান এখান থেকেই। এক সময়ে তিনি ফ্লেচারকেও প্রস্তাব দেন তাঁর সহ লেখক হিসেবে কাজ করার জন্য। কিন্তু শেষে এই অনন্য কাহিনির রচয়িতা হিসেবে টিকে থাকে কোনান ডয়েলের নামটাই। ফ্লেচার রবিনসন হারিয়ে যান কালের গর্ভে।

দস্তয়োভস্কি তাঁর ‘ক্রাইম অ্যান্ড পনিশসেন্ট’ উপন্যাস লিখেছিলেন এক ফরাসী লেখক ও খুনী পিয়েরে ফ্রাঙ্কুইস লেসিনিয়ারের জীবন কাহিনি পাঠ করে। অনেকে অবশ্য বলেন লেসিনিয়ারকে জানার আগেই দস্তয়োভস্কি লিখে ফেলেছিলেন রাসকলিনিকভের চরিত্রটি । কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, উপন্যাসের এই চরিত্রের সঙ্গে লেসিনিয়ারের অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। উপন্যাসে এই চরিত্রটিও লেসিনিয়ারের মতো নৃশংস ভাবে একাধিক খুন করে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ হাফিংটন পোস্ট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]