লোকসংস্কৃতি মেলার একুশ বছর

ঊর্মি রহমান

মঙ্গল শোভাযাত্রা, কলকাতা গ্রুপের সম্পাদক দিলীপ আমাকে বললো , একদিন একটা ব্যতিক্রমী মেলায় নিয়ে যবে। আমাকে ওরা প্রায়ই এ ধরণের অনুরোধ করে আর আমিও খুব একটা আপত্তি করি না, বরং বলা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাগ্রহে যাই। আমার কলকাতা বাস প্রায় আট বছর হতে চললেও এখনো অনেক কিছুই দেখা বা জানা বাকী। আর মেলা জিনিসটা বরাeiB Uv‡b আমাকে, বলা যায় আমার g‡Zv অনেককে টানে।

এক সন্ধ্যায় আমরা গেলাম বড়িশার লোকসংস্কৃতি মেলায়। আমি দিলীপ ও স্বরাজ। সিলেটের ছেলে স্বরাজ চমৎকার গান গায়। সে-ও আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা. কলকাতার সদস্য। এই লোকসংস্কৃতি মেলার উদ্যোক্তা লোকাভিযান নামে একটি সংগঠন। বড়িশার এই লোকসংস্কৃতি মেলার বয়স হলো ২১ বছর। এটা কলকাতায় নিয়মিত হতে থাকা ফেস্ট/মেলা থেকে আলাদা। এর আগে কোন একবার সুন্দরবনের গোসাবা বা ক্যানিং থেকে শিল্পীরা G‡mI দক্ষিণv রায়ের cvjv শুনিয়েছে। অনুষ্ঠিত হয়েছে মনসামঙ্গল পালা।লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান, উপাচার এখানে থাকে।

আমরা যেতেই আমাদের স্বাগত জানালেন লোকাভিযানের যুগ্ম সম্পাদক কিংশুক রায়। তিনি আমাকে চেনেন মনে হলো। আমি নিশ্চিত মঙ্গল শোভাযাত্রার কারণেই সেটা ঘটেছে। তখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। আমরা প্রথমেই মেলাটা দেখতে গেলাম। একেবারে গ্রামীণ মেলা। কোন চাকচিক্যপূর্ণ সামগ্রীর প্রদর্শন ছিলো না। সমস্তই ঠিক গ্রামের মেলায় যেমন দেখা যায়, তেমন সব জিনিসই ছিল। এমনকি দা-বটি ইত্যাদিও ছিলো। আচারের পশরা নিয়ে একজন মহিলা একটি স্টলে বসে ছিলেন। গরম গরম জিলাপীও ভাজা হচ্ছিলো। ছিলো আরো অনেক মুখরোচক খাবার। আমরা পরে পাপড়ি চাট খেলাম। এবারের মেলায় দু’দিন ছিলো বাংলাদেশ দিবস। আমরা যেদিন গেলাম, সেদিন ছিলো বাংলাদেশ দিবসের দিন। বাংলাদেশের শিল্পীরা গান গাইবেন। কলকাতায় বাংলাদেশ সরকারের উপ-রাষ্ট্রদূত আসবেন শুনলাম। পরে জানা গেল তিনি পরদিন আসবেন। আমার বাংলাদেশীত্ব জেনে উদ্যোক্তারা আমাকেই মঞ্চে তুলে দিলেন। আমাকেই সেদিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করতে হলো। মঞ্চে ছিলেন এলাকার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, লোকাভিযানের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ থেকে আসা কিছু ব্যক্তিত্ব। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দু’জন লোকশিল্পী। তরুণবয়স্ক একজন শিল্পী আবার এসেছেন খুলনা থেকে।

খুলনার প্রতি আমার ভিন্ন ধরণের মমত্ববোধ রয়েছে। আমার মামাবাড়ি খুলনায়, মধুমতী নদীর পাড়ের একটি গ্রামে। অজ্ঞান শৈশবে সুন্দরবনে বনকর্মী আব্বা ও মায়ের সঙ্গে হাউজবোটের জীবন, শৈশবে প্যাডল স্টিমারে চড়ে মামাবাড়ি যাওয়া এবং গ্রামে নানী ও অন্যদের সঙ্গে সময় কাটাবার স্মৃতি এখনো এক মধুর রেশ নিয়ে উপস্থিত হয়। আমি স্কুল উত্তীর্ণ হবার মুখোমুখি আব্বা খুলনা নিউজপ্রিন্টের ফরেস্ট ম্যানেজার হয়ে গেলেন। আমি উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স পড়লাম সেখানে। আবারও খুলনার সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ও ভালবাসা জন্ম নিলো। আরো একটা ব্যাপার আছে। আমরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকের কয়েক মাসও সেখানে কাটিয়েছি। সেই উদ্দীপনা ও দুঃসময়ের স্মৃতিই বা কি করে ভুলি! তাই সেই তরুণ গায়ককে দেখে বড় আপনজন মনে হলো। ছেলেটি গাইলো ভালো। তবে তার সঙ্গে একজন গায়িকা ছিলেন। তার গান সম্পর্কে কিছু বলবো না। তবে তিনি গুজরাতি স্টাইলে শাড়ি পরেছিলেন। গাইলেন লোকগীতি। তার এভাবে শাড়ি পরতে ভাল লাগতেই পারে। কিন্তু তিনি যখন মঞ্চে কিছু করছেন বা পাবলিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, তখন তিনি নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিশেষ করে দেশের বাইরে যাঁরা আছেন বা আমন্ত্রিত হয়ে অন্য দেশে যাচ্ছেন, তাদেরও মনে রাখা উচিত, তারা দেশকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরছেন। তারা সবাই  দেশের বেসরকারী রাষ্ট্রদূত।

সবচেয়ে ভাল লেগেছিল এটা জেনে যে, লোকাভিযানের সেদিনের সেই অনুষ্ঠান ২১ বছরে পা দিয়েছে। এমন একটি অনুষ্ঠানকে এত বছর টেনে নিয়ে যাওয়া কম কথা নয়। সমস্ত পরিবেশটা কলকাতার মত মহানগরীর বুকে একটা অন্য রকম মায়া সৃষ্টি করেছিলো। মেলা দেখে মনে পড়লো আমার শৈশবে গ্রামের মেলার কথা।  তখন আমরা মহররম, রথ কিংবা উল্টোরথের মেলার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। এই মেলার পরিসরটা ছোট হলেও ক্ষণিকের জন্য সেই স্মৃতি তুলে এনেছিলো স্মৃতির অতল থেকে।

ছবি: লেখক