লোকসান

দীপারুণ ভট্টাচার্য্য

(কলকাতা থেকে): ঢাকা অফিসে এসেই বিপ্লবের সাথে দেখা। বর্ধমানের ছেলে। অনেক জুনিয়র তবে মাথা খুব পরিষ্কার। জার্মানী থেকে ছয় মাসের ট্রেনিং নিয়ে গত সপ্তাহে ঢাকাতে পোস্টিং হয়েছে দুই বছরের জন্য। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলো। এতদিন পর দেশের মানুষ দেখলে যেমন হয়। হঠাৎ আমরা আবিষ্কার করলাম দুজনের পরনের জ্যাকেট দুটিই একদম এক জিনিস। – এটা কোথা থেকে কিনেছো দাদা? – এইতো, গত মাসে যখন ঢাকা এলাম তখন খালেদ নিয়ে গিয়েছিলো। দোকানের নামটা বড় সুন্দর, আড়ং, কাছেই। – আমি এটা কিনেছি নিউরেমবার্গ থেকে। তোমারটা কত নিয়েছে? – ২৫০০ বাংলাদেশি টাকা, তোর? মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো বিপ্লব। তারপর জ্যাকেটের ভিতরে লাগানো বিদেশি কোম্পানির স্টিকার টা দেখলো সে, দুটি জ্যাকেটই বাংলাদেশে তৈরি। বিপ্লব বলল, ভেবেছিলাম ৬৫ ইউরো, কি লাভই না করেছি। আর এখন দেখছি তুমি অর্ধেকের ও কম দামে….. তার আশাহত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো লাভ ক্ষতির হিসাব বোধহয় এভাবেই পাল্টে যায় মাঝে মাঝে। এতদিন বাদে দেখা হওয়ার আনন্দ উধাও হয়ে, পরিবেশটা বেশ ভারী হয়ে উঠলো। এমন সময় আসাদ সাহেবের প্রবেশ। কি হলো দুজনেই চুপচাপ, সমস্যাটা কি? – বিপ্লব জার্মানী থেকে একটা জ্যাকেট কিনে ভেবেছিল খুব লাভ করেছে কিন্তু.…… সব শুনে আসাদ সাহেব হো হো করে হাসতে লাগলেন। এবার আমরা দুজনেই অবাক। – এই একই জিনিস আমি কারখানা থেকে কিনেছিলাম গত বছর ১৮০০ টাকাতে। দাম নিয়ে দমবেন না দাদা। চলেন ক্যান্টিনে, কফি খেয়ে আসি। আসাদ সাহেব এই অফিসের অনেক পুরোনো লোক। আর বছর দুই বাদেই অবসর। কালো কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, লাভ লোকসান খুব গোলমেলে জিনিষ ভাই। এ নিয়ে মন খারাপ করে কোনো লাভ নাই। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এক খান গল্প বলতিসি, মন দিয়ে শোনেন, তালেই সব পরিষ্কার হবেনে। এই বলে তিনি নিচের গল্পটি শোনালেন, জবানী তারই। গরু চোর আরাবুন সম্প্রতি চুরি ছেড়ে ডাকাতি ধরেছে। সোম ও শুক্রবার হাট বসে বাঙ্গর গ্রামে। রেজ্জাল মিয়ার খুব টাকার দরকার। তাই সে ঠিক করল একটা দুধেল গাইকে বেচে দিবে শুক্রবারের হাটে। গরু নিয়ে রেজ্জাল মিয়াকে হাটের দিকে যেতে দেখেই, দলবল সহ আরাবুন ঝোপের আড়ালে লুকায়ে অপেক্ষাতে রইলো। গরু বেচে ফেরার সময় আজ রেজ্জাল মিয়ার টাকা ছিনতাই করবে তারা। কিন্তু কি কান্ড দিনের শেষে রেজ্জাল ফিরছেন গরু নিয়েই। দলের একজন বাতাসে কথা ভাসায়ে দিলো, কি মিয়া, গরু বেচলানা? – হাটে আজ দাম নাই। বেচলে লোকসান হইতো। তাই….….সোমবার দেখুম। সোমবারও রেজ্জাল ফিরলো গরু নিয়ে। কারণ ওই লোকসান। পরের শুক্রবার সন্ধ্যে বেলায়ও যখন আরাবুন দেখলো রেজ্জাল আবারও গরু নিয়েই গ্রামে ফিরতিছে তখন সে নিজেই ঝোপ থেকে লাফায়ে পড়ে, রেজ্জালের পাঞ্জাবিটা চেপে ধরলো, এই মিয়া, গরু বেচবা বেচবা কইরে সাত দিন কাটাইলা, অহনও তো বেচলা না। এইসব ক্যান করছো মিয়া? – কম দামে গরু দিলে লোকসান হইতো। – লোকসান নিয়া তুমি ভাবার কিডা? লোকসান হইলে আমার হইবো, তোমার মিয়া এতো ভাবনা কিসের? মুক্ত কন্ঠে হাসিই এর একমাত্র প্রতিক্রিয়া। হলোও তাই। কফি শেষ, এবার কাজে বসতে হবে।

ছবি: গুগল