শব্দ-জব্দ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইশতিয়াক নাসির, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান

একটা দৈনিক পত্রিকায় বিভিন্ন অক্ষর দিয়ে শব্দ বানানোর খেলার বিভাগের নাম দেখেছিলাম ‘শব্দ-জব্দ’।অনেক আগের কথা, কিন্তু ইদানিং ‘শব্দ-জব্দ’ টার্মটা প্রাক্তন প্রেমিকার মত বারবার মাথার মধ্যে উঁকি দিচ্ছে।পুরোনো প্রেমিকার স্মৃতি তাও ভালো, শুধু বুকের মধ্যে কষ্ট দেয়। কিন্তু এই ‘শব্দ-জব্দ’ ব্যাপারটা শুধু আমার বুকে না, কানে, মাথায় এমনকি শরীরের শিরায় উপশিরায় অসহ্য যন্ত্রণা তৈরি করছে।আমি গত কয়েকটা মাস শুধু শব্দের কাছে জব্দ। এমনভাবে জব্দ, ঠিক যেভাবে রিমান্ডে নেয়া আসামী, পুলিশের কাছে ‘ডলা’ খেয়ে জব্দ হয়। গত কয়েকমাসের কথা বললাম মানে, বাঙ্গালীর শীতে কালের উৎসব পার্বন উৎযাপনের রীতিনীতির কথা বলছিলাম আর কি। শীতকাল এলেই সবার মনে পড়ে বিয়ে করতে হবে। সে করুক সমস্যা নেই। কিন্তু বইয়ে পড়া ‘যার বিয়ে তাঁর ধুম নেই, পাড়া পড়শির ঘুম নেই’ প্রবাদটা যখন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে যায়, তখন নিজেকে সত্যিই রিমান্ডে নেয়া আসামির মত মনে হয়। পালানোর উপায় নেই, কিন্তু টর্চার সহ্য করতেই হবে। আজকালকার বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে যেভাবে রাতদিন জোরে জোরে গান বাজানোর প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে তাতে পালাবোই বা কোথায়? আজ এই বাড়িতে বিয়ে, তো কাল ঐ বাড়িতে। আর বিয়ে মানেই কান ফাটানো গান বাজানোর উৎসব! তাও সে যদি শোনার মত কিছু হয়। অতি কচলানোর ফলে তেতো হয়ে যাওয়া লেবুর মত জনপ্রিয় কিছু হিন্দি আর বাংলা গানের লুপ। মানে একই গান ঘুরে ফিরে বার বার বাজানো। বিয়ে বাড়িতে গান বাজবে খুব স্বাভাবিক, কিন্তু সারা দুনিয়াশুদ্ধ লোককে সেটা শোনানোর কি দরকার? তাও দিনের বেলা হলে কোন কথা থাকেনা, তাই বলে সারা রাত? যদি সেই বাড়ি থেকে ইনভাইট করতো, তাহলেও সহ্য করা যায়। শুধু বিয়ে কেন, শীতকাল আসলে ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল আর রাজনৈতিক জনসভাও খুব রমরমা অবস্থায় থাকে। যে নেতা বক্তব্য দিচ্ছেন বা যিনি ওয়াজ করছেন তাঁর সামনে যতগুলো লোক বসা থাকে, শুধু তাদের কানে পৌছানোর জন্য যতটুকু সাউন্ড সিস্টেম থাকা দরকার, সেটাই থাকা উচিৎ।কিন্তু কেন জানিনা, ছোট বাচ্চাদেরকে জোর করে খাওয়ানোর মত করে এই নেতা বা হুজুররা জোর করে সবাইকে শোনানোর চেষ্টা করেন। নেতা তাও যা করে দিনের বেলায়, কিন্তু এই ওয়াজ মাহফিলের হুজুররা মাঝ রাতেও এমন চিৎকার করে কথা বলেন, শুনলে মনে হয় কারো সাথে ঝগড়া করছে! জানিনা সুন্দর করে, ধীরে-সুস্থে কথা বলতে কি সমস্যা। এর পাশাপাশি আবার নতুন চল শুরু হয়েছে পাড়ায় পাড়ায় লোকাল ডিজে পার্টি। একটা প্যান্ডেল মত বানিয়ে রাতদিন গান বাজানো। কি যে গান বাজায় ঠিক বোঝা যায়না খালি ধুপ্‌ ধুপ্‌ শব্দ। এই পরিস্থিতিকে আর শব্দ দূষণ বলা যায়না, এটা রীতিমত শব্দ সন্ত্রাস।ছোটবেলায় খেলার সময় মারামারির মত সিচুয়েশন হলে বলতাম হাত থাকতে মুখে কি? আর এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, মাইক থাকতে হাতে কি? আগে বলা হত হাতে না মেরে ভাতে মারছে। আর এখন বিয়েতে দাওয়াত না দিয়ে ভাতেও মারছে আবার কান দিয়েও রক্ত ঝরাচ্ছে। শব্দের শক্তি কিন্তু ভয়াবহ, যে কারনেই সুপারসনিক বিমান কখনও খুব বেশী নিচ দিয়ে চালানো হয়না। একটা নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ দিয়ে কাঁচ ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব। আর এই বিয়ে বাড়ি আবা ওয়াজ মাহফিলের লোকেরা বোধহয় জানেন না, মানূষের কানের পর্দা কাঁচের চেয়েও অনেক পাতলা। আমরা কথায় কথায় বলি, ‘থাপড়াইয়া কান ফাটাইয়া ফেলমু!’ একটা থাপ্পড়ে যদি কান ফাটার মত অবস্থা হতে পারে, রাতদিন কানের কাছে মাইক বাজালে কি অবস্থা হয়। একটা ভালো গান শুনলে বলি, বাহ্‌ কি চমৎকার! আর এখন এমন অবস্থা, এইসব মাইকের অত্যাচার শুনলে মনে হয় কানের উপর বলাৎকার! সম্প্রতি এক বন্ধু-পত্নী মন্তব্য করেছে, আমার লেখা পড়লে তাঁর নাকি খালি মনে হয় আমি বিয়ে করতে চাই। আমার বিয়ে করা দরকার। অথচ সত্যি কথাটা এই যে, বিয়ে না করার পেছনে এই শব্দভীতি প্রবল ভাবে কাজ করে আমার মনে। শুনেছি বউরা নাকি রাতদিন কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে। ঘরে-বাইরে যদি এত শব্দের কারনে জব্দ হয়ে থাকতে হয়, মাঝে মাঝে ভাবি সন্নাসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাবো নাকি?

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]