শব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুজতাবা শফিক

তিন.

একটাও মাছ উঠেনি বড়শীতে। আশা ছাড়েন না আবদুল হক সাহেব! ছেলেকেও আশা ছাড়তে দেন না।

-বাজান দোয়া পড়তেসো নি !

-হ বাজান, পড়তাছি।

-আইচ্ছা, এইবার কুলহু আল্লা তিনবার পড়বা। কেমুন! মাছে দেখবা ফাল দিয়া উঠতাছে।

বরিশালের লোকজন “লাফ” কে বলে “ফাল”। আবদুল হক যদিও ঢাকা শহরেই বড় হয়েছেন , কিন্তু এখনো বরিশালের আঞ্চলিকতা রয়ে গেছে। ছোট্ট পুকুরটা তে বাবা আর ছেলে মাছ ধরতে বসেছেন। ভাঙ্গা , অতি পিচ্ছিল একটা ঘাট আছে পুকুরটার। সেখানেই মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে বসেছেন দুজনে। বড়শীতে কেঁচো পুরে মাঝ পুকরে ছুঁড়ে মারেন আব্দুল হক। একটু মাছের চারা হলে ভালো হতো, ভাবে সে। এতো দোয়ার পরেও কোনো কাজ হচ্ছে না ।  মাছের দেখা নাই। চোখ বড় বড় করে বাবার কাজ কারবার দেখছিলো ছেলে মুমিনুল হক, ওরফে মুমিন। মাছ ধরার ব্যাপারটা তার যেমন ভালো লাগছে, মাছ না-পাওয়ার আশঙ্কটাও চেপে বসছে। বাসায় গেলে মা সালেহা বেগমের কটু কথা শুনতে হবে। সালেহা বেগমের মুখ তো মুখ নয়, যেনো একটা দুমুখো ধারালো ছুরি! এই আশঙ্কটা আব্দুল হক সাহেবকেও চেপে ধরছে। বাসায় গেলে সালেহা আজ বিরাট কাণ্ড করবে।

সালেহা বেগম একজন কলহ প্রিয় মানুষ। সব সময় উচ্চস্বরে কথা বলেন। সামান্য কিছু ছুতানাতা পেলেই বিরাট কলহ বাধিয়ে তুলবেন। আব্দুল হক জানেন, সালেহা বেগমের এই তপ্ত মনটার মাঝে লুকিয়ে আছে সন্ত্রস্ত্র এক ভীরু কিশোরী মন! হয়ত আব্দুল হকের এই সাদাসিধা বড্ড আটপৌড়ে সাদাকালো জীবন তার কাম্য ছিলো না! হয়ত সে অন্য রকম এক রঙীন জীবন চেয়েছিলো, যে জীবন আব্দুল হকের কাছে একেবারেই অচেনা! জীবনের পৃষ্ঠা গুলো আবদুল হক সাহেব শুধু উল্টিয়ে গেছেন, ভালো করে পড়ে দেখা হয় নি! অন্য সব সাধারন মানুষের মতো তিনি একজন অতি সাধারন মানুষ হতে চেয়েছেন! যে বয়সে নামাজ ধরতে হয়, তিনি ধরেছেন। যে বয়সে দাড়ি রাখতে হয়, রেখেছেন।

আজ বড় ছেলেটার জন্যই মাছ ধরতে আসা। যদি ছেলেটাকে একটু খুশী করা যায়। কেমন ভাবুক দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে আছে । কি এতো ভাবে মুমিন! আব্দুল হকের বিশ্বাস,একদিন এই ছেলে বিরাট কিছু হবে!

-কি ভাবো বাজান? কি চিন্তা করতে আছো!

কিছু বলে না মুমিন। একমনে বড়শীর ফাৎনাটা লক্ষ্য করে। মুমিন জানে আজ বড়শীতে মাছ উঠবেই।

-বাজান, আমার কাছে টাকা আছে ! চলো গঞ্জের থিকা একটা মাছ কিনা বাড়িতে  যাই, চলো ! আব্দুল হক তড়বড় করে বলে উঠেন।

কিছুই বলে না মুমিন! শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষন পর শুধু বলে,

-মাছ উঠবো!

আব্দুল হকের কাছে মনে হয় যেন কোন গায়েবী আওয়াজ ভেসে এলো! অবাক হয়ে আব্দুল হক ছেলেকে দেখেন। ছেলেটার মাঝে কিছু একটা আছে। কি আছে সেটা কখনো ঠাহর করতে পারেন নি আব্দুল হক। কিন্তু কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে। সালেহা শুধু শুধু ছেলেটাকে গালাগালি করে।

শেষ পর্যন্ত তাই হলো। মাছ পাওয়া গেলো । ছোট মাছ নয় , বেশ বড় মৃগেল মাছ। মাছ সাইকেলে ঝুলিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলেন বাবা আর ছেলে । গ্রামের আঁকাবাঁকা আইলের পথে সাইকেল নিয়ে ফিরছেন দুজন। মুমিন পিছনে বসে শক্ত করে বাবাকে ধরে আছে। দুপাশে যত দূর চোখ যায় হলুদ সরিষা ক্ষেত। আকাশের নীল রঙ আর মাটির হলুদ রঙ মিশে যেনো কি একটা নতুন রঙ সৃষ্টি করেছে! ছোটবেলার এক আনন্দঘন স্মৃতি! আইলের পথ দিয়ে সাইকেল চালাতে এমনি কষ্ট হচ্ছিল আব্দুল হকের! তার মধ্যে কদিন আগে বৃষ্টি হয়েছে! কাদায় পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে পথ। পথে কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে সাইকেল থেকে পড়ে যায় বাবা আর ছেলে। একটা লাশ পথের মাঝে চিত হয়ে পড়ে আছে। বুকে গেঁথে আছে মাছ মারার টেটা। এই অঞ্চলে জমি জমা নিয়ে মারামারি, খুন খারাবি লেগেই আছে। সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেছে। লাশটা আব্দুল হক খেয়াল করতে পারেন নি! চোখদুটো এখনো খোলা। মুখটা হা হয়ে আছে। কিছুটা কুকুর শেয়ালে কামড়ে খেয়ে ফেলেছে! কতক্ষন এই লাশ এখানে পড়ে আছে কে জানে? অস্বাভাবিক বোটকা গন্ধ! মাছি ভন ভন করছে। সেই প্রথম মুমিনের লাশ দেখা!

এরপরে যে লাশটা মুমিন দেখে, সেটা তার বাবার লাশ! বাবা যেদিন মারা গেলেন সেই দিনটার কথাও কেন জানি মনে পড়ছে মুমিনের। বাসায় সেদিন কেউ নাই। মা গেছেন পাশের বাসায়। ছোট ভাই আমান গেছে ঢাকার বাইরে বন্ধুদের সাথে বেড়াতে। মুমিন তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। জরুরী কিছু নোট নিতে বন্ধু শামীমের বাসার দিকে পা বাড়ায় মুমিন। বাবা, আব্দুল হক সাহেব বেড়িয়েছেন মাগরিবের নামাজ পড়তে। গলির মুখটার কাছে যেতেই মানুষের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ায় মুমিন! অন্যদিন হলে হয়ত খেয়াল করতো না। আশেপাশের কোন কিছু তাকে তেমন টানে না ! আজ কি হলো, জটলা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ল সে। আব্দুল হকের নিথর দেহটা রাস্তায় পড়ে আছে। একটা ট্রাক পিষে দিয়ে চলে গেছে। সুন্দর মুখটা অক্ষত আছে শুধু মাথার খুলি ফেটে ঘিলু বেরিয়ে গেছে। পাশের বাসার ইয়াজুদ্দিন সাহেব ছিলেন ভীড়ের  মধ্যে। মুমিন কে দেখেই চি্ৎকার করে উঠেন

-জান আছে জান আছে ! ধরো ধরো !

মুমিন অপলক চেয়ে থাকে। মুমিন জানে বাবা আর নেই!

-আরে হা করে তাকায় আছো ক্যানো!

ধরাধরি করে আব্দুল হককে একটা টেম্পোতে উঠানো হলো। টেম্পর দু পাশের সীটে তারা দুজন বসে আছেন , মুমিন আর ইয়াজুদ্দিন সাহেব। ঠিক মাঝখানে পায়ের কাছে আব্দুল হক সাহেবকে শোয়ানো হয়েছে। মনে হচ্ছে উনি ঘুমিয়ে আছেন। ইয়াজুদ্দিন সাহেব জোরে জোরে দোয়া পড়ছেন আর মুমিন বাইরে তাকিয়ে আছে। মুমিন ভাবছিলো, এই এত বড় পৃথিবীতে আজ সে সম্পূর্ন একা। বাবা চলে গেছেন। কিন্তু এতটুকু কান্নাও পাচ্ছে না মুমিনের! অদ্ভুত! বরং অন্য একটা চিন্তা এসে মাথায় চেপে বসলো! পরীক্ষাটা আর দেয়া হবে না! এক্টা পুরো বছর নষ্ট হতে যাচ্ছে !

(চলবে)
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]