শব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুজতাবা শফিক

পাঁচ

নাইমুনকে প্রথম দেখার দিনটি মনে করার চেষ্টা করে মুমিন। বন্ধু শামীমের বাসায় প্রথম দেখা। খুব বেশী বন্ধু কখনই ছিলো না মুমিনের। আড্ডা দেয়ার মতো তো নয়ই। এক এই শামীমের সঙ্গেই তার কথা হতো। কিন্তু শামীমের বাসায় যে এরকম একটা সুন্দরী মেয়ে থাকে, জানা ছিলো না। শামীম কখনো কথা প্রসঙ্গেও বলে নি! নাইমুন শামীমের কোন এক সুত্রের বোন হয়। বলা যেতে পারে আশ্রিত বোন ! নাইমুনের বাবা মা অনেক কাল আগে মারা গেছেন। শামীমের মা তাকে আশ্রয় দিয়েছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে এই পরিবারটি নাইমুনের নিজের পরিবার। নিজের জীবনের এই বিয়োগান্তক ঘটনার কোন ছাপ কিন্তু নাইমুনের মধ্যে নেই। প্রানোচ্ছল এক জীবন্ত  মানুষ! মুমিনের মনে হয়, পৃথিবীতে শুধু দুই ধরনের মানুষ আছে, এক যারা এই সুবিশাল মহাবিশ্বে জীবিত প্রাণ হিসাবে নিজেকে ধন্য মনে করে যেমনটি নাইমুন আর দুই হচ্ছে তার মতো হেরে যাওয়া মানুষ। কোন যুদ্ধ না করে হেরে যাওয়া মানুষ। এই পৃথিবীর সবকিছুর প্রতি তাদের আছে শুধু অনুযোগ। নাইমুনকে দেখে মুমিনের প্রথম মনে হলো সে এবার প্রথম সারিতে এসে দাড়াবে। এই মেয়ের যা কিছু প্রাণশক্তি আছে, তাতে বিস্তর ভাগ বসাবে!

কোন এক নাটক বা সিনেমার টিকেট নিয়ে খুনসুটি চলছিলো ভাই বোনের। নাইমুনের কথা হচ্ছে আজকেই টিকেট কিনে দিতে হবে এবং তাকে নিয়ে যেতে হবে। শামীম যাবে না । এই দারুন সুন্দরী মেয়েটার আদুরে ঠোটের ফাঁকে হাসির ঝিলিক আর কালো চোখের বাঁকা চাহনী আর সেই সাথে মায়া মায়া কথা ; কীভাবে অবলীলায় পায়ে ঠেলছে শামীম! মুমিনের মনে হয়েছিলো শামীম ছেলেটা কী পাষান !

-আমি যাবো! নিজের গলাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলো না মুমিন। সে-ই বললো কথাটা নাকি তার ভিতরের কোনো ভুত !

নাইমুন এই প্রথম ভালো করে লক্ষ্য করে মুমিনকে। ঠোঁটের ফাঁকে আবার দেখা যায় হাসির ঝলক! মুমিনের মনে হয় পৃথিবীতে কত আলো! মুমিনকে অবাক করে সত্যি সেদিন সিনেমায় গিয়েছিলো নাইমুন! আর এই ঘটনায় বোধহয় সবচাইতে খুশী হয়েছিলেন শামীমের মা ! শামীম আর নাইমুনকে নিয়ে  উনি খুব শংকিত ছিলেন! নাইমুনের সাথে শামীম আবার জড়িয়ে পড়ে কি না এমন একটা ভাবনায় তিনি ছিলেন কাতর। এবার তিনি হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

নাইমুন কি আমার জীবনের একমাত্র মেয়ে! চিন্তা করে মুমিন! অন্তত এরকম টাই ধারনা দিয়েছে সে নাইমুনকে। কিন্তু এটা কি তার বিশ্বাস না সততা! এটাই কি বাস্তবতা ছিলো! স্বপ্নার কথাটা, সে কি বলতে পারতো না? হয়ত বলা উচিত ছিলো। কিন্তু এটা কি বলার মত কিছু ছিলো? দ্বিধায় পড়ে যায় মুমিন। এক্টা সৎ সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে, সে কি কোনো দায়িত্ব নিয়েছে! যাই হোক এসব এখন আর ভাবার মানে হয় না! নাইমুন এখন অতীত।

ডাঃ আকমল সাহেবের অযাচিত সাহায্যে, মুমিন এখনি একটা একটা রিকশায় উঠতে বাধ্য হয়েছে ! ভদ্রলোক টেনেটুনে স্যুটকেসটা মুমিনের সাথে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন!ঝিকাতলার কাছে এসে রিকশা নিয়ে ভদ্রলোকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া গেলো!

-স্যুটকেস নিয়া মাইনসে সদর ঘাট যায়, বাস টার্মিনাল যায় কিন্তুক আফনে স্যুটকেস নিয়া পার্কে বয়া আছেন! বোঝলাম না বিষয়ডা!

হাসে আকমল সাহেব। এয়ারপোর্টের কথাটা আর বললেন না ! মুমিন কে দেখে ঠিক মনে হয় না সে প্লেনে উঠার পাব্লিক!

-আফনে কি ঢুকাইসেন স্যুটকেস কন দেখি! কি ভারী! আর ডায়াবেটিসের দিকে নজর দিয়েন কইলাম ভাইজান!

পেট দুলিয়ে হাসেন আকমল সাহেব। যেনো বিরাট হাসির  কথা! উত্তরে মুমিন কাষ্ঠ হাসি হাসে!

-না , স্যুটকেস আমার এক বন্ধুর, হলে থাকে। দিয়ে আসতে হবে !

মিনমিন করে আরো কিছু বলে মুমিন ঠিক বোঝা যায় না! ততক্ষনে আকমল সাহেব ফিরে গেছেন। রিকশাওয়ালা বলে,

-কই যাইবেন সার?

মুমিন ভাবে, সত্যিতো এখন কই যাবে? সূরয় এখন মাথার উপরে। রোদ চড়চড় করছে। সেইসাথে দুপুরের ক্ষুধাটাও বিশ্রীভাবে জানান দিচ্ছে! দুপুর একটা বাজে বোধহয়! পার্কেও স্যুটকেসটা রাখা গেলো না ! এরপর আর কোথায় যাওয়া যায়? দিনে দুপুরে এভাবে স্যুটকেস নিয়ে ঘোরাঘুরি সম্ভব নয় ! মানুষের সন্দেহ বাড়ছে !

-কাটাবন যাও। (চলবে)

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]