শব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুজতাবা শফিক

সাত

লোকটাকে বুকের উপর থেকে ঠেলে উঠায় নাইমুন। সুযোগ পেয়ে নরম বুকের উপর হামলে পড়েছে লোকটা। কিছু মাত্র সভ্যতা ভব্যতার লেশ মাত্র নাই। বন্ধ ঘর পেলেই এরা মেয়েদের উপর পশুর মতো ঝাপিয়ে পড়ে। লোকটাকে এতক্ষনে ভালো করে দেখে নাইমুন! পশুই একটা ! ঠিক কি পশু হতে পারে ভাবার চেষ্টা করে নাইমুন। ভাল্লুক কি? এটা এক্টা মজার খেলা! সব মানুষের মাঝেই কোন না কোন পশুর মিল খুজে পায় নাইমুন।  এই লোক টা দেখতে ভাল্লুক এর মতো। কিন্তু ভাল্লুক তো টেকো হয় না! মনে মনে ভাবে নাইমুন! যাইহোক, সেই টেকো ভাল্লুক লোকটা আবার এসে গায়ে উঠে পরার চেষ্টা করছে!

-ধুর! তুমি আগে কিছু খাবার অর্ডার দাও তো! খুব ক্ষিদে পেয়েছে আমার! ওসব পরে হবে!

আদুরে গলায় বলে নাইমুন! হতবিহ্বল হয়ে পড়ে লোকটা!

-কি খাবে! আহা আগে বলবে না!

নাইমুন জানে লোকটা এখন টাকার হিসাব করছে! ভাবছে, এটাতো হিসাবে র মধ্যে ছিলো না! কোন এক কোম্পানীর এম ডি ! নাইমুন জানে কালকে এই লোকের অফিসে ঢুকতে চাইলে ঢুকতে পারবে না! এরা এরকমই। এদেরকে হাতের তালুর মতো চেনে নাইমুন!

-আমি স্টেক খাবো সাথে ম্যাশ পোটেটো! তুমি?

গুলশানের এই পাচতারা হোটেল গুলো সব চেনা হয়ে গেছে নাইমুনের। কোন হোটেলে কি ভালো পাওয়া যায় সব তার জানা!

-আর শোনো, আজ কিন্তু একদম ওসবে মুড নেই! জোর করবে না প্লীজ! তুমি না আমাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাবে তোমার কনফারেন্সে! তখন দেখা যাবে!

নাইমুন টোপ ফেলে! লোকটা অনেক্ষন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ভাবটা এরকম, “মাগী, তাইলে এখন কী জন্য আসলি! এতো টাকা আর সময় নষ্ট করলি কেনো?’

-অবশ্যই যাবে তুমি। কিন্তু এর আগে একবার না বললে তোমার মেয়ের পরীক্ষা! বলে লোকটা।

-পরীক্ষা ছিলো , এখন তো শেষ! নেবে কি না বলো!

লোকটা কাপড়টা খুলবে কি খুলবে না চিন্তা করে ! লোকটার চোখের ভাষা পড়তে সময় লাগে না নাইমুনের! ব্যগ থেকে একটা নেইল কাটার বের করে এগিয়ে দেয় ! গলাটাকে আরো আদুরে করে বলে,

-তার চেয়ে তুমি আমার  নখগুলো কেটে দাও না জান! দেখো প্যাডিকিউর করার সময় পাচ্ছি না!

ঠিক কতখানি ভ্রূ বাঁকালে আর কতটুকু মুচকি হাসলে পুরুষ মানুষকে দিয়ে যা খুশী করানো যায়, জানে নাইমুন! এসব তাকে কেউ শিখিয়ে দেয় নি! সময়ের প্রয়োজনে শিখে নিতে হয়েছে। নাইমুনের ঠোটের গাঢ় লিপস্টিকের ফাকে একসারি সাদা দাঁতের ঝিলিক খেলে যায়! অবাক করে দিয়ে লোকটা নাইমুনের পা নিয়ে বসে পড়ে। ভাবখানা এমন ,বিরাট এক বিজনেস এসাইনমেন্ট পাওয়া গেছে! এবার খিল খিল করে হেসে উঠে নাইমুন।

এই লোকের মেয়ের বিয়েতে কয়েক দিন আগে গিয়েছিলো নাইমুন! বউটা এমন তাচ্ছিল্যভরে তাকাচ্ছিলো নাইমুনের দিকে, যেনো সে অচ্ছুত! আজকের এই দৃশ্যটা যদি তাকে দেখানো যেতো ! নাহ, এসব কাউকে দেখানো যায় না! বলাও যায় না! এটা একান্তুই নাইমুনের নিজস্ব জীবন! যেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই।

এমন একটা জীবন কি চেয়েছিলো নাইমুন? সে কি ব্যাভিচারিনী! দ্বিচারিনী! নিজেকে এভাবে নীচে নামাতে নারাজ নাইমুন! সে শুধুমাত্র সুখী হতে চেয়েছিলো!সুখী হবার জন্য যা কিছু উপাদান সব তার চাই। ভালো একটা থাকার জায়গা, বাচ্চার জন্য ভালো স্কুল, হাত খরচ, দুয়েক বার বিদেশে ঘুরতে যাওয়া! এই তো চেয়েছিলো সে! খুব বেশী কি? তার মতো একটা মেয়ের কি এতটুকু পাবার অধিকার নেই!

মুমিনও নাইমুনকে এতটা নিচে নামাতে চায় না! কিন্তু নাইমুনের  ব্যবহারিক জীবনের কোনো হিসাব  সে মিলাতে পারে  না! নাইমুনের গাড়ী কোথা থেকে এলো বা গাড়ীর খরচ, ড্রাইভারের বেতন কোথা থেকে আসে , সে জানে না। তাদের মেয়ে অনন্যার দামী স্কুলের বেতন, বিদেশে বেড়ানো; কিভাবে এসব হয়! একজন বেসরকারী দ্বিতীয় সারির কর্মকর্তার কি এতো বেতন হয়? জানে না। কখনো জানতে চায় নি মুমিন। চাইলেও নাইমুন  হয়ত উত্তর দিতো না! ধীরে ধীরে নাইমুন তার নরম মনটাকে শক্ত খোলসে পুরে ফেলেছে! যা ভেদ করা এখন অসম্ভব।ঠিক কবে থেকে এটা শুরু হলো এখন মনে পড়ছে মুমিনের। অনন্যার যখন তিন কি চার বছর, নাইমুন তার স্কুল ঠিক করে। নাইমুনের ইচ্ছা মেয়েকে দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করাবে। যেদিন স্কুলে ভর্তি করার কথা; মুমিন জানলো তার নামে মামলা হয়েছে! সেদিন আর বাসায় ফেরেনি মুমিন। পরদিন নাইমুন কিছু  জিজ্ঞেসও করেনি! একটি বাক্যও নয়! সে কোথা থেকে সব জেনে গেলো মুমিন জানে না! শুধু টের পায় তার আর নাইমুনের মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব। নাইমুন কীভাবে চাকুরী যোগাড় করেছে মুমিন জানে না! মেয়ের স্কুলে ভর্তি হবার টাকা কোথা থেকে আসে মুমিন জানে না। মুমিন এরপর থেকে কিছুই আর জানতে পারে না!

নাইমুনের সাথে তার বিয়েটা একটা সামাজিক বিপর্যয় ছাড়া আর কিছু নয়, ভাবে মুমিন! হয়তো সে, এই সমাজের জন্য, এই সময়ের জন্য একজন সম্পূর্ণ অযোগ্য মানুষ। বিধাতা তার কপালে বড় করে লিখে রেখেছেন —“অপদার্থ”! মুমিন কোনদিন তা দেখতে পায় নি! এই সমাজের প্রতি চরম উদাসীনতা দেখিয়ে এই সমাজেই এতদিন থেকে গেছে মুমিন। (চলবে)

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]