শব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুজতাবা শফিক

এক.

মুমিন চায়ের দোকানে আয়েশ করে বসে চা খাচ্ছে !সকাল বেলা গরম চা ভালই লাগছে । আজকাল ঢাকার রাস্তায় মজার সব চা পাওয়া যায়। এটা হচ্ছে মাল্টা চা! মানে চায়ের সাথে মাল্টা দেয়া। চাইলে লেবু চা, পুদিনা পাতার চা, দুধ চা সবই পাওয়া যায়। মুমিন মাল্টার চা টাই খেতে চাইলো ! আগে অবশ্য খায়নি কখনো। ভালই লাগছে। এখন পকেটে টাকা আছে কিনা সেটাই কথা। মুমিন ভাবে, টাকার কথা পরে চিন্তা করা যাবে, আগে এই চা টা মজা করে খাওয়া যাক।

উস্কো খুষ্কো, কাঁচা পাকা চুল। গায়ে মলিন বেশভুষা । বয়স আন্দাজ চল্লিশের কম হবে। কিন্তু আসল বয়সের চেয়ে একটু বেশীই লাগে মুমিনকে! গাল ভেঙেগেছে! যেনো অনেকদিন ভালো মন্দ কিছু পেটে পড়েনি।একটা সময় চেহারাটা যে চটকদার ছিলো বোঝা যায়। মেদহীন পাতলা গড়ন। গায়ের রং ঘষা কাচের মতো লাগছে, হয়ত রংটাও একসময় বেশ চকচকে ছিলো !

চায়ের এই দোকানটা আগে কখনো মুমিন খেয়াল করেনি। অবশ্য আশপাশের খুব কম বিষয়ই  সে খেয়াল করে। পাড়ার গলির মুখেই এই ছাপড়া দোকান। সুন্দর বেঞ্চি দেয়া আছে। একটু হাটলেই কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড। চা খেয়ে বের হতে হবে। কোথায় যাবে মুমিন?

-আংকেল, এত বড় সুটকেস নিয়া কই যান সাত সকালে !

দোকানদার এর প্রশ্নে ঘোর ভাঙ্গে মুমিনের। তাইতো! স্যুটকেসের কথা প্রায় ভুলেই গেছে মুমিন! এই ঢাউস সাইজের সুটকেসটার কথাও মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে! কি থাকে আজকাল মাথায়? নীল রং এর বেশ বড় সড় স্যুটকেস। নিচে চাকা আছে, আবার টেনে নেবার জন্য হ্যান্ডেল আছে। কিন্তু দুটোরই অবস্থা খারাপ! অবশ্য শক্ত খোলস দেয়া স্যুটকেস! সহজে ভাঙবে বলে মনে

হচ্ছে না !

মুমিন অপ্রস্তুত এর মতো হাসে। সব সময় এই ভাবেই হাসে মুমিন! মা, সালেহা বেগম বলেন, বেকুবের মতো হাসি! কিছু হলেই মা সালেহা বেগম গালাগালি করেন!

-বেকুবের মতন হাসবি না মুমিন! শুয়ার একটা।শুয়ার পয়দা করছি পেট থিকা ! হারামি ।

যাক, মা এখন মনে হয় ঘুমিয়ে আছেন। গালাগালি সব শেষ। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মুমিনের বুক চিড়ে।  কোথাও একটা যেতে হবে এখন। কোথায় যাওয়া যায়? এতবড় ভারী স্যুটকেস নিয়ে বেশি নড়া চড়া করা মুশকিল। ট্যাক্সি নেয়া যাবে না ! টাকা নেই পকেটে। বাসে করে যেতে হবে। ঘড়ি নেই মুমিনের কাছে । মোবাইল ও নেই ! আনুমানিক সকাল সাতটা হবে এখন। সকালের আলো বেশ ধরে এসেছে। এদিকটায় লোক চলাচল খুবই কম। ভালোই হলো, ভাবে মুমিন । কোন রকমে হাচড়ে পাচড়ে স্যুটকেসটা নিয়ে বাসে উঠে পড়তে পারলেই হয়! তারপর? জানেনা মুমিন ! স্যুটকেস্টা কোথাও ফেলে দিতে হবে! আসলে কোন কিছু নিয়েই বড় কিছু চিন্তা করতে পারে না মুমিন! আর এই জন্য ছোটবেলা থেকে সালেহা বেগমের কাছে প্রচুর গালি খেতো সে! কয়েকদিন আগেও খাবার টেবিলে কী গালাগালটাই না করলেন মা সালেহা বেগম!

-শুয়ার একটা! চাইরটা পয়সা সংসারে দিতে পারে  না! তর ভাইরে দেখসস ! তর চাইতে পাঁচ বছরের ছোটো! পুরা সংসার চালায়! আর শুয়ার টারে দ্যাখ, কেমন ঘোত ঘোত কইরা খাইতে আছে!

মা কিছু হলেই শুয়ার বলে গালি দেন! মায়ের প্রিয় গালি! মা কি কখনো শুয়োর দেখেছেন, ভাবছিলো মুমিন! তাইলে শুয়োর যে ঘোতঘোত করে খায় , মা জানলেন কিভাবে ! মুমিন হাসে।

-হাসবি না মুমিন। যা আমার সামনে থিকা।

মুমিন খেতেই থাকে। কেন যেন তার মনে হয়,আজকের দিনে এই তার শেষ খাওয়া! পকেটে টাকা নেই। বাইরে গেলে আর খাওয়া জুটবে না!

মিন্ মিন করে শুধু বলে

-অ তো ঘুষ খায় !

কী, কী কইলি? বাইর হ ! বাইর হ বাড়ি থিকা। তুই আর কোন্ দিন আমার বাড়ি আসবি না ! ঘুষ খায় ! তুই খাইলি না ক্যান, জ্ঞান দাও তুমি? শুয়ারের বাচ্চা…

আর টেবিলে বসে থাকা যায় না । বাকি ভাত মুখে পুরে মুমিন দ্রুত উঠে পড়ে। এরপর সালেহা বেগম হয়ত হাত চালাবেন! যেতে যেতে আবার মিন মিন করে বলে

-আমার তো চাকরী চলে গ্যাসে মা… জানো না?

-চাকরী আবার যায় ক্যামনে! এই বলদের বাচ্চা! আমার সামনে আয় । যাবি না তুই…

ততক্ষনে মুমিন রাস্তায় উঠে গেছে। এই কয়েকদিন আগেকার সব স্মৃতি! সালেহা বেগম কি ভয়ংকর এক প্রতাপশালি মহিলা ছিলেন ! লেডি হিটলার মুমিন আড়ালে ডাকতো! সামনে ডাকার সাহস হয়নি কখনো!

——আংকেল, সুটকেসে কি!

নাহ, এই দোকানদার ব্যাটার দেখি প্রচুর কৌতুহল? এখানে আর এক মূহুর্ত থাকা যাবেনা। মুমিন চায়ের দাম দিয়ে হাটা শুরু করে। সুটকেসটা অসম্ভব ভারী। না টানা যায়, না ঠেলা ! তার উপর চাকাগুলো সব নষ্ট ! ঢাকার রাস্তায় হাঁটাই দুষ্কর, তার উপর সুটকেস টানা! কোনটা রাস্তা আর কোনটা যে ফুটপাত বোঝা দায়। যেটা কে ফুটপাত বলা হচ্ছে, সেটা নানান খানা খন্দে ভর্তি। হকারদের দখলে প্রায় পুরাটাই। তারই পাশে বিকট খোলা ড্রেন!

এই সব পেরিয়ে, কোন রকমে বড় রাস্তায় উঠে পড়ে মুমিন। দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করে । মানুষ জন সব বের হয়ে পড়েছে কাজের উদ্দেশ্যে! কারো অফিস, কারো বা ব্যবসা,কেউ স্কুল কলেজে যাচ্ছে! কিছু না কিছু আছে । কী ব্যস্ত নগরের এই জীবন! মাঝে মাঝে এই নগরকে গলিত লাশ মনে হয় মুমিনের! মানুষগুলো ভন ভন করছে মাছির মতো! এরকম একটা মাছির জীবন তো আমারোও হতে পারতো! ভাবে মুমিন। আরো ভাবে । আরো গভীরভাবে ভাবে। মুমিন ভাবতেই ভালোবাসে। ঠোটে সস্তা সিগারেট গুজে ফস করে দেশলাই জ্বালায়! অগুনতি বাইক ছুটছে। অল্পবিস্তর প্রাইভেট কার যাচ্ছে। অনেক্ষন পর বাস আসে। রঙচটা, গোমড়ামুখো ২২ নম্বর মিনিবাস। মুমিনকে এই বাসে উঠতে হবে! বাসে এই ভারী সুটকেস কোনভাবেই উঠাতে পারবে না মুমিন। হেল্পার ছেলেটার হাতে বিশটা টাকা গুজে, হাতে পায়ে ধরে কোন ভাবে বাসে সুটকেস ওঠানো হলো! পিছনে কিছু খালি সিট আছে। একটা সিটে খাড়াভাবে সুটকেস রেখে, পাশে বসে পড়ে মুমিন! যাক এটার এখন একটা গতি হবে! হতেই হবে । উপায় নাই! নীল রং এর স্যুটকেসটা ভালো করে দেখে মুমিন। এটাই কি বিয়ের স্যুটকেসটা! হবে হয়তো। এরপর আর কোনো স্যুটকেস কেনা হয় নি! মুমিনের স্মৃতি গোল্ডফিশের মতো। বেশি কিছু তার মনে থাকে না! মনে রাখতেও সে চায় না!

(চলবে)

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]