শরীরী আকর্ষণের রসায়ণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;’’ জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন। সে নারী তার পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে তাকিয়েছিল কবির দিকে। একটু পিছিয়ে যদি যাই কবিতায় কবি কালিদাশ বর্ণনা করেছেন নারীর রূপ, বর্নণা করেছেন কবি চন্ডীদাশও।

কবি আলাওলের কবিতায় পাই পদ্মাবতীর অসাধারণ শরীরী সৌন্দর্যকেও। সাহিত্যে নারীর সৌন্দর্যকে উপমা, উৎপ্রেক্ষায় এক চিরকালীন ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন লেখকরা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘‘আমারেই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’’। যদি বলি যুগ যুগ ধরে নারীকে চেতনার রঙে সাজিয়ে তুলেছে পুরুষ তবে এ যুগের নারী মুক্তির মুখপত্ররা হৈ হৈ করে উঠবেন। না, আমাদের তেমন কোন উদ্দেশ্য নেই। নারী শরীরের এই অপার সৌন্দর্যে যুগ যুগ ধরে মোহিত হয়েছে পুরুষ, সমুদ্রে ভেসেছে যুদ্ধজাহাজ, পতন ঘটেছে রাজত্বের। এই ওলট পালট ভুবনে নারীও কি চায় নি পুরুষকে? দেখেনি পুরুষের মন অথবা শরীরের প্রতিভা? ইংরেজিতে বললে এই ‘বডি কেমিস্ট্রি’-এর টান দুদিক থেকেই ঘটেছে। সেই কেমিস্ট্রি বা রসায়নের গুঢ় রহস্যের কিনারা করতে চেয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞান, চেয়েছে সমাজবিজ্ঞান, চেয়েছে মনোবিজ্ঞান। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন সেই আকর্ষণের রসায়ন নিয়ে।

মুখ তার
নারী শরীরের ঠিক কোন অংশটুকু পুরুষের পছন্দ? উজ্জ্বল ত্বক, অসাধারণ মুখশ্রী, গুরু বক্ষ, ক্ষীণ কোটি অথবা পদযুগল? নাকি সব মিলে নারীর রহস্যময় ব্যক্তিত্ব পুরুষকে টেনে নিয়ে গেছে আকর্ষণের গলিপথ ধরে? পুরুষের যেমন আকর্ষণের মাত্রাভেদ আছে তেমনি পুরুষের বেলায়ও আছে নারীর ভালোলাগার এক সংবেদনশীল দাঁড়িপাল্লা। সেখানেও কি পাল্লা ঝুঁকে পড়ে বলিষ্ঠ, দীর্ঘদেহী অথবা ব্যাক্তিত্ববান পুরুষের দিকে? সবই আসলে কতগুলো প্রশ্নের সমন্বয়। উত্তর খুঁজে পাওয়া ভার।
‘মানব দেহ সুন্দর’ এই কথাটা প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার সময় থেকে শোনা গেলেও একালের নন্দনতত্ত্বে তা অস্বীকৃত নয়। গ্রীক সংস্কৃতিতে মানুষ, প্রকৃতি আর যুক্তিবাদ ছিল মূলমন্ত্র। কিন্তু দেহসৌন্দর্যের মহিমা উপলব্ধিও ছিল ওই সংস্কৃতির অংশ। এই অধুনিক বিশ্বেও এই চেতনার কমতি পড়েনি। আর তাই হয়তো বিজ্ঞান নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে রহস্য ভেদের। সম্প্রতি অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা নারী ও পুরুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে বের করেছেন, পুরুষ শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত ক্ষীণকায় নারীর শরীরকেই তাদের আকর্ষণের ক্ষেত্রে বেশী ভোট দিচ্ছেন। এই পক্ষপাতিত্বের পেছনের কারণ হচ্ছে তারা ক্ষীণকায় নারীর শরীরকে বিচার করছে যৌবন, প্রজনন শক্তি আর সক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে। কারণ প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধির জন্য বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক ভাবেই সক্ষম নারীকে পুরুষের প্রয়োজন।
এই নতুন গবেষণার সমন্বয়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন স্পিকম্যান মন্তব্য করেছেন, গড়পড়তা মানব দেহের ওজন এবং উচ্চতার সমন্বয় করে তারা দেখেছেন (বডি-মাস ইনডেক্স) ২৪ পয়েন্ট হচ্ছে নারীর সবচাইতে আকর্ষণীয় শরীরের মাপকাঠি। তবে ওই জরিপে সবচাইতে বেশী সংখ্যক পুরুষ ভোট দিয়েছেন নারীর পদযুগলকে। তাদের মতে দীর্ঘ পা নারীর প্রতি চুম্বক আকর্ষণ তৈরী করে। পায়ের পরই রয়েছে নারীর বক্ষ সৌন্দর্য যা পুরুষকে বেঁধে ফেলে অন্য এক টানে। তবে জরিপে অংশ নেয়া সবাই অদ্ভূত ভাবে আকর্ষক নারীর অন্যতম অঙ্গ হিসেবে ভোট দিয়েছেন চোখকে।

শরীর, শরীর
কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসের শমী ডাক্তারকুসুমকে বলেছিল ‘‘শরীর শরীর। তোমার মন নাই কুসুম প্রশ্নটি আমাদেরও। একবিংশ শতাব্দীর ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে নারী অথবা পুরুষের মনের আকর্ষণ কী তাহলে সব গুছিয়ে বাড়ি ফিরে গেল? মনের জায়গা দখল করে নিয়েছে শরীরী আকর্ষণ? বিজ্ঞান জানাচ্ছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যক্তিত্ব আর চারিত্রিক বৈশিষ্টের ব্যাপারে আজও দূর্বল। সমাজ গবেষণাও বলছে, বংশ বৃদ্ধির জন্য মানুষ দীর্ঘকাল ধরে আকর্ষণীয় শরীরের পাশাপাশি মানবিক এইসব গুণের প্রতিও আকৃষ্ট। অন্তত জরিপের ফলাফল তাই বলে। কিন্তু এই মানসিক টানের পাশাপাশি শরীরের টানটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে মানুষের যৌন জীবনে। মানব মস্তিষ্কের মধ্যভাগ থেকে পেছনের অংশে বিশেষ প্রতিক্রিয়াই তৈরী করে এই শরীরী আকর্ষণ।
মেয়েরা সাধারণত সরু কোমর, চওড়া কাঁধের পেশীবহুল পুরুষকেই তাদের পছন্দের তালিকায় এক নম্বর আসনে বসিয়ে থাকে। কিন্তু পুরুষের এই দৈহিক সৌন্দের্যের সঙ্গে মেয়েদের মুগ্ধ করে পুরুষালী চেহারা। একটি সামাজিক গবেষণা বলছে, মেয়েদের পুরুষালী চেহারার পুরুষ বেছে নেয়ার বড় কারণ হচ্ছে তারা মনে করে এ ধরণের পুরুষরা সমাজের অভিজাত শ্রেণী থেকে আসে এবং তাদের মধ্যে এক ধরণের সামাজিক দায়িত্ববোধ থাকে। আদিকাল থেকে নারী এক ধরণের অনিশ্চয়তার অনুভূতি থেকে অভিজাত পুরুষের কাছে এভাবেই নির্ভরতা খুঁজেছে। জরিপ বলছে, যে নারীরা শারীরীকভাবে বেশী আকর্ষণীয় তাদের মধ্যে এ ধরণের পুরুষ খুঁজে নেয়ার প্রবণতা বেশী কাজ করে।
নারী ও পুরুষেরে পারস্পারিক আকর্ষণের ক্ষেত্রে শরীরের ঘ্রাণ বড় ধরণের ভূমিকা পালন করে। পুরুষ যেমন মেয়েদের শরীরের সুঘ্রাণ ভালোবাসে তেমনি নারীরাও পুরুষের প্রতি আকর্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ এক ধরণের পুরুষালী সুঘ্রাণকে প্রধান্য দেয়। এই গন্ধ বিশেষ কোন পারফিউমেরও হতে পারে। জরিপ বলছে, মেয়েদের ঋতুকালীন সময়ে এই গন্ধের বিষয়টি বেশী শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখনই তারা একটি বিশেষ ধরণের পুরুষালী ঘ্রাণের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে। যে দূর্বলতা পরে সম্পর্কের দিকেও এগিয়ে যায়।
মেয়েদের মতো পুরুষরাও চমৎকার নারী-মুখশ্রীর ব্যাপারে দূর্বল। জরিপে অধিকাংশ পুরুষ নারীর পুষ্ট ঠোঁট, চওড়া কপাল, চাপা থুতনি আর নাককে ভোট দিয়েছে। পাশাপাশি তারা ত্বকের উজ্জ্বলতাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা পছন্দের এই তালিকা এশিয়ার অধিবাসীদের বেলায় এসে বেশ অনেকটাই বদলে গেছে। তাদের পছন্দেও তালিকায় নারীর চোখ উঠে এসেছে এক নম্বর অবস্থানে। এশিয়নরা মনে করে আকর্ষণীয় নারীর চোখ তার চারিত্রিক বৈশিষ্টকে প্রকাশ করে।

চুল তার কবেকার  
নারীর চুল নিয়ে সাহিত্যে জয়গানের শেষ নেই। প্রাচীন পারস্যের সাহিত্যে কোকড়ানো চুলকে নারীদের সৌন্দর্যেরকেন্দ্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে নারীর চুলের ক্ষেত্রে পুরুষদের পছন্দ খুবই সোজাসাপ্টা। পাশ্চাত্যের পুরুষরা স্বর্ণকেশী নারীদের বেশী পছন্দ করে। অন্যদিকে প্রাচ্যে কালো চুলের জয়জয়কার। মধ্য যুগের ইংরেজী সাহিত্যে নারীর কোকড়ানো চুলের উল্লেখ বারবার এসেছে। প্রাচীন ভারতে নারীরা তাদের চুলে সুগন্ধ মাখতো পুরুষকে আকর্ষণ করার জন্য।

স্তনের উচ্ছাসে ছেঁড়ে কন্ঠহার   
নারীর ভারী, সুগঠিত স্তন প্রাচীন ভারতের চিত্রকলা এবং সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে। একটা সময়ে শিল্পী সাহিত্যিকরা বিপুল স্তনকেই নারীর আকর্ষণের মূল কেন্দ্র বলে মনে করতেন। কিন্তু সভ্যতার বিকাশ ক্রমশ এই ধারণাকে একটু একটু করে পাল্টে দিয়েছে। অপেক্ষাকৃত কম স্থুলকায় স্তনের গঠনের প্রতি পুরুষের আকর্ষণ বেড়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, জরিপ জানাচ্ছে, পুরুষরা নারীর ভারী স্তনের প্রতি বেশী আকর্ষণ বোধ করে এবং এখানেও সেই বংশবৃদ্ধির কারণটিই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরুষরা জরিপে মত দিয়েছেন ভারী বক্ষের মেয়েরা প্রমাণ করে যে তাদের শরীরে হরমনের মাত্রা বেশী আছে যা বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

পুরুষ সুন্দর
নারীর হাসিকে বলা হয় পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্র।মোহময় ওষ্ঠের কিনারায় ফুটে ওঠা সামান্য একটু হাসি নাকি জয় করে নিতে পারে পুরুষের হৃদয়। কিন্তু পুরুষের হাসি? সে হাসির আবেদন কতটা নারীর কাছে?গবেষণার ফলাফল জানাচ্ছে, পুরুষের হাসির মাঝেও রয়েছে এক অন্য ধরণের জাদু যা নারীর চিত্ত হরণ করে নেয়। অধিকাংশ নারী জরিপকালীন সময়ে জানিয়েছে, পুরুষের সুন্দর হাসি তাদেরকে সেই পুরুষকে চুমু খেতে আগ্রহী করে তোলে। পুরুষের চোয়ালের দৃঢ় গঠনও নারীকে শারীরিক ভাবে উদ্দীপ্ত করে মিলিত হবার জন্য।
পুরুষের মাথার শক্ত চুল নারীকে যৌন মিলনের সময় এক ধরণের অধিপত্য করার অনুভূতি এনে দেয়। জরিপ কালে নারীদের একটি বড় অংশ এমন চমকপ্রদ তথ্যই জানিয়েছে। যৌন সম্পর্কের সময় পুরুষের মাথাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করার জন্য নারীরা চুল টেনে ধরতে পছন্দ করে। এ কাজটি করার সময় তারা এক ধরণের অধিপত্য বিস্তার করতে পারে।
পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ বোধের রসায়ণ পুরুষের হাতের ব্যাপারেও বেশী কাজ করে। পুরুষের সবল হাতের স্পর্শের ব্যাপারে একজন নারী সবসময় দূর্বল। কারণ সেই হাতের স্পর্শ থেকে তারা নির্ভরতা, সামাজিক নিরাপত্তার অনুভূতিটুকু অনুভব করতে চায়। এক ধরণের নান্দনিক অনুভূতিও এই স্পর্শ তাদেরকে উপহার দেয়। ফলে পুরুষের হাত নারীর পছন্দের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নয়ন আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]