শরৎসুন্দরী…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমিতরূপ চক্রবর্তী

(আলীপুরদুয়ার থেকে): একটু গরম পড়েছে ঠিকই কিন্তু চারপাশ ভাসিয়ে সুন্দর সোনারঙা রোদ উঠেছে। গনগনে সোনারঙা রোদ। গায়ে বেশ লাগে বেশ। আশ্বিনের শুরু। নদীর পাড়ে কাশও সাদা হয়েছে দেখেছি। সাদা বহুদূর ছড়িয়ে থাকা কাশবন দেখতে আমার খুব ভাল লাগে। কাশের গন্ধ নেই। যদি থাকতো, তাহলে নিশ্চিত রেভ্যুলুশনারি হয়ে উঠতো এই ফুল। জংগলে কখনো কখনো দেখা যায়, কোনো একটা জায়গা পুরোটা দখল করে ভয়ংকর সুন্দর হয়ে কাশফুল ফুটে আছে। সেই জায়গাটি অতিক্রম করে গেলে ফের অনেকটা দূর অবধি কোনো কাশফুলের ছিটেফোঁটাও নেই। শুধু বুনো সবুজ, তার গায়ে ঠেকে থাকা গরম নিবিড় রোদ। তারপর আবার এক জায়গায় কাশের সন্ত্রাস। আর ক’দিন পরেই কাঁচা ভোরবেলা যে স্বর্গীয় গন্ধটা পাওয়া যাবে, তা শেফালির। আমাদের বাড়ির আশেপাশে আগে অনেক নতুন-পুরনো শেফালি গাছ ছিলো।

ঘরবাড়ি আর সংসারের অ্যাডভান্সমেন্টে সেসব গাছের বেশিরভাগই আর নেই। কোথাও কোনো বাড়ির আনাচে কানাচে জীর্ণ মূর্তির মতো দু-একটা গাছ হয়তো আছে। কিন্তু এতে আগের মতো কাঁচা ভোরবেলায় অনেক গাছের এবং তাদের জন্ম দেওয়া অনেক ফুলের যে সম্মিলিত গন্ধটা ছুটে আসতো- তা আর নেই। আমাদের উঠোনে এমনই একটি ক্ষয়ে যাওয়া শেফালি গাছ কিছুদিন আগেও ছিলো। এই সময়টা আস্তে আস্তে সে সুগন্ধি হয়ে উঠতো। পাতার গায়ে ব্যালেন্স রেখে টিকে থাকতো লাল বোঁটার শেফালি ফুল। হাওয়ার ধাক্কা পেলেই সেগুলো টপটপ করে ঝরে ঝরে পড়তো। আর গাছটাকে ঘিরে মৌ মৌ করতো একটা অদৃশ্য সুগন্ধের বলয়।

ভোরবেলা বা দিনের বেলা শেফালি ফুলের গন্ধের অভিঘাত এক আর রাতের বেলার শেফালির গন্ধের অভিঘাত আরেক। রাত্রি আটটা-নটায় হঠাৎ উড়ে আসা হাওয়ার ভাঁজ খুলে শেফালি ফুলের গন্ধ নাকে এলে কেমন নিজেকে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মাঝরাতের দিকে এই ফাঁকা ফাঁকা লাগার তীব্রতা বা ডিগ্রি আরো বেড়ে যায়। আমাদের যতো শেফালি ফুল বা শেফালি ফুলের গন্ধ সংশ্লিষ্ট চর্চা, সেসব দিনের। রাতের শেফালি ফুল বা তার গন্ধের চর্চা তেমন নেই। জানি না এর পেছনে আমাদেরই অজ্ঞাতে আমাদেরই দীর্ঘদিনের নার্চার করা কোনো সংস্কার কাজ করে কিনা। দেহপসারিণীদের সঙ্গে প্রায়শই রাতের ফুলের বা তার সুগন্ধের উপমা টানা হয়।

একটা সময় আমাকে বা আমাদের বাড়ির সবাইকেই এই উঠোন, যার এক কোনায় ওই ক্ষয়ে যাওয়া শেফালি গাছটা দাঁড়িয়ে থাকতো, সেই উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হতো। কোনো কোনোদিন রাত্রি আটটা/ সাড়ে আটটার সময় হয়তো কোনো কাজে সেই উঠোন পেরিয়ে ঘরে যাচ্ছি বা বেরিয়ে আসছি- তখন হঠাৎই নাকে আসতো রাতের হাওয়ার মধ্যে মিশে থাকা শেফালি ফুলের গন্ধ। আটটা/ সাড়ে আটটা এমন কিছু রাত নয়। অনেকে এমন সময় চা খান। টিউটররা না দমে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে চলেন। প্রত্যেক বাড়ির টেলিভিশন সেট থেকে সিরিয়ালের কোনো একটা নির্দিষ্ট সংলাপ একইসময়ে একসঙ্গে শোনা যায়, এমন কর্মব্যস্তার রেশ থেকে যাওয়া সেই আটটা/ সাড়ে আটটার রাতে উঠোন পেরুতে পেরুতে হঠাৎ করে যখন শেফালি ফুলের গন্ধ নাকে এসেছে, মনে হয়েছে যেন এ-ও এক নীরবতার গন্ধ। অনুচ্চার নতমুখ এক মানুষের কুক্ষিগত নীরবতার গন্ধ। যে মানুষটা শুধু রাত নামলেই তার হাত পায়ের শৃঙ্খল খুলে বাইরে আসতে পারে। ভোর হতে না হতেই আবার গারদে ঢুকে যায়।

ছবি :গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box