শহর এক আশ্চর্য প্রেমিকার নাম-দুই

আহমেদুর রশীদ টুটুল

“জলোচ্ছাসে নিঃশ্বাসের স্বর, বাতাসে চিৎকার

কোনআগ্রহেসম্পন্নহয়ে, কোনশহরেরদিকে

জলের আহ্লাদে আমি একা ভেসে যাবো?”

পথ খুব দুরের নয়। ব্যক্তিগত গাড়িতে দুই ঘন্টায় অনায়াসে আসা যায়। কিন্তু সেই দুই ঘন্টার পথ আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল , পথের শেষ কোথায়! পথ যেন শেষ হচ্ছিলোনা। শীতকালে এখানে বিকেল চারটাতেই ঘন অন্ধকার হয়ে রাত নামে। পাহাড়ের ভাঁজ ভেঙে ভেঙে বয়ে যাওয়া রাস্তা কিছুক্ষন পরপর দীর্ঘ দীর্ঘ টানেল পার হয়ে নতুন দৃশ্যপটে গড়িয়ে পরা মাত্র মনে হচ্ছিল মাথার উপরে এ কোন্নির্বাসনদন্ডের থড়গ আজ আমার চেনা পৃথিবীর বাইরে । প্রত্যেকটা মূহুর্ত যেন ঘড়ির কাটায় হাজার বছরের দীর্ঘ বিরতিতে অতিবাহিত হচ্ছে। ক্লান্তি আর উৎকন্ঠা নিয়ে অবশেষে প্রবেশ করলাম এক আলো ঝলমল শহরে। ছাড়া ছাড়া বাড়ি-ঘরসব, বাংলো টাইপ, কাচের জানালা, প্রত্যেকটা জানালায় ল্যাম্প জ্বালানো। চারপাশে আলো আর আলো। জমে থাকা বরফে সেই আলো রিফ্লেক্টেড হয়ে এক অদ্ভূত মাদকতা তৈরি করেছে। তবে এই মাদকতার মধ্যে আমার শহর ধারনার ব্যস্ততা বা উদ্দামতা বা বেলেল্লাপনা কিছুই নাই । চুপচাপ, শান্ত, নিরব একটা শহর আমাদেরকে স্বাগত জানালো নিস্পৃহ আর নিরাসক্ত অভ্যর্থনায়। কতটা ক্লান্ত ছিলাম, কতটা অবসন্ন হয়ে পরেছিলাম সেই সময়, স্মৃতি ছাড়া কোন কিছুতো নাই যে পরিমাপ করতে পারবো। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল তখন, কান আর চুলের নিচে লুকিয়ে থাকা ক্ষত ঠান্ডায় কেমন যেন ফুলে উঠেছিল। আমি অস্বস্থি বোধ করছিলাম। শহরের কেন্দ্রে কমিউনি ও লাইব্রেরির পক্ষ থেকে কয়েকজন আমাদেরকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন। তারা   আমাদেরকে তাদের শহর সম্পর্কে ধারনা দেয়ার জন্য কথাবার্তা বলছিলেন। আমি শোনার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু তাদের কথায় আমি মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। আমার মাথার ভেতর তখন হাজার ভাবনার স্রোত। এর মধ্যেই হঠাৎ করে দিনাজপুরের স্মৃতি চোখে ভেসে উঠলো। একবারই মাত্র গিয়েছিলাম সেখানে। ঢাকায় শীত পরেনা বলেএক ডিসেম্বরে আমরা শীত পোহাতে দিনাজপুরে গিয়েছিলাম। ছোট্ট আর ভীষণ নিরীহ একটা শহর। মানুষ গুলোও সহজ-সরল । আমি কেন যেন দিনাজপুরের প্রেমে পরে গেলাম, একেবারে বেফানা প্রেম। রুনার তখন ধারনা হয়েছিল আমি আসলে দিনাজপুরের না, নিশ্চয়ই কোনো দিনাজপুরবাসিনীর প্রেমে পরেছি। অনেক অনেক পরে রুনা অবশ্য বুঝতে পেরেছিল শহরের প্রেমেও যে পরা যায়। সেবার দিনাজপুরের শীত ও খাবার দাবার বেশ জাঁকিয়ে উপভোগ করেছিলাম আমরা। দাঁড়িয়ে আছি নরওয়ের ছোট্ট এক শহরের কেন্দ্রে, এই শহরেই জন্মগ্রহন করেছিলেন হেনরিক ইবসেন; বিশ্ববিখ্যাত কবি ও নাট্যকার , মাত্র কয়েক পা হাঁটলেই তাঁর জন্মভিটা। জন্মগ্রহন এই শহরে করলেও জন্মস্থানে বসবাস করতে পারেননি তিনি। পিতার ব্যবসায় ধ্বস আর আগুনে বাড়ি পূড়ে যাওয়ার কারণে ভাগ্যের অন্বেষণে ঋণগ্রস্থ ইবসেনকে শিয়েন ছাড়তে হয়। পরবর্তীতে ধর্মের সমালোচনা করে লেখালেখির কারণে তিনি খৃষ্টান মৌলবাদিদের রোষানলে পরেন। মৌলবাদিদের ভয় আর পাওনাদারদের চাপের কারণে ইবসেনের আর কোনদিন নিজের শহরে ফিরে আসা হয়ে  উঠেনি। কী পরিহাস!শতবছর পরে মৌলবাদের চাপাতিনলে পরা আর কিঞ্চিত ঋণগ্রস্থ এক তুচ্ছ কবিতাকর্মী আজ আশ্রয় পেলো ইবসেনেরই জন্মশহরে। পরিচয়-অভ্যর্থনা পর্ব শেষ করে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের জন্য ঠিক করে রাখা এপার্টমেন্টে। রান্নাবান্নার যোগাড়-যন্ত্র ছিল কিছুটা কিন্তু এই অবস্থায় রেঁধে খাওয়ার মানসিকতা আমাদের ছিল না। আমাদের অসহায়ত্ব বুঝতে পেরে গায়ক বন্ধু পিৎজ্জা নিয়েএলেন। যতটুকু পারা যায় আমাদেরকে বুঝিয়ে টুঝিয়ে দিয়ে আবার সকালে আসবেন বলে সবাই চলে গেলেন। এরপরপরই শুরু হলো আমাদের বিষাদগ্রস্থ জীবনের নতুন পর্ব। আমার মেয়েরা হুহু করে কান্নায় ভেঙে পরলো। এভাবে কখনো ওদেরকে কাঁদতে দেখিনি আমি। রুনারও স্থির স্থবির হয়ে বসে। আমার সেই বাসাটার কথা মনে পরে গেলো। যে বাসা থেকে ৩১ অক্টোবর সকালে আমি বের হয়ে এসেছিলাম। হ্যালোউইন করবে বলে মেয়েরা একটালিস্ট ধরিয়ে দিয়েছিল। কথা ছিল বাসায় ফেরার সময় সেগুলো নিয়ে আসবো। সেই সখ করে সাজানো বাসায়  আমি আর ফিরে যেতে পারিনি। সেই মুহূর্তে আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলামনা; জানালার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকলাম। চোখের সামনে যা-যা দেখছি সবই অপরিচিত, অচেনা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়েছিল একটা টং দোকান পেলে বেশ হতো, দুই কাপ কড়া চা আর বেনসন হলে নিজেকে একটু হালকা লাগতো বোধহয় । (চলবে)

ছবি: লেখক