শহর এক আশ্চর্য প্রেমিকার নাম- তিন

আহমেদুর রশীদ টুটুল

“এ-শহর পল্টনের মাঠে ছোটে, পোস্টারের উল্কি-ছাওয়া মনে
এল গ্রেকো ছবি হয়ে যেন উদার নীলিমা;
এ-শহর প্রত্যহ লড়াই করে বহুরূপী নেকড়ের সাথে।”

এই বৈদেশবাসের আমন্ত্রণের ব্যাপারে আমি হাসপাতালে থাকা অবস্থাতে জানতে পারি রুনার কাছে। আক্রান্ত হওয়ার আগে যখন নিরাপত্তাহীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল তখন আমি খোঁজ নেয়া শুরু করেছিলাম কোনোভাবে কোথাও চলে যাওয়া যায় কি না। দু-একজন বন্ধুবান্ধব কিছু পরামর্শ চেষ্টার কথা বলছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে  সন্বিত ফিরে পাওয়ার পর মানুষের ভালবাসা ও সমর্থন দেখে সেসব আর মনে ছিল না। রুনা যখন খবরটা জানালো আমি তখন আমার স্বভাব সুলভ গোয়ার্তুমি করে বলেছিলাম “না”।  কিন্তু বন্ধুবান্ধব-শুভাকাঙ্ক্ষিদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলাম। মাত্র আঠারো মাস পর এখনো ভাবি থেকে গেলে কেমন হতো? খুব সহজেই বুঝতে পারছি কিছুই করতে পারতাম না; না স্বাভাবিক জীবন যাপন, না পেশাগত দায়িত্ব পালন। মিডিয়া, স্যোশাল মিডিয়ায় সমর্থন-ভালবাসা প্রদর্শন করার চেয়ে বাস্তবে পাশে দাঁড়ানো আসলেই অনেক অনেক কঠিন।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে আমার কখনোই ভাল লাগে না। কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা না থাকলে শুয়ে থাকা ছাড়া উপায় তো নাই। কত লোক আসছে-যাচ্ছে। মানুষ দেখতে আমার সব সময়ই ভাল লাগে। মানুষ দেখি আর ভাবি। কত হাজার রকমের ভাবনা-চিন্তা-স্মৃতি আমাকে দোল দিয়ে যায়। একের পর এক কবিতার লাইন ,লেখার ভাবনা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আব্বা-আম্মার কথা খুব মনে পরে। ইচ্ছে করে তাঁদের কবরের সামনে গিয়ে একটু দাঁড়াতে। আম্মা মারা যাওয়ার পর সিলেট আর তেমন যাওয়াই হতো না। কিন্তু মাঝে মধ্যে আমি রাতের বাসে গিয়ে সারাদিন থেকে আবার রাতের বাসে করে ফিরে আসতাম। আব্বা-আম্মার কবরের সামনে গিয়ে কিছু সময় দাঁড়াতাম। চোখ বন্ধ করলে মনে হতো , আব্বা আম্মাকে ডেকে বলছেন  “দ্যাখো… টুটুল নু আইছে… ” । তারপর রিকশা করে সিলেট শহর ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের বাসার গলির সামনে দিয়ে যেতাম। কিন্তু কখনো ভিতরে ঢুকতাম না। আমার বোহেমিয়নতা শুরুর আশ্রয় লাইব্রেরিগুলোও বাইরে থেকে একনজর দেখে যেতাম। কখনো কখনো অবশ্য ইচ্ছে হতো স্কুলের পেছনের ছড়ার পাড়ে ছোটবেলার মতো এঁটেল মাটি দিয়ে কিছু বানাতে বা সাঁতার শেখার পুকুরটাতে এপাড় ওপাড় হতে। প্রত্যেকবার যাওয়ার সময়ই ভাবতাম এইবার আরেকবার তারাপুর  বাগানের ভিতর দিয়ে হেঁটে বাগান-মাঠ-টিলা পার হয়ে লাক্কাতুরা দিয়ে বের হবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয়ে উঠে না এই পুনরাবৃত্তি। আহা, যদি আরেকবার হাঁটতে পারতাম এই  বেপথু পথে! অবশ্য পত্রিকায় দেখেছি তারাপুর বাগান আর এখন বাগান নেই। হাসপাতাল-কলেজ আর আবাসিক এলাকা হয়ে গিয়েছে। তো আমি এভাবেই মাঝে মধ্যে সিলেটে যাই আর আমার ফেলে আসা পায়ের ছাপগুলো খোঁজতে চেষ্টা করি। সিলেটের একনাগাঢ়ে তিন-চার-পাঁচ দিনের বৃষ্টির জন্যও আমার খুব মন খারাপ লাগে। এম সি কলেজের বাইরে টিলাগড় পয়েন্টে গ্র্যান্ড বুক স্টল নামে একটা বইয়ের দোকান ছিল। অনেক বই ছিল না সেখানে তবে অনেক ভাল বইয়ের সংগ্রহ ছিল । আমি অনেক বই কিনেছিলাম সেখান থেকে। পুরান লেনে একটা বড় লাইব্রেরি ছিল; নামটা মনে করতে পারছি না, সেখানেও নিয়মিত যেতাম, বই দেখতাম, বই কিনতাম। সেই স্কুলবেলা থেকে বই কিনতে কিনতে একটা বড় সংগ্রহ হয়ে গিয়েছিল আমার; প্রায় পাঁচ হাজারের মতো। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ,কলেজ থেকে অর্ধেক পথ হেঁটে এসে ভাড়া বাঁচিয়ে বই কেনা শুরু করেছিলাম। এই বইগুলোর জন্যই শুধু এখনো মাঝে মধ্যে আমার কান্না আসে।[…চলবে]